Home » মতামত » একুশ থেকে স্বাধীনতা – এম. এ. হান্নান

একুশ থেকে স্বাধীনতা – এম. এ. হান্নান

“ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল,
ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্র মুকুল। চঞ্চল মৌমাছি গুঞ্জরি গায়,
বেনুবনে মর্মরে দক্ষিণা বায়।”
এমনই এক পলাশ রাঙা আকাশের নিচে রক্তে ভেজা আমার দেশের মাটি।
: স্মৃতি ও ব্যক্তিগত ডাইরির পাতা থেকে : [ বাহান্নর একুশ কিভাবে রাজধানীর ৫০০ কি.মি. দূরে সক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল তারই নমুনা এই ডাইরির পাতা ] {তেঁতুলিয়া, দিনাজপুর। বুধ ও বৃহষ্পতিবার, ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০ খ্রিঃ। একুশ উদযাপন প্রস্তুতি
গতকাল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে গ্রামের ছেলেদের সাথে আসন্ন একুশের কর্মসূচি নিয়ে কথা বলছিলাম। কে কাগজ কিনবে, কালি কিনবে, ফেস্টুন লিখবে- বানাবে, ইত্যাদি। ভাজতা মতিউরের হাতের লিখা ভাল, তার থেকে তার ছোট ভাই আতাউরের হাতের লিখা আরো ভাল। সে বয়সে ছোট হলেও, তার খুব সখ- ফেস্টুন লিখা ও তৈরী করার। লিখার দায়িত্ব দেয়া হলো ওদের উপর। আজিবদ্দীন, আকিবদিদন এবং মান্নান ভাই তৈরী করবে বাঁশের কাঠির মাথায় চাটাইর উপর হাতে লিখা কাগজ মোড়ানো ফেস্টুন, যেটি মিছিলে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার প্রত্যেকের হাতে হাতে থাকবে । একুশে ফেব্রুয়ারির ফেস্টুনে লিখা ‘কথা বা ভাষা’ আমরা বড়রা পূর্বেই ঠিক করে রেখেছিলাম। বড়দের মধ্যে আমাদের গ্রামের কমিউনিস্ট-পার্টির শুভানুধ্যায়ী মোখলেছ ভাই ছিলেন আমাদের পরামর্শদাতা। জহিরুল, সুলতান, সফিউর এবং আমি পূর্বেই ব্যানারের ‘ভাষা বা কথা’ ঠিক করে রেখেছিলাম। কমরেড কামরুল হোসেন ও কমরেড নাজির হোসেন এর দিক-নির্দেশনা তো ছিলই। —————– ফেস্টুন তৈরী প্রায় শেষ পর্যায়। দিনে মিটিং, সংগঠন এবং একুশের প্রোগ্রামকে সফল করার জন্য দৌড়-ঝাঁপ, রাতে লিখালিখি, ব্যানার তৈরী এই নিয়ে আজ ক’দিন ব্যস্ত রইলাম। —————-
শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০ খ্রিঃ। মিছিলে ছিলাম সকাল ১০ টার দিকে জহিরুল ও সুলতান আমার এখানে (আমার বাড়ি) আসলে তাদের সঙ্গে আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি সম্বন্ধে অনেক আলাপ আলোচনা চলল। অদ্য তেঁতুলিয়া বাজারে ছাত্র মিছিল সহকারে ২১শে ফেব্রুয়ারির বিভিন্ন কর্মসূচি ( শালবাহন হাট বন্ধ রেখে, সেখানে বিকালের দিক একটি ছাত্র জনসভা ও পূর্ণ হরতাল পালন, তা’ছাড়া সকালে ২১শে ফেব্রুয়ারির বিভিন্ন কর্মসূচি) প্রচার করা হলো। জহিরুল, সুলতান, বারেক, সফিউর, আতিয়ার, মমতাজ ও মাহবুব প্রমুখ বন্ধুসহ বহু ছাত্র-জনতা আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি পালনার্থে বিভিন্ন কর্মসূচির তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া।
শনিবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০। ছাত্র জনসভা, শালবাহন হাট বন্ধ রাখা ছাত্র ইউনিয়নের একটি বড় অর্জন, কেননা শালবাহণ হাটই হলো অত্র তেঁতুলিয়া থানার একমাত্র বড় হাট বা বাজার। অদ্য তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালন করা হলো। হরতাল উপলক্ষে শালবাহন হাট বন্ধ রাখা হলো। বিকাল ৩ ঘটিকায় শালবাহনের এক বিরাট জনসভায় বিভিন্ন ছাত্র ও কৃষক নেতার (তেঁতুলিয়ার) বক্তৃতা, অদ্য সকালকার কর্মসূচিতে ও বিকালে শালবাহনের উক্ত জনসভায় যোগদান করলাম।। রাত্রি ৮ টার পূর্বেই বাড়ি ফিরে এলাম। পাকিস্তানের সর্বত্র উক্ত মহান একুশে ফেব্রুয়ারি তথা ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় দিনটি পালিত হলো। অফিস আদালত ছুটি রাখার জন্য অদ্য সরকারিভাবে রেডিওতে ঘোষণা করা করা হয়। ———————————————————————————- } লেখার উপরোক্ত অংশ লেখকের ডাইরির পাতা ও স্মৃতিচারণ থেকে উদ্ধৃত।
