Home » খেলাধুলা » ছেলেবেলা-৯, প্রসঙ্গ : খেলাধুলা (পর্ব-৪)

ছেলেবেলা-৯, প্রসঙ্গ : খেলাধুলা (পর্ব-৪)

বি এম ইউসুফ আলী :

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি সেনানিবাস যশোরে অবস্থিত। বর্তমানে এখানে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের সদরদপ্তর অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার সেল। এই ক্যান্টনমেন্টের ঠিক পূর্ব দিকেই ভৈরব নদ। এই নদটি ঘেঁষা আমাদের গ্রাম নুরপুর।
ক্যান্টনমেন্ট ও ভৈরব নদ সবসময় আমাদের গ্রামীণ জীবনের উপর প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে । আমরা শৈশবে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যেতাম। সেখানে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলা দেখতাম। ফুটবল, ভলিবল, বাস্কেটবল ইত্যাদি খেলা। সৈনিকদের পাসিংআউটের সময় যাত্রা হত। সেটাও দেখতে যেতাম কখনো সখনো। আবার বিমানঘাঁটিতে প্লেন উঠানামার দৃশ্যও দেখতে যেতাম দূরদূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়দের সাথে। ভারী সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন এই যশোর সেনানিবাসটি। তবে দিনের বেলায় রাস্তায় শেয়ালেরও আনাগোনা ছিল হরহামেশা।
একসময় সেনানিবাসের প্রধান প্রবেশপথটি আমাদের ক্যান্টনমেন্ট খয়েরতলা বাজারের সাথেই ছিল। এরপর এটি চলে যায় শানতলায় সিগন্যাল সেন্টারের কাছে। এখন অবশ্য প্রধান গেটটি খয়েরতলা কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের উল্টো দিকে। বর্তমানের এই গেটটি বাইরে থেকে দেখতে খুব সুন্দর। যাহোক, পুরাতন খয়েরতলা বাজারের এমপি চেকপোস্ট পার হলে রেললাইন। তারপর একটু এগিয়ে গেলেই রাস্তার বামপাশে ছিল হকি খেলার মাঠ। আর তার উল্টোদিকে ফুটবলের মাঠ। আমরা সমবয়েসী ছোটরা দলবেঁধে ওখানে হকি খেলা দেখতে যেতাম। কোন দল ভালো খেলত তাও জানতাম। সেরা সেরা হকি খেলোয়াড়দের নাম ছিল মুখস্থ। এভাবেই আমরা একসময় হকি খেলার অনুরাগী হয়ে উঠি এবং তা ভালোবাসায় পরিণত হয়। শুধু কী এর প্রতি টান? না। ফুটবল আর হাডুডু খেলার মত কৈশোরে হকি খেলাও আমাদের একটি জনপ্রিয় খেলা ছিল। বাংলাদেশের কোনো গ্রামে আমাদের বয়সীরা হকি খেলেছে কিনা জানি না। বড় হয়ে জেনেছি গ্রিসে এই খেলার উৎপত্তি ধরা হলেও তা পূর্ণতা পায় ইংল্যান্ডে। ১৯৫৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ হকির আয়োজন করা হয়।
আজ থেকে প্রায় ৩৫- ৪০ বছর আগের কথা। বাঁশ দিয়ে হকি স্টিক এবং বাঁশের গিরা দিয়ে বল তৈরি করে খেলতাম। হকি স্টিক বানানোর জন্য বিশেষ ধরনের বাঁশ প্রয়োজন হত। যে বাঁশের গোড়া হকি স্টিকের অগ্রভাগের মত বাঁকা হত সেটাই আমরা বাঁশঝাড় থেকে সংগ্রহ করতাম। এপাড়া ওপাড়ার বিভিন্ন বাঁশ বাগানে আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে খুঁজতাম সেই ধরনের বাঁশ । পছন্দসই হলেই তা কেটে আনতাম। একাজ করতে গিয়ে কতই না বকা খেয়েছি তার ইয়াত্তা নেই। আমাদেরও বাঁশবাগান ছিল। এখনো সেটি আছে।সেখান থেকেও বাঁশ কেটে হকি স্টিক বানাতাম। স্কুল ছুটির দিনে বা বিকেলে আমরা বাঁচড়া ( অব্যবহৃত জমি) জমিতে আমরা হকি খেলতাম।
শীতকালের খেলা হকি। শুধু সেনাবাহিনীর সদস্যদের খেলা দেখেই আমরা বন্ধুরা মিলে খেলতাম। মফিজ, সোহরাব, আশরাফ, টেংরা ও তার ভাই মিজানুর, হিটলু, রমজান, হারুন, হাবিব ও তার ভাই আক্তার, মহসীন, ইসরাইল ( সদ্য প্রয়াত), নওশের (বাড়ে)সহ আরো অনেকেই হকি খেলত। আমরা হকি খেলতাম ঠিকই কিন্তু নিয়মকানুন পুরোপুরি জানতাম না। বেশ ঝুঁকিপূর্ণ খেলা হলেও খেলার সরঞ্জাম বলতে শুধুই ছিল হাতে তৈরি সেই বাঁশের হকি স্টিক ও বল। আরাম এবং নিরাপত্তার জন্য এই খেলায় বিশেষ সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়। যেমন স্কেইট, শিরস্ত্রাণ, উরশ্ছদ, হাফপ্যান্ট, গ্লাভস। এগুলো আঘাত থেকে শরীরকে সুরক্ষা করে। আমরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করতাম না। যার মাশুল দিতে হত অনেক সময়। হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া, পা মোচকে যাওয়া ছিল নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা।
একদিন আমরা হকি খেলছি। বেলা ১১-১২ টা হবে। মুনসুর ও সিদ্দিক চাচাদের জমিতে। আমাদের পাড়ার দক্ষিণ মাঠে তখন খড়ের ভূঁই ছিল। আমাদের খড়ের ক্ষেতের ঠিক পশ্চিম পাশে জমিটি। এখানে কোনো চাষাবাদ হত না। এমনিতেই পড়ে থাকত। মাঝেমধ্যে মিষ্টি কুমড়ার গাছ লাগাতে দেখতাম। আমাদের গ্রামের আব্বাসের বিল থেকে একটি খাল ভৈরব নদে গিয়ে পড়েছে। খালের দক্ষিণ পাড়ে এই ক্ষেতটি। তো খেলা চলছে। একসময় হঠাৎ করে হকির বল এসে সজোরে আঘাত করল বন্ধু মফিজের ডান চোখ উপরের দিকে কপালে। অঝোরে রক্ত পড়া শুরু হল। কার মারা বলের আঘাতে এটি ঘটেছিল তা মনে নেই। তবে আমরা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তখন বয়স কতইবা হবে ১২/১৩ বছর। সেই যে খেলা বন্ধ হল আমরা আর হকি খেলেনি। এমনকি আজ অবধি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাউকে খেলতে দেখেনি বা শুনিনি।
লেখক পরিচিতি :  কলামিস্ট ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ; bmyusuf01@gmail.com

24 Shares