Home » অর্থনীতি » চট্টগ্রাম বন্দরে ডুবে আছে ৩০টি জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দরে ডুবে আছে ৩০টি জাহাজ

নিউটার্ন ডেস্ক
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগরের ৭ নটিক্যাল মাইলজুড়ে তলিয়ে আছে প্রায় ৩০টি ছোট-বড় জাহাজ।
কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের নাব্য হ্রাস পাওয়ায় ডুবে থাকা এসব জাহাজ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও স্বাধীনতার পর রাশিয়ান সমুদ্র অনুসন্ধানী দলের ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর কারণে বন্দরে জাহাজ চলাচলে কোনো সমস্যা হবে না এমন তথ্যের ওপর নির্ভার রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, ডুবে থাকা এসব জাহাজের কারণে বন্দরের কোনো ক্ষতি হবে না। অতীতে হয়নি, বর্তমানেও স্বাভাবিক গতিতে জাহাজ চলছে। ভবিষ্যতেও হবে না। কারণ ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর লোকেশন চিহ্নিত আছে। সেখানে লাল পতাকা প্রদর্শন হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী চ্যানেলে ও বহির্নোঙরে ডুবে থাকা জাহাজগুলোর ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। কেউ কেউ এসব জাহাজ তুলে ফেলার পক্ষে। তাদের অনেকের মতে, অতীতে সমস্যা না হলেও কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরের তলদেশের উচ্চতা বাড়ায় এসব জাহাজ যেকোনো সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
একজন সমুদ্র বিশেষজ্ঞ বন্দরের বহির্নোঙর এলাকাটিকে টাইম বোমার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তেলবাহী ডুবন্ত জাহাজের সঙ্গে এসব ডুবে যাওয়া কোনো জাহাজের ধাক্কা লাগলে ভয়াবহ বিপর্যয় হলে, সেটা ঠেকানো যাবে না। তিনি বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ লাল পতাকা উড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। অথচ একের পর এক জাহাজডুবির ফলে বন্দরের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বড় কোনো জাহাজডুবি না হলেও ছোট ছোট কার্গো জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে। ডুবন্ত জাহাজের কারণে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘদিনের জন্য অচল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাহাজ চলাচলে অভিজ্ঞ একজন নাবিক বলেন, যে লাইন দিয়ে জাহাজ বন্দরের ভেতরে ঢোকে, সেটুকু পরিষ্কার করেই আমরা দায়িত্ব শেষ করছি। কর্ণফুলী যেভাবে দখল হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে দুটি জাহাজ ক্রস করে পাশাপাশি এগিয়ে যাওয়াও কঠিন হবে। নির্দিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে যুগ যুগ কোনো বন্দর চলতে পারে না।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন অংশে ডুবে থাকা এসব জাহাজের কারণে নৌ-চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। বহির্নোঙরেও ঝুঁকি আছে। কারণ এতগুলো ডুবন্ত জাহাজ বিশ্বের আর কোনো বন্দরে নেই। বিভিন্ন দেশে জাহাজ ডুবলেও চর পড়ার আগেই তা উদ্ধার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফরিদুল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন স্থানে যেসব জাহাজ ডুবে আছে, তা বন্দর কর্তৃপক্ষের নজরে আছে। জাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে তোলার পরিকল্পনা বন্দরের আছে। তবে এ মুহূর্তে এমন অনেক প্রকল্প হাতে আছে, যা এর চেয়েও জরুরি। সে কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না।
তিনি বলেন, রাশিয়ান অনুসন্ধানী টিম এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দরকে ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে, ভবিষ্যতে এসব জাহাজের কারণে বন্দরের জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়বে না। বহির্নোঙরের গভীরতা কমছে না। একটি বড় জাহাজের যতটুকু গভীরতা প্রয়োজন তা অব্যাহত রয়েছে।
