Home » আন্তর্জাতিক » আজ বিশ্ব মাধ্যাকর্ষণ দিবস

আজ বিশ্ব মাধ্যাকর্ষণ দিবস

নিউটার্ন ডেস্ক

যে টান যায় না এড়ানো
দুটি নিউট্রন তারকা যখন একে অপরকে খুব কাছ থেকে ঘিরে চক্কর খায়, তখন তৈরি হয় বিপুল পরিমাণ গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ তথা মাধ্যাকর্ষণতরঙ্গ। তখন ওই তরঙ্গ পৃথিবীর স্যাটেলাইটেও ধরা পড়ে

নিউটন বলার আগে তো কেউ জানতই না এ আকর্ষণের কথা। অথচ এর কারণেই আমরা বেঁচেবর্তে আছি পৃথিবীতে। মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে একগাদা ঝামেলায় পড়তে হতো গোটা মহাবিশ্বকেও। গ্রহ-নক্ষত্র ও চাঁদের ঘোরাঘুরি থেকে শুরু করে ক্রিকেট-ফুটবল খেলার পেছনেও কলকাঠি নাড়ছে মাধ্যাকর্ষণ। আর এমন একটা ব্যাপারকে নিয়ে বছরের একটা দিবস তো থাকতেই পারে। মাধ্যাকর্ষণ দিবসে রহস্যময় এ আকর্ষণের মজার কিছু তথ্য জানাচ্ছেন আশিকুর রহমান

গতি ও ওজন

ভর আর ওজনের পার্থক্য তো জানাই আছে। ভর সব সময় এক থাকলেও গতি ও স্থানের সঙ্গে ওজন ওঠানামা করে। আর এমনটা হয় মাধ্যাকর্ষণের কারণেই। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ তোমাকে নিচের দিকে টানছে অনবরত। অন্যদিকে মাটিটা তোমাকে ধরে রেখেছে। মাটির ওই ধরে রাখার কারণেই তুমি তোমার ওজনটা টের পাও। কিন্তু যখন রোলার কোস্টার থেকে নিচের দিকে খাড়াখাড়ি পড়তে থাকো, তখন হয়ে যাও ওজনহীন। কারণ ওই সময় তোমাকে মাধ্যাকর্ষণ থেকে কেউ ধরে রাখে না। আবার নভোচারী যখন আসনে পিঠ ঠেকিয়ে রকেটে চড়ে সোজা ওপরের দিকে উঠতে থাকেন, তখন তাঁর কাছে মনে হয়, তাঁর ওজন বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। কারণ ওই সময় তিনি যত দ্রুতগতিতে উঁচুতে উঠতে চান, ততটাই ধাক্কা দিয়ে তাঁকে ধরে রাখে আসনটা।

বাড়বে না শরীর

মাধ্যাকর্ষণ বলয়ের ভেতরে থেকেই পৃথিবীতে ঘটেছে প্রাণের বিবর্তন। তাই মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে বেড়ে উঠলে বেশির ভাগ প্রাণীই পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে না। আমাদের শরীরের ভার নেওয়ার কাজ করে যে হাড়গুলো, সেগুলো হয়ে যেত অকেজো। শরীরে বাড়তি ক্যালসিয়ামের স্থান হতো না। আমাদের শরীরের পেছনের ভাগ ও পায়ের শক্তি বাড়ানোর কাজ করে যে মাংসপেশিগুলো, সেগুলোও গড়ে উঠত না। অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণের কারণেই আমরা আজকের এই রূপে বেড়ে উঠেছি। আকর্ষণটা না থাকলে মানুষও হয়ে যেত সরীসৃপের মতো।

পৃথিবীর মাঝে টানেল

মনে মনে ধরে নাও পৃথিবীকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে একটা গর্ত খোঁড়া হলো। সেই গর্তে যদি কেউ লাফ দেয় তখন কী ঘটবে? আমরা জানি, পড়তে পড়তে কোনো বস্তুর গতি বাড়তেই থাকে। এটা হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ। এই পতনের একপর্যায়ে পড়ন্ত ওই ব্যক্তির গতি সেকেন্ডে প্রায় আট কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে যাবে! কিন্তু একই সঙ্গে কমতে থাকবে ওজন। মানে ওই ব্যক্তির কাছে মনে হবে, তার ওজন ক্রমে কমছে। একটা পর্যায়ে গিয়ে পৃথিবীর একেবারে পেটের ভেতর পৌঁছলে ওজন নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়। অবশ্য সেখানে ঝুলতে থাকবে না ওই ব্যক্তি। প্রচণ্ড গতির কারণে টানেলের ভেতর দিয়ে পড়তেই থাকবে। তবে এবার গতি কমার পালা। পড়তে পড়তে একটা পর্যায়ে তার মনে হবে, সে এবার ওপরের দিকে উঠছে। এরপর যখন সে টানেলের বিপরীত পাশে উঠবে, তখন যদি কেউ তাকে টুপ করে ধরে না ফেলে, তাহলে আবার পড়ে যাবে। তবে এবার আর বিপরীত পাশ দিয়ে সে না-ও উঠতে পারে। কারণ টানেলের ভেতর আছে বাতাস। বাতাসের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে পড়ন্ত ব্যক্তির গতি কমে যাবে এবং একপর্যায়ে পৃথিবীর পেটের মধ্যে স্থির হয়ে ভাসতে থাকবে সে।