বাংলাদেশের আর দশ জনের মতই আমারও ঘুম ভাংতো মোরগ-ডাক ও পাখির কল- কাকলিতে। ঘুম থেকে জেগেই ডাকতাম, “মাগো, কিছু খেতে দাও, মিছিলে যাব।” ভাষা আন্দোলনের মিছিল। মিছিলের কথা এজন্য বলছি, সে সময় স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির ছাত্ররা ফেব্রুয়ারি মাসে বাসায় নির্জীবের ন্যয় বসে থাকতে পারতো না। যারা সংগঠকের ভূমিকায় থাকতাম তাদের তো দম ফেলার সময় মিলতো না। ———————– এভাবেই সারা দেশের ন্যায় একুশের ঢেউ ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের থানা তেঁতুলিয়া, যে থানাকে হিমালয় কন্যা বলে অভিহিত করা হয়, সেখানেও একই অবস্থা, ভাষা-আন্দোলনের হাওয়া। ———— আমরা বাঙ্গালি, বাংলা মোদের মায়ের ভাষা। জন্মলগ্ন থেকে আমরা মায়ের কাছে যে ভাষা শিখেছি, প্রাণপ্রিয় সেই ভাষা বড় হবার সাথে সাথে আমাদের রক্ত-মাংস, নাড়ি ও হৃদয়ের সাথে মিশে গেছে। মা-বাবা ছাড়াও আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, আপনপর সবার সাথে আমরা অবিরত যে ভাষায় কথা বলি হৃদয় থেকে সেটি কি কখনো ছিনিয়ে নেয়া যায়? ———————-
প্রতিদিন সন্ধ্যা আসতে না আসতে পাখিরা নীড়ে ফিরে কিচিরমিচির করে, আবার ভোর হলে একই অবস্থা। বক-ঘুঘু-কবুতর, পোষা কুকুর-বিড়াল, ছাগল-ভেড়া, গরু-মহিষ, এমনকি বনের সকল পশুপাখি, জীবজন্তু সবাই তো নিজের ভাষায় কথা বলতে চায়, অথবা বিশেষ ভাব-ভঙ্গিমায় ভাবের আদান-প্রদান করে, করতে চায়। মনের আকুতি অন্যের নিকট পৌঁছানোর এটিই তো প্রকৃতিগত একমাত্র ব্যবস্থা। কেউ যদি এটি কেড়ে নিতে চায়, ভাবুন তো এটি কত বড় অপরাধ, অন্যায়, অমানবিক? ————————–
বহু ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে ব্রিটিশের কাছ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট আমরা স্বাধীনতা পেলাম। অখণ্ড ভারতবর্ষকে ভাগ করে গঠিত হলো দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে বিচিত্র ও কৃত্তিম (peculiar & artificial) এক রাষ্ট্র। নাম তার পাকিস্তান। রাষ্ট্র হলো একটি, কিন্তু ভূখণ্ড হলো দু’টি। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। এ দু’টির দূরত্ব এক হাজার দুই শত মাইল। দু’ ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণের ভাষা,কৃষ্টি-কালচার,খাওয়া-দাওয়া,আচার-আচরণ, পৌষ-পার্বণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, বেশ-ভূষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি সব কিছুই আলাদা।
১৯৪৭ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দিন দক্ষিণ ভারতের ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সম্মেলনে একটি অবাস্তব-অসংগত বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন-“ পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।” পরের সপ্তাহেই তার এ কথার জবাবে জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র সুস্পষ্ট বক্তব্যটি ছিল-“ পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসিদের মাতৃভাষা বিভিন্ন; যেমন- পশ্তু,বেলুচী, পাঞ্জাবী, সিন্ধী এবং বাংলা। কিন্তু উর্দু পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই মাতৃভাষারুপে চালু নেই। ——– যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষা পরিত্যাক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই। যেহেতু পাকিস্তানের ৩% মানুষ উর্দুতে এবং ৫৬% মানুষ বাংলায় কথা বলেন।” ডক্টর জিয়াউদ্দিনের সেই অসংগত ও বাস্তবতাবর্জিত ‘রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার প্রস্তাব’ নিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্র প্রধান তথা ‘গভর্নর জেনারেল’ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এলেন। উল্লেখ্য যে, সে সময় পাকিস্তানের সর্বমোট জনসংখ্যার ৫৬ ভাগের বসবাস ছিল পূর্ব পাকিস্তানে, যার অধীকাংশই ছিল বাঙ্গালি। যাদের সকলের ভাষা ছিল বাংলা। অবশিষ্ট ৪৪ ভাগ মানুষ বাস করতো পশ্চিম পাকিস্তানে। যাদের ভাষা ছিল পাঞ্জাবি, পস্তু, সিন্ধি এবং বেলুচি। আবার অনেকে কাশ্মিরি, ব্রাহুই, সিনা, হিন্ডকো এবং শারাইকি আঞ্চলিক ভাষাতেও কথা বলতেন। এক জরিপে দেখা যায়, ১৯৫১ সালে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু ভাষায় মাত্র ৭ ভাগ মানুষ কথা বলতেন। অর্থাৎ পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ ভাগ লোক উর্দুতে কথা বলতেন। কাজেই এদেশে বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে উর্দু জোর করে চাপিয়ে দেয়া ছিল একটি অমার্জনীয় অপরাধ। আর জিন্নাহ্ সেই অপরাধটিই করতে সচেষ্ট হলেন। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক নাগরিক সম্বর্ধনা সভায় এবং ২৪ মার্চ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে তিনি ঘোষণা করলেন, “উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা–(“Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan”.)| । তার এ ঘোষণায় এদেশের ছাত্র-শিক্ষক, সুধী এবং শিক্ষিত সমাজ একবাক্যে আপত্তি জানিয়ে বললেন, “না, না, না, তা’ হতে পারে না (No, no, no, impossible.”)। যেহেতু এদেশের ৫৬% মানুষ বাংলা ভাষায় এবং মাত্র ৩% মানুষ উর্দুতে কথা বলেন, কাজেই বাংলাই হবে, হতে পারে, হওয়া উচিৎ এদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা,উর্দু নয়। অতঃপর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী বাঙ্গালির মায়ের ভাষাকে কেড়ে নেয়ার আর এক কৌশল বা নতুন ফাঁদ পাতলেন। তারা চাইলেন বাংলা লেখা বাংলা হরফের পরিবর্তে আরবি হরফে লিখতে হবে। (“The central government proposed to write the Bengali language in Arabic script. “) এ এক অদ্ভুত প্রস্তাব। বাংলা ভাষাকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার ষঢ়যন্ত্র।

১৯৫২’র ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বার লাইব্রেরি হলে মৌলানা ভাষানীর সভাপতিত্বে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মি পরিষদ’ গঠিত হলো। সরকারের এহেন আজগুবি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে এদেশের ছাত্র-শিক্ষক এবং সকল স্তরের জনগণ আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। বাংলা ভাষা সমুন্নত রাখার যৌক্তিক দাবির আন্দোলন সংগ্রামকে ভণ্ডুল করার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হলো। আন্দোলন-সংগ্রামরত ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিল। আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশ ছাত্রদের উপর বেপরোয়া গুলি চালালো। শহীদ হলো সালাম, রফিক, বরকত এবং জব্বার সহ আরো অনেকে। আহত হলো অসংখ্য ছাত্র-জনতা। সংবাদটি সাথে সাথে বারুদের মত সারা ঢাকা শহরে এবং অতঃপর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো। ফুসে উঠলো সারা দেশের মানুষ। পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের ‘ট্রেজারি-বেঞ্চ’ এর মৌ. আ. রশিদ তর্কবাগীশ, শরফুদ্দিন আহমেদ, শামসুদ্দিন আহমেদ খন্দকার এবং মশিহ্উদ্দিন আহমেদ ছাড়াও মনোরঞ্জণ ধর, বসন্তকুমার দাস, শামসুদ্দিন আহমেদ এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সহ আরো অনেক আইন পরিষদ সদস্য ‘চীফ মিনিস্টার’ নূরুল আমিনকে অনুরোধ জানালেন, ভাষা আন্দোলনের এই ঘটনায় শহীদদের প্রতি শোক বা দুঃখ প্রকাশ করে ‘এসেম্বলি’ মূলতবি রেখে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের সমবেদনা জানাতে দেখতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু অত্যন্ত দুখেঃর বিষয়, ‘চীফ মিনিস্টার’ তাদের সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন! ফলতঃ বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলন-সংগ্রাম আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো।

২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ : একুশের পরের দিনেও ১৪৪ ধারা জারি করা হলো, যাতে জনতা ‘জানাজা’ ও শোকের মিছিলে অংশ নিতে না পারে। কি মর্মান্তিক এবং অমানবিক শাসন-নির্যাতন! পুলিশের বাধা অমান্য করে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে হাজার হাজার জনতা শহরের চারদিক থেকে মিছিলে মিছিলে যোগ দিতে লাগলো মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চত্তরে। এ মিছিলে শুধু ছাত্র ও রাজনীতিবিদরা ছিল না, ছিল বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, সরকারি বেসরকারি অফিসের চাকুরীজীবী।
