Home » জীবনধারা » কোভিড-১৯: গুরুত্বপূর্ণ যখন ভাইরাসের পরিমাণ

কোভিড-১৯: গুরুত্বপূর্ণ যখন ভাইরাসের পরিমাণ

 

নিউটার্ন ডেস্ক :
বিশেষজ্ঞরা যখন মাস্ক পরার, অন্যের কাছ থেকে কমপক্ষে ছয় ফুট দূরে থাকার, ঘন ঘন হাত ধোয়ার এবং ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন, তখন তারা আসলে বলতে চান- আপনি যেন যতটা কম সম্ভব ভাইরাসের মুখোমুখি হন।

গুটিকয়েক ভাইরাল কণা আপনাকে অসুস্থ করতে পারবে না। কারণ আপনাকে অসুস্থ করার আগেই স্বল্প সেই ভাইরাসকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরাভূত করে দেবে। তাহলে প্রশ্ন হল, শরীরে সংক্রমণ জেঁকে বসতে কী পরিমাণ ভাইরাস প্রয়োজন?

এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেয়া অসম্ভব, কারণ ঠিক কখন সংক্রমণ ঘটল, তা টের পাওয়া কঠিন। এ বিষয়ে ধারণা পেতে বিজ্ঞানীরা ফেরেট, হ্যামস্টার এবং ইঁদুরের ওপর গবেষণা করছেন। আর এক্ষেত্রে অবশ্যই গবেষণার জন্য মানুষের ওপর করোনাভাইরাস প্রয়োগ করাটা নীতিসিদ্ধ হবে না, যেমনটা সাধারণ ঠাণ্ডার ভাইরাসের ক্ষেত্রে গবেষকরা করে থাকেন।

নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট অ্যাঞ্জেলা রাসমুসেন তাই এখনও ওই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না।

“সত্য হল, আমরা আসলেই জানি না। আমি মনে করি না যে আমরা আমাদের এতদিনের জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে অনুমান করার চেয়ে ভালো কিছু বলতে পারব।”

ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্য করোনভাইরাস, যেগুলো শ্বাসতন্ত্রের রোগ ঘটায়, সেসব ভাইরাস থেকে হয়ত এ বিষয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া সম্ভব। তবে গবেষকরা এগুলোর মধ্যেও সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছেন খুব কম।

যেমন, সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সার্সের জন্য দায়ী করোনাভাইরাসটির মাত্র কয়েকশ পার্টিকেল কার্যকরভাবে কাউকে সংক্রামিত করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আবার মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা মার্সের সংক্রামণের জন্য কার্যকর ডোজ লাগে অনেক বেশি, হাজার-হাজার পার্টিকেল।

রাসমুসেন বলেন, নতুন করোনাভাইরাস সার্স-সিওভি-২ এর বেশি মিল আছে আগের সার্স ভাইরাসের সঙ্গে। তাই নতুন করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও মাত্র কয়েকশ পার্টিকলে সংক্রমণ সম্ভব- এমন একটি ধারণা হয়ত করা যায়।

কিন্তু মুশকিল হল, এ ভাইরাস নিয়ে যে কোনো ধরনের পূর্বানুমান করাই কঠিন।

সাধারণত, রোগীর মধ্যে যত বেশি পরিমাণে প্যাথোজেন বা রোগজীবাণু থাকে – সেটা ইনফ্লুয়েঞ্জা, এইচআইভি বা সার্স যাই হোক – তাদের মধ্যে লক্ষণও তত মারাত্মক হয়। আর তাদের কাছ থেকে অন্যদের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি থাকে।

কিন্তু নতুন করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এটাও খাটছে না। যাদের লক্ষণ নেই তাদের ভেতরেও ভাইরাল লোড অর্থাৎ দেহে ভাইরাসের পরিমাণ যারা গুরুতর অসুস্থ তাদের মতই বেশি থাকছে বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে।

আবার করোনাভাইরাস রোগীরা উপসর্গ দেখা দেয়া শুরুর দুই থেকে তিন দিন আগে সবচেয়ে বেশি ভাইরাস ছড়াতে পারেন। যখন তারা সত্যি সত্যি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন কম ছড়ান। আবার কিছু লোক করোনাভাইরাস বেশি পরিমাণে ছড়ান; কিছু লোক কম।

এ তো গেল ছড়ানোর কথা, করোনাভাইরাস যাদের শরীরে যাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রেও অনেক কিছু বিবেচনায় আসছে। ব্যক্তির নাকের আকার এবং নাকের ভেতরে রোম ও শ্লেষ্মার উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে কী পরিমাণ ভাইরাস এলে তিনি সংক্রমিত হবেন।

অবশ্যই ভাইরাসের ডোজ যত বড়, বিষয়টা তত খারাপ। এ ভাইরাস সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের বেশি কাবু করে। কিন্তু কিছু তরুণ স্বাস্থ্যসেবা কর্মী কেন বেশি ভোগেন, তা হয়ত এখান থেকে বোঝা যায়।