মাছের মাথা

মাছের মাথার সঙ্গে আবার গ্র্যাভিটির সম্পর্ক কোথায়? আছে! মাছের নেই হাত-পা। পানিতে ওজনহীন পরিবেশে চক্রাকারে ঘুরতেও পারে ওটা। আর তাই মাছের পক্ষে এমনিতে বোঝা সম্ভব নয়, কোন দিকটা পানির ওপরের দিক, আর কোনটা নিচের। ভাগ্য ভালো যে দু-একটি প্রজাতি ছাড়া বাকি সব মাছের মাথায়ই আছে একটা ছোট্ট পাথর। ক্যালসিয়াম কার্বনেটের ওই পাথরটাকে বলে অটোলিথ। ওই পাথর কোন দিকে হেলে পড়ছে, সেটা বুঝতে পারে মাছ। আর তাতেই সে বুঝতে পারে মাধ্যাকর্ষণের টানটা কোন দিকে।

এক জায়গায় একেক ওজন

পৃথিবীটা একেবারে গোলগাল নয়। তাই এর একেক দিকে মাধ্যাকর্ষণ বলটাও একেক রকম। এ আকর্ষণ কোথায় কতখানি, সেটা জানতে কক্ষপথে গ্রেস নামের দুটি স্যাটেলাইট পাঠিয়েছিল নাসা। এতে দেখা যায়, পৃথিবীর আর্কটিক অঞ্চলেই মাধ্যাকর্ষণ বল সবচেয়ে বেশি কাজ করে। অন্যদিকে পেরুর মাউন্ট নেভাদো পাহাড়ে এ আকর্ষণ বল সবচেয়ে কম।

মাধ্যাকর্ষণের গতি

পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে মাধ্যাকর্ষণের কারণে। কিন্তু ধরো হুট করে সূর্যটা ভ্যানিশ হয়ে গেল? পৃথিবী কি সঙ্গে সঙ্গে সেটা টের পাবে? নিউটনের মতে, মাধ্যাকর্ষণ এমন এক ব্যাপার, যা সঙ্গে সঙ্গেই টের পাওয়া যায়। অন্যদিকে আইনস্টাইন বলে গেছেন, মাধ্যাকর্ষণ হোক আর যা-ই হোক, আলোর চেয়ে বেশি গতিশীল কিছু হতে পারে না (সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার)। সেই হিসাবে মাধ্যাকর্ষণের গতি আলোর গতির সমান। অর্থাৎ সূর্যটা আচমকা গায়েব হলে আমরা সেটা টের পাব আট মিনিট পর! ততক্ষণ পৃথিবীটা আগের মতো ঘুরতেই থাকবে। ২০১৭ সালের দিকে এক জোড়া নিউট্রন তারকার সংঘর্ষে যে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ তথা মাধ্যাকর্ষণতরঙ্গ তৈরি হয়েছিল, সেটা পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেই সঙ্গে তাঁরা স্যাটেলাইটে ওই সংঘর্ষে বিচ্ছুরিত আলোর গতিপথও দেখেন। তাতে দেখা যায়, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের গতি আলোর চেয়ে তো কম নয়ই, বরং কিছুটা বেশিই!

মাধ্যাকর্ষণের গুলতি

দূরের কোনো গ্রহে নভোযান পাঠাতে সারাক্ষণ রকেট চালাতে হলে মঙ্গল গ্রহ না পেরোতেই দেখা যাবে ফুরিয়ে গেছে জ্বালানি। এমনকি সরাসরি রকেট চালিয়ে চাঁদে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নভোচারীদের জ্বালানি নিয়ে চিন্তা করতে হবে সবচেয়ে বেশি। আপাতত এই চিন্তা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। মনে করো, একটা ভারী বস্তুকে দড়িতে বেঁধে তুমি ঘোরাচ্ছ। ঘুরন্ত অবস্থায়ই কেউ একজন কৌশলে ওই দড়িটা কেটে দিল। কী ঘটবে? দেখা যাবে, বস্তুটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়েছে। মাধ্যাকর্ষণশক্তিটা ওই দড়িরই কাজ করবে। নভোযানটা পৃথিবীর আকর্ষণ বলয়ের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে যখনই হুট করে নিজের রকেটটা চালু করবে (মানে দড়ি কেটে দেবে), তখন দেখা যাবে, সামান্যতেই অনেক বেশি গতিশক্তি পাবে নভোযানটা। এভাবে একটার পর একটা গ্রহের মাধ্যাকর্ষণকে কাজে লাগানো গেলে খুব অল্প জ্বালানিতেই একটা নভোযানকে সৌরজগতের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ঠিক এভাবেই বৃহস্পতি গ্রহের মাধ্যাকর্ষণকে গুলতির মতো কাজে লাগিয়ে ২০১৫ সালে প্লুটোর কাছে গিয়েছিল নিউ হরাইজন প্রোব।

