Home » অর্থনীতি » অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল নেই

অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল নেই

 

পণ্যবাজার, মুদ্রাবাজার কিংবা শেয়ারবাজার- সবখানেই সরকারের পক্ষ থেকে কিছু প্রণোদনা রয়েছে। প্রণোদনা রয়েছে কৃষিতে, রয়েছে রপ্তানিতে। কোথাও রয়েছে নগদ সহায়তা বা ভর্তুকি, কোথাও করছাড়। রয়েছে নীতি সহায়তাও। সব ধরনের প্রণোদনার উদ্দেশ্য, সাধারণ ভোক্তা বা গ্রাহককে সুরক্ষা দেওয়া। প্রতি বছর এ জন্য বাজেটে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়। করছাড়ের আদলে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাতে সরাসরি ব্যয় না হলেও সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয় সরকার। দুই-একটি ক্ষেত্র ছাড়া সরকারের এসব প্রণোদনা ও করছাড়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রণোদনা দিতে হবে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা থেকে। অর্থনীতিতে মন্দা কাটানোর জন্য, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করতে কিংবা কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্নেষণ করে সমতার ভিত্তিতে দিতে হবে। তবে আমাদের এখানে অনেক সময় যৌক্তিকতাকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবি মানতে এবং অদক্ষতা ও অনিয়মের খেসারত দিতে প্রণোদনা দেওয়া হয়, যার ফল অনেক সময় ভালো হয় না। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও অদক্ষতা রেখে ভর্তুকি দিয়ে পরিচালনার নীতি নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সহায়তা কোনো কাজে আসেনি। নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রণোদনার প্রভাব সীমিত। সরকারি অদক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে পরিচালনা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়েছে। সরকার অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করে নগদ টাকার সঞ্চার করেছে নতুবা করছাড় দিয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে আর্থিক প্রণোদনার আসক্তি তৈরি হয়েছে। তবে প্রণোদনা যে সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে তা নয়। রপ্তানি খাত বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের বিকাশে নগদ সহায়তা ও করছাড়ের প্রভাব অনেকাংশেই ইতিবাচক। ভর্তুকির কারণে কৃষি খাতের উপকার হচ্ছে। ডিজেল ও সারের মূল্যে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তা কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রণোদনা এর উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়িয়েছে। যদিও স্বল্পমেয়াদি কুইক রেন্টাল বা আইপিপিকে দীর্ঘমেয়াদে নিতে গিয়ে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। যার প্রভাবে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে।

অবশ্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, বিভিন্ন খাতে সরকারের প্রণোদনা সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্যবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থনীতির যেসব খাত অন্যান্য খাতের জন্য ইতিবাচক বাহ্যিক সুবিধা তৈরি করে সেসব খাতে উৎপাদন ও মূল্যস্তরকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশনা মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে এমন মতামত রয়েছে।

ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের ১৪ শতাংশ। সরকার কৃষি, শিল্প, রপ্তানি, সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং পাটকল করপোরশেনকে নগদ ঋণ আকারে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। চলতি অর্থবছর থেকে রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কৃষি খাতে ভর্তুকির জন্য গত অর্থবছরে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। চলতি অর্থবছরেও একই পরিমাণ বরাদ্দ রয়েছে। রপ্তানিতে প্রণোদনা বাবদ গত অর্থবছরে ৪৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ৭ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। রেমিট্যান্সে প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। নগদ সহায়তা বা ভর্তুকির পাশাপাশি রয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় আমদানিতে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা। শিল্পের জন্য রয়েছে নানা ক্ষেত্রে কর অবকাশ ও করছাড়। সরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে প্রতি বছর বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হচ্ছে বাজেট থেকে। শেয়ারাবাজারের জন্য রয়েছে কম সুদে ঋণ নেওয়ার তহবিল। নগদ অর্থের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে নীতি সহায়তা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতে যেসব প্রণোদনা সার্বিকভাবে সুফল বয়ে আনছে না। কর অবকাশ, নগদ সহায়তাসহ বিভিন্নভাবে দেওয়া প্রণোদনা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেনি। বেসরকারি খাতে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ গত ১০ বছর ধরে প্রায় একই অবস্থানে রয়ে গেছে। সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে কোনো লাভ নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের মূল সমস্যা হলো অদক্ষতা ও দুর্নীতি। এ সমস্যার সমাধান প্রণোদনা দিয়ে হবে না। বরং সরকারি খাতের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের প্রণোদনা অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করছে না। এর বড় উদাহরণ ব্যাংক খাত। ঋণ পুনঃতফসিল ও অবলোপনের ক্ষেত্রে নানা সুবিধা দিয়েও খেলাপি ঋণ কমানো যাচ্ছে না। ঋণের সুদের হার কমছে না। ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও দেওয়া ভর্তুকি কাজে আসেনি। অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অসঙ্গতি ও অদক্ষতা দূর করতে সংস্কার না করে সরকার টাকা পয়সা দিয়ে মেটাতে চাইছে। ব্যক্তি খাতকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরকার এই অর্থ ব্যয় করছে। হয় টাকার সঞ্চার করছে, না হয় কর রেয়াত দিচ্ছে। এ পদ্ধতিতে অর্থনীতিকে টেকসই করা মুশকিল।

তিনি বলেন, আর্থিক ব্যয়নীতি ব্যবহার না করে মুদ্রানীতি ব্যবহার করে টাকার মূল্যমান কমালে তৈরি পোশাক খাতকে অতিরিক্ত ১ শতাংশ এবং রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ প্রণোদনা না দিলেও চলত। সিপিডি সেই প্রস্তাব করেছিল। সংস্কারের পথে না গিয়ে প্রণোদনার পথে গেলে এক সময় দেওয়ার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে। এটাই এখন বড় দুশ্চিন্তার জায়গা। ইতোমধ্যে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সরকারের আর্থিক সঙ্গতি কমে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, অর্থনীতিতে সার্বিকভাবে প্রণোদনার প্রভাব মিশ্র। রপ্তানি খাত বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে শুল্ক্কবিহীন আমদানি, কম উৎসে কর, কম আয়কর এবং নগদ সহায়তা না থাকলে বর্তমান সক্ষমতা তৈরি হতো না। তবে তৈরি পোশাকের মতো অন্যান্য রফতানি খাতকে একইভাবে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়নি। কৃষিতে অনেক ক্ষেত্রেই প্রণোদনার ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। প্রথম দিকে কম সুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে প্রণোদনা দেওয়া হয়। পরে সার ও ডিজেলের মূল্য কম রাখার জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। উভয় নীতিই সার্বিকভাবে ভালো ফল এনেছে। যদিও ইউরিয়ার বেশি ব্যবহার জমির দূষণ বাড়িয়েছে।

জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতে সুদের হার কমানোকে উদ্দেশ্য করে যেসব সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা কাজে আসেনি। ব্যাংক কিংবা শেয়ারবাজারে মৌলিক সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্যাংকের মূল রোগ খেলাপি ঋণ, যা আরোগ্যের কোনো লক্ষণ নেই। সরকারি ব্যাংকগুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে এগুলোর পুনর্মূলধনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। শেয়ারাবাজারেও আইসিবির মাধ্যমে তহবিল দিয়ে অবস্থার উন্নতি করা যায়নি। উভয় ক্ষেত্রেই প্রণোদনা ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া আমদানি প্রতিস্থাপনকে সুবিধা দিতে প্রণোদনা দিয়ে দেশীয় এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা না থাকায় ক্রেতাদের উচ্চ মূল্যে এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য কিনতে হচ্ছে। পণ্যের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে। তৈরি ভোগ্যপণ্যকে অতিরিক্ত সংরক্ষণ সুবিধা দেওয়ার নীতি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেনি বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক এই মুখ্য অর্থনীতিবিদ। নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিত্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সুবিধা অনেক সময় সময়মতো দেওয়া হয় না।

নিউটার্ন.কম/AR

8 Shares