Home » জীবনধারা » জলেই যে জীবন লাইলীর

জলেই যে জীবন লাইলীর

নিউটার্ন ডেস্ক: গ্রামের মহিলারা ঘিরে ধরে গল্প শুনতে চাইতেন। নদী আর সমুদ্রের গল্প। যেখানে শুধু জল আর জল। যেখানে শাকসবজি কাটার জো নেই, ভাত রান্না নেই। আছে শুধু নিজের যন্ত্রচালিত নৌকা আর জাল। সঙ্গী কয়েকজন পুরুষ মৎস্যজীবী। তাঁদের সঙ্গে মাছ ধরছেন লাইলী। ঘর-গৃহস্থালিতে অভ্যস্ত মেয়েরা বিস্ময়ে ১৫ বছর ধ‌রে লাইলী‌কে প্রশ্ন ক‌রেন, ‘কী করে পার আপা’!

লাইলীর সোজাসাপটা কথা, যতটা সহজে সমুদ্র সফরের কথা বলা যায়, মাছ ধরার কাজটা ততটা সহজ নয়। নদীর মোহনায় আর