রেডিও স্টেশন এর কর্মি-কর্মকর্তারাও অফিসের কাজ-কর্ম বন্ধ রেখে এ শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল চত্তর ও মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাস লাখো মানুষের ভীরে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। সেদিনও ওসমানী উদ্যান সংলগ্ন নওয়াবপুর রোড এলাকায় মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালালে শহীদ হলো সফিউর রহমান ও নয় বছরের বালক ওহিউল্লাহ্। আহত হলো বহু মানুষ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা রাতারাতি মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল এর পাশে গড়ে তুললো শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ। স্মৃতি স্তম্ভ উদ্বোধন করলেন শহীদ শফিউরের পিতা। ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সেটি ভেঙ্গে দিলে ছাত্র-জনতা ক্রোধে ফেটে পড়লো। [ উল্লেখ্য, একবার ১৯৫৪ সালে, এরপর ১৯৫৭ সালে শহীদ মিনারটি প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সেটি ভেঙ্গে ফেলা হলে ১৯৭২ সালে পুনরায় শহীদ মিনারটি বর্তমান অবয়বে স্থাপিত হয়। ]

১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত ‘সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন’ এর দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, রাজবন্দিদের মুক্তি এবং পূর্ববাংলার স্বায়ত্বশাসন। এসব দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রইল। উল্লেখ্য, ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংষদ’ এবং ‘সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন’ এর সদস্যদের অনেকেই ছিলেন বামদলগুলোর সাথে যুক্ত। সেসময় জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভাষা রক্ষার আন্দোলন-সংগ্রাম ধাপে ধাপে এগিয়ে রাজধানী পূর্ববাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। আ. গাফ্ফার চৌধুরীর লিখা ও আলতাফ মাহমুদ কর্তৃক সুর করা-“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?” গানটি ভাষা আন্দোলনের মাত্রাকে যে কি পর্যায়ে নিয়ে গেছিল সেটি বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। গর্বের সাথে বলা যায়, বাহান্নর ভাষা আন্দোলনই হলো স্বাধীনতা আন্দোরনের প্রথম সোপান। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি এলেই এদেশের ছাত্র-জনতা মাতৃভাষা বাংলা রক্ষার জন্য নতুন করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ও আন্দোলন-সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হতে থাকলো। স্মতব্য,ভাষা আন্দোলনের বছরেই ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হলেন রাজশাহীর মোহাম্মদ সুলতান এবং সাধারণ সম্পাদক ঢাকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। যিনি ১৯৫২-’৫৩ সালে ঢাকা জেলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। সে সময় বামদলগুলো নিষিদ্ধ থাকায় সকল রাজনৈতিক কর্মি আত্মগোপণে থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠনভূক্ত হয়ে এবং ছাত্র সংগঠনে জড়িয়ে কাজ করতো। উল্লেখ থাকে যে, পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার অর্জিত সম্পদ লুণ্ঠন ও শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তান বিশেষকরে পশ্চিম পাঞ্জাবকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে থাকলো। পাকিস্তানের রাজধানী প্রথমত করাচি,এরপর রাওয়ালপিণ্ডি, আবার সেখান থেকে ইসলামাবাদে স্থানান্তরিত করে ঐসকল শহরকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হলো। পশ্চিমা সরকারের শাসন-শোষণের প্রতিবাদে বাঙ্গালি জাতির মধ্যে ইস্পাতদৃঢ় একতার জন্ম নিল।