ক্যাপ্টেন ফরিদ বলেন, ডুবে থাকা জাহাজগুলো তোলা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। এর আগে বেশ কয়েকবার চেষ্টা হয়েছে। ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে এসব জাহাজ তোলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পর্যায়ক্রমে তোলার পরিকল্পনা বন্দরের রয়েছে।
তিনি জানান, তলিয়ে যাওয়া ৩০টি জাহাজের মধ্যে ১০টি জাহাজ উদ্ধারে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। এ জন্য ২০০ কোটি টাকার খরচ প্রয়োজন হবে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। ৯৭-৯৮ অর্থবছরে চালানো এ সমীক্ষায় বিপুল ব্যয়ের প্রসঙ্গটি এলে সব উদ্যোগ থেমে যায়। ২০০০ সালের দিকে ডুবন্ত জাহাজ উদ্ধারে টেন্ডারও ডাকা হয়। একাধিক ঠিকাদার আগ্রহ দেখানোর পরও জাহাজ উদ্ধারের কাজ হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দর সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে বর্ষা মৌসুমে সাড়ে আট ফুট ড্রাফ্‌টের জাহাজ প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। কর্ণফুলীর নাব্য ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে বর্তমান ড্রাফ্‌টের জাহাজ চলাচলও দুষ্কর হয়ে পড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২০ বছরে ১৯টিসহ স্বাধীনতা পূর্ব ও উত্তর সময়ে প্রায় ৩০টি জাহাজ বন্দর চ্যানেল, বহির্নোঙর ও বন্দরসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে ডুবে যায়। এসব জাহাজের কারণে কর্ণফুলীর নাব্য ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু বন্দরের জাহাজ চলাচল স্ব্বাভাবিক রাখার জন্য বর্তমানেও ড্রেজিং বাবদ ২৪২ কোটি টাকা খরচ করছে বন্দর।
বন্দরের মেরিন বিভাগের তালিকা অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর-সংলগ্ন কর্ণফুলী চ্যানেলে এবং বহির্নোঙরে যেসব জাহাজ ডুবে রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ১৯৬৭ সালে ডুবে যাওয়া এমভি স্টার আলটায়ার ও ১৯৭১-এর বিডিআর এস বার্জ নং-১১। ১৯৮৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি বহির্নোঙর এলাকায় ডুবে যায় এসএস কাওয়া নামের অপর একটি জাহাজ।
একই বছর ১৭ই জুলাই কর্ণফুলীতে এমভি সাগর তলিয়ে যায়। ১৯৮৬ সালের নভেম্বর বন্দরে ১ নম্বর জেটির বিপরীতে এমভি সি-হর্স নামের একটি জাহাজ ডুবে যায়। ১৯৮৭ সালের ২৮শে জানুয়ারি বন্দরের বহির্নোঙর এলাকায় ডুবে যায় এমভি টিনা নামের জাহাজ। ১৯৮৮ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর বহির্নোঙর এলাকায় ডুবে যায় এমভি লিটা।
১৯৯০ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি বহির্নোঙরে ডুবে যায় এমভি রয়েল বার্ড। ১৯৯২ সালের ১৬ই মে এমভি ক্রিস্টাল-৯, ১৯৯৩ সালের ২২শে জুলাই ড্রাইডক জেটির কাছে ডুবে যায় আলী-৫। একই বছরের ১২ই ডিসেম্বর রিভার মুরিং-৮ এর কাছে ডুবে যায় বার্জ আর্গোনেট। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজডুবির বছর। এ বছর এমভি মার্জিন, এমভি ইয়াছিন, এমভি মোনালিসাসহ ৫টি জাহাজ ডুবে যায়। ১৯৯৭ সালের ৩০শে জানুয়ারি বহির্নোঙরে ডুবে যায় এমভি আটলান্ডার। এরপর চট্টগ্রাম বন্দরে ডোবে এফভি মিন সন্ধানী।
২০০০ সালে ১ নম্বর জেটিতে আগুন লেগে ডুবে যায় সাউদার্ন কুইন নামের বিশাল জাহাজটি। ২০০২ সালের ১লা জানুয়ারি বহির্নোঙর এলাকায় মাদার ট্যাংকারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুই টুকরো হয়ে মালামালসহ ডুবে যায় এমভি ফজিলত-১।
একই সালের ২০শে মে ডোবে ফায়ারটেক, ৩রা জুলাই ডোবে বিআইডব্লিউটিসির জাহাজ সি-১০৬৩। ২০০৫ সালের ২রা আগস্ট ডোবে এমভি ফরচুন। এসব জাহাজের কলেবর অনেক বড়। ২০০৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় বেশ কয়েকটি কার্গো জাহাজ বন্দরের বিভিন্ন স্থানে ডুবে যায়। যেসব জাহাজে পাথর, লোহাজাতীয় পণ্যসহ বিভিন্ন ভারী পণ্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, ডুবন্ত এসব জাহাজের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা। এসব জাহাজ উদ্ধার করে লোহা-লক্কড় বিক্রি করলেও প্রায় ৩০-৪০ কোটি টাকা আয় হতে পারে।

0 Shares