আরো খুঁটিনাটি

মাধ্যাকর্ষণের শক্তিটা ঠিক কতখানি? একটা সহজ পরীক্ষা করলেই বিষয়টা বুঝতে পারবে। একসঙ্গে লেগে থাকা দুটি চুম্বককে টান দিয়ে আলাদা করো। দেখবে, খানিকটা হলেও জোর খাটাতে হচ্ছে তোমাকে। এবার সেই চুম্বক দুটি আলাদা করে টেবিলে রাখো। এবার টেবিল থেকে একটা চুম্বক তুলে নাও। জোর খাটাতে হলো? টেবিল থেকে তোমার কলমটা তোলো দেখি। এবার তো কোনো জোরই খাটাতে হয়নি। তো পৃথিবীর এত বড় মাধ্যাকর্ষণশক্তি কোথায় গেল? কলমটা ছেড়ে দিলে ওটা পড়ে যাবে ঠিকই। কিন্তু পৃথিবীর শক্তি তো ওটাকে টেনে ধরে রাখেনি। এই হিসাবে বিজ্ঞানীদের কাছে মাধ্যাকর্ষণের মূল আকর্ষণশক্তিটা একটা ছোট্ট চুম্বকের চেয়েও কম। তাই বলে মাধ্যাকর্ষণকে কিছুতেই উড়িয়ে দিতে পারবে না। এই আকর্ষণের কারণেই কিন্তু জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারছে।

অন্যদিকে আইনস্টাইনের মতে, এই মাধ্যাকর্ষণ বিষয়টা তাপ, বিদ্যুৎ বা আলোর মতো কোনো ধরনের শক্তি নয়। আমরা যেটাকে খালি চোখে শূন্যস্থান হিসেবে জানি, আইনস্টাইনের চোখে সেটা হলো স্থান-কালের চাদর। বড় কোনো বস্তু সেই চাদরটাকে নিখুঁতভাবে দাবিয়ে দিতে পারে। যে কারণে বস্তুর সব পাশেই ওই শূন্যস্থানে একটা ঢালের মতো তৈরি হয়। অর্থাৎ বস্তু যেখানে আছে, সেই স্থানটাই যায় বেঁকে। এই বেঁকে যাওয়া স্থানে তখন অন্য একটি বস্তু থাকলে সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়াতে থাকবে। এই গড়িয়ে চলাটাকে আমরা মাধ্যাকর্ষণ হিসেবে জানি। চুম্বক ও মাধ্যাকর্ষণের মধ্যে আরেকটা পার্থক্য হলো—চুম্বক দ্বিমুখী বল হলেও মাধ্যাকর্ষণ একমুখী।

মাধ্যাকর্ষণ বিষয়টা সেভাবে টের না পাওয়া গেলেও এর ক্ষমতা সম্ভব অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি। কারণ আলো কিংবা রেডিও-তরঙ্গও একে ফাঁকি দিতে পারে না। বড়সড় কোনো গ্রহের (যেমন—বৃহস্পতি) পাশ দিয়ে দূর থেকে আসা রেডিও-তরঙ্গ বেঁকে যায় মাধ্যাকর্ষণের কারণে।

পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশস্টেশনের (আইএসএস) নভোচারীরা শূন্যে ভেসে ভেসে কাজ করেন। অনেকেই মনে করে, সেখানে মাধ্যাকর্ষণ বল বুঝি একেবারেই কাজ করে না। এ ধারণা ভুল। আইএসএসে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের ৯০ শতাংশ রয়েছে। তার পরও সেখানে সব ভাসে কেন? এর কারণ হলো, আইএসএস পৃথিবীকে ঘিরে সেকেন্ডে সাড়ে চার মাইল গতিতে ছুটছে। এতে এর ভেতর থাকলে মনে হবে, এটা পৃথিবীর দিকেই বুঝি অনবরত মুক্তভাবে ছিটকে পড়ছে। আর এই ছিটকে পড়ার (ইংরেজিতে যাকে বলে ফ্রি ফল) কারণেই ভেতরের সব কিছু হয়ে যায় ওজনহীন।

8 Shares