পূর্ব বাংলার ছোট-বড় বেশ ক’টি দল সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গঠিত হলো হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্টের মুল দলগুলো-মৌ.আ. হামিদ খান ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আওয়ামী মুসলিম লীগ (আওয়ামী লীগ), এ.কে.ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি, মৌ. আতাহার আলীর নিজামে ইসলাম এবং হাজী মো. দানেশ এবং মাহমুদ আলীর গণতন্ত্রী দল। অতঃপর এলো সেই প্রত্যাশিত ১৯৫৪’র ‘পূর্ব বাংলার আইন পরিষদ’ নির্বাচন। এ নির্বাচনে দ্বিজাতি-তত্ত্ব নির্ভর ও একমাত্র উর্দু রাষ্ট্রভাষা করার দল মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলো। সর্বোচ্চ আসন পেয়ে পূর্ব বাংলায় গঠিত হলো যুক্তফ্রন্ট সরকার। যুক্তফ্রন্ট গঠনে এদেশের ছাত্রসমাজ ও বাম দলগুলোর ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মত। এর পর শুরু হলো পশ্চিমা শাসক কর্তৃক ভিন্নতর ষঢ়যন্ত্র। চুয়ান্নর নির্বাচনের এক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মুহাম্মদ একটি ‘অর্ডিনেন্স’ জারি করে নির্বাচিত এ সরকারকে বাতিল করলেন। পশ্চিমা শাসকদের কি বিচিত্র রাজনৈতিক খেলা! ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরে এলো ইস্কান্দার মীর্জার সামরিক আইন। অতঃপর মাত্র ২০ দিনের মাথায় মীর্জার পদত্যাগ এবং ২৭ অক্টোবর থেকে শুরু হলো প্রধান সেনাপতি আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। ’৬৬ ’র ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৮ ’র আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ’৭০ এর সাধারণ নির্বাচন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এদেশের মানুষ কিছু পাওয়ার পরিবর্তে, তাদের জড়িয়ে পড়তে হলো অস্তিত্তের লড়াইয়ে। ঝড়লো বহু রক্ত, জাতির ভাগ্যে জুটলো শোষণ আর বঞ্চনা। তাই এ জাতি ধীরে ধীরে ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্ব শাসন, শোষণ-বঞ্চনা এবং সামরিক শাসনের যাতাকল থেকে মুক্তি লাভের জন্য ইস্পাতদৃঢ় একতা নিয়ে সংগ্রামী হয়ে উঠলো। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনও এ জাতির একটি সংগ্রামী ফসল। সামরিক শাসনের পালাবদল-আইয়ুব খানের পর এল ইয়াহিয়া খান। সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হলো। ভেবেছিল, বাংগালী জাতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়বে। শেখ মুজিব তথা আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। কিন্তু বাঙ্গালি জাতি সেদিন ভুল করে নি। সারাদেশে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনলো। এর পরও ষড়যন্ত্রের শেষ হলো না। ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে ক্ষমতা না দিয়ে ভুট্টোসহ অন্যান্য দোসরদের সাথে পরামর্শ করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে বাংলার নিরীহ জনগণের উপর সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করে পালিয়ে গেল পশ্চিম পাকিস্তানে।
সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ও সাতই মার্চের শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং সর্বশেষে ছাব্বিশে মার্চ এর স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙ্গালি জাতি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ ও প্রতিআক্রমণ গড়ে তোলে। সেইসাথে এদেশের ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে আমরাও দেশমাতৃকাকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য ঝাপিয়ে পড়লাম অনন্য এবং প্রাণপণ এক মুক্তিযুদ্ধে।
শুরু হলো মুক্তি যুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস পর বহু রক্ত, সম্ভ্রম, অত্যাচার-নিপীড়নের বদৌলতে এদেশের মানুষ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ ছিনিয়ে আনলো বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। অসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অনেক রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা কি এ জাতি কখনো ভুলুণ্ঠিত হতে দিতে পারে?
দুখিনী সেই একুশ আজ আমাদের এনে দিয়েছে স্বাধীনতা ও মর্যাদা। মোদের মায়ের ভাষা-বাংলা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। একুশ মোদের অহঙ্কার। একুশ নয় শুধু বাঙ্গালির একার, একুশ সবার। একুশ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

-লেখক একজন মুক্তিযোদ্ধা, প্রাক্তন শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, পঞ্চগড় জেলা শাখা সভাপতি।E-mail : hannan368@yahoo.com; Cell. Ph. 01718436584)

0 Shares