সক্রিয়ভাবে সংক্রমণ ঘটাতে কী পরিমাণ ভাইরাস লাগবে তা কোনভাবে শরীরে প্রবেশ করছে – শ্বাসের মাধ্যমে, না অন্যভাবে – তার ওপরও নির্ভর করতে পারে।

ভাইরাসের উপস্থিতি আছে এমন পৃষ্ঠতল কেউ স্পর্শ করার পর নাক বা মুখে হাত দিলে ভাইরাস শরীরে ঢুকতে পারে। তবে এটাকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ‘মূল কারণ’ হিসেবে বিবেচনা করছে না যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)।

শ্বাস-প্রশ্বাসের তুলনায় স্পর্শের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে হয়তো ভাইরাসটির আরও কয়েক মিলিয়ন অনুলিপি তৈরির প্রয়োজন হতে পারে।

কাশি, হাঁচি, গান গাওয়া, কথা বলা, এমনকি জোরে শ্বাস ফেলার মাধ্যমে ভাইরাস বহনকারী কয়েক হাজার বড় ও ছোট কণা নাক-মুখ থেকে বের হতে পারে।

বস্টনের বেথ ইসরায়েল ডিকনেস মেডিকেল সেন্টারের ভাইরাল ইমিউনোলজিস্ট ডা. ড্যান বারুশ বলেন, “এটি স্পষ্ট যে ভাইরাস ছড়ানোর জন্য কারও অসুস্থ হওয়া এবং কাশি এবং হাঁচি দেয়ার দরকার নেই।”

সজোরে বাতাস না বইলে অথবা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে জোরে বাতাস বের হলে অপেক্ষাকৃত বড় কণাগুলো ভারী হওয়ায় দ্রুত নিচে পড়ে যায়। এগুলো সার্জিকাল মাস্ক ভেদ করতে পারে না। তবে ৫ মাইক্রনের চেয়ে ছোটো ব্যাসের কণা বাতাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে থাকতে পারে।

বারুশ বলেন, “এরা অনেক দূরে চলে যায়। অনেকক্ষণ ভেসে থাকে। এদের বড় কণার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে সংক্রমণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় – সংক্রামিত ব্যক্তির নৈকট্য, বায়ু প্রবাহ এবং সময়।

অনেক বেশি লোক ব্যবহার করে এমন জানালাবিহীন একটি পাবলিক বাথরুম জানালাসহ বাথরুম অথবা খুব কম ব্যবহৃত হওয়া বাথরুমের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আবার এই দুই পরিস্থিতির তুলনায় মাস্ক পরা প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘরের বাইরে অল্প সময় কথা বলা অনেক কম ঝুঁকির।

সম্প্রতি ডাচ গবেষকরা মুখের ভেতর থেকে কণার বের হওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরির জন্য একটি বিশেষ স্প্রে নজল ব্যবহার করেছেন। কণাগুলোর গতিবিধি লক্ষ্য করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, কেবল একটি দরজা বা জানালা খুললেও কণগুলো বাতাসের ধাক্কায় ছড়িয়ে যায়।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেয়া আমস্টার্ডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ ডানিয়েল বন বলেন, “এমনকি হালকা বাতাসেও কিছু হতে পারে।”

গত এপ্রিলে নেচার জার্নালে প্রকাশিত চিনের উহানের দুটি হাসপাতাল থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণগুলোতে এই একই বিষয় দেখা গেছে। বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ভালো- এমন ওয়ার্ড বা জনাকীর্ণ এলাকার চেয়ে ভেন্টিলেটর বিহীন টয়লেটে বেশি কণা পাওয়া গেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, ৫ মাইক্রনের চেয়ে ছোট কণাগুলো ৫০০ মাইক্রনের কণার চেয়ে মিলিয়ন ভাগের একভাগ ভাইরাস বহন করতে পারে।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী জোশুয়া রাবিনোউইটস বলেন, “আপনার ঝুঁকির মাত্রা বাড়তে আসলে ছোটো আকারের অসংখ্য কণা লাগবে।”

বিশেষজ্ঞরা সবাই বলেন, কোনো ভবনের ভেতর ভিড়ের জায়গাগুলো এড়ানো ছাড়াও যা সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে, তা হল মাস্ক পরা। এমনকি মাস্ক যদি ভাইরাস বহনকারী কণা থেকে পুরোপুরি রক্ষা নাও করে, তা ভাইরাসের ঢোকা কমাতে পারে। হয়ত তাতে শরীরে প্রবেশ করা ভাইরাসের পরিমাণ সংক্রামক ডোজের নিচে থাকবে।

“এটা তেমন ভাইরাস নয়, যার জন্য হাত ধোয়াই যথেষ্ট বলে ধরে নেয়া যাবে। আমাদের জনসমাগম সীমিত করতে হবে, আমাদের মাস্ক পরতে হবে,” বলেন জোশুয়া।

6 Shares