Home » মতামত » একজন দীপক কুমার দাস ও কিছু কথা

একজন দীপক কুমার দাস ও কিছু কথা

 

করোনার কারণে কলেজ বন্ধ। বিছানায় যেতে যেতে রাত একটা দেড়টা বেজে যায়। তাই ঘুম থেকেও উঠতে একটু দেরি হয়। ২৮ মার্চ । সকাল তখন ৮- ৪৫ মিনিট। মোবাইল রিংয়ের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ফোনটি হাতে নিয়ে দেখি আমার কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল ফারহানা সিদ্দিকী ম্যাডামের কল। ফোন রিসিভ করার আগেই মাথার মধ্যে একটি প্রশ্ন এলো। এই অসময়ে কেন তিনি কল দিলেন। কোন দুঃসংবাদ নয় তো। আমার সেই শঙ্কাই সত্যি হলো। তিনি জানালেন আমাদের গভর্নিংবডির সাবেক কো- অপ্ট সদস্য দীপক দাদা আর নেই। মনটা বিষাদে ভরে গেল। তিনি ২৭ মার্চ মুগদা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আমি কমলাপুর স্কুল এন্ড কলেজের ২০১০ সালের ১২ আগস্ট জয়েন করি। তখন গভর্নিংবডির চেয়ারম্যান ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফায়েকুজ্জামান চৌধুরী। শুনেছি তিনি অত্যন্ত সৎ ও ন্যায়বান ব্যক্তি ছিলেন। তাকে আমি একদিনই দেখেছিলাম। নিয়োগ পরীক্ষা দিতে এসে। এরপর আমাদের কলেজের চেয়ারম্যান হলেন সাবেক কাউন্সিলর ও সবুজবাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আশ্রাফুজ্জামান ফরিদ এবং সে সময়ে ( ২০১১-১২) গভর্নিংবডির কো- অপ্ট সদস্য হন দীপক কুমার দাস। তিনি তখন সোনালি ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকতা। পরপর তিন টার্মে অর্থাৎ ৬ বছর আমাদের কলেজের গভর্নিংবডির কো- অপ্ট মেম্বার ছিলেন তিনি। ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর নতুন কমিটি গঠিত হলে আমি কলেজে শাখার শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচিত হই এবং দীপক দাদার সাথে ৪ বছর গভর্নিংবডিতে কাজ করেছিলাম। এর আগেও আমি আমার পূর্বের কর্মস্থল স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউটশন ও কলেজেও শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলাম। শিক্ষক প্রতিনিধি থাকা অবস্থায় পদত্যাগ করে আমি বর্তমান প্রতিষ্ঠানে যোগদান করি। এই কথাগুলো বলার পেছনে কারণ আছে। আর সেটি হচ্ছে গভর্নিংবডির সদস্যদের সম্পর্কে আমার বাস্তব কিছু নেতিবাচক অভিজ্ঞতা। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিংবডির সদস্যদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। যদিও দীপক দাদার কোনো কাজকর্ম নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তুলতে পারেননি। শিক্ষক সমাজ কিন্তু এমনই সদস্যকেই গভর্নিংবডিতে আশা করেন। সময় অসময়ে তিনি প্রতিষ্ঠানে আসতেন। ক্লাস ঠিকমত হচ্ছে কিনা তাও পর্যবেক্ষণ করতেন। কিন্তু কাউকে তৎক্ষণাৎ কিছুই বলতেন না। অসঙ্গতি কিছু চোখে পড়তে অধ্যক্ষ মহোদয়কে বলতেন। কখনো কখনো আমার সাথেও সে বিষয়গুলো নিয়ে শেয়ার করতেন। তবে তিনি গভর্নিংবডির মিটিংয়ে আমাকে অনেক সময় অপ্রস্তুত করে দিতেন । শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে এলে চেয়ারম্যান স্যারকে আগেই তিনি বলতেন শিক্ষকগণ বলেছেন তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করবেন এবং আমাকে বলতেন, কি ইউসুফ সাহেব ঠিক না? আমি অনেক সময় বুঝে ওঠতে পারতাম না। তিনি মিটিংয়ে সঠিক সময়ে আসতেন এবং সকল ডেকোরাম মেইনটেইন করতেন। আমাদের তৎকালীন চেয়ারম্যান মহোদয়ের সাথে দীপক দাদার সম্পর্কটি তুমি পর্যায়ে ছিল। কিন্তু আমরা দীপক দাদাকে কখনোই নাম ধরে ডাকতে শুনিনি। চেয়ারম্যান স্যার বলেই সম্মোধন করতেন। তিনি যুক্তিভিত্তিক ন্যায্য কথা বলতেন । আর্থিক বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। আমাদের কলেজের ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক মনিরুল ইসলাম দীপক দাদার সম্পর্কে বলেছেন–”Dipak dada was really a good , intelligent , honest , kind-hearted & much more devoted person. As a human being none is beyond fault. Each & every one may have something wrong .It’s reality. Truly to say, Dada was beyond any greed or interest. He loved all classes of people . you absolutely commented that I had some opportunity to work with him. I saw he never wanted to harm anybody or fall any one in danger. Actually, he liked or loved whatever you say all teachers, 3rd & 4th class employee and finally educational institution. I believe he was a man of great heart.I pray for his departed soul.” মনির স্যারের বক্তব্যের মাধ্যমেই তার সকল গুণাবলি আমরা অনুধাবণ করতে পারি। আমার আরেক সহকর্মি রতন চন্দ্র সরকার একেবারে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন-“He was totally a helpful and active person.”

‌১৯৫৬ সালের ৭ মে বরিশালের চরমোনাই জন্মগ্রহণকারী দীপক কুমার দাস ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করতেন এবং ছাত্রলীগের বৃহত্তর বরিশাল জেলা শাখার প্রচার সম্পাদক ছিলেন। এই কমিটির ( ১৯৭৮-৮৩) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সামসুদ্দিন খাজা । রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করে তিনি সোনালি ব্যাংকের চাকরি জীবন শুরু করেন এবং ২০১৫ সালে অবসরে যান। অবসর পরবর্তি তিনি সবুজমতি ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটির জিএম পদে যোগদান করেন। এছাড়াও তিনি একজন সমাজকর্মি ও সংগঠক ছিলেন। তিনি মহামায়া মৈত্রী সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

১৬ মার্চ থেকেই আমাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এর কয়েকদিন আগে অধ্যক্ষ মহোদয়ের কক্ষে দাদার সাথে দেখা হয়েছিল। ফারহানা ম্যাডাম দাদাকে আপ্যায়ন করাতে চাইলেও তিনি শুধু এক গ্লাস পানি পান করেছিলেন। বরাবরই তাকে এমনটিই দেখেছি। বেশি জোরাজুরি করলে বড়জোর এক কাপ চা ছাড়া কিছুই খেতেন না। সেদিন তাকে দেখে মনে হয়নি তিনি গুরুতর অসুস্থ। যদিও জানুয়ারি মাসে তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে যান এবং সেখানেই তার প্রস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়ে।। এই অল্প সময়ে তাকে হারাতে হবে তা কখনোই ভাবিনি। সমাজে যখন সৎ ও ভালো মানুষের প্রয়োজন তখন তিনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
লেখক পরিচিতি : বি এম ইউসুফ আলী, প্রভাষক,রাষ্ট্রবিজ্ঞান,কমলাপুর স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা।

37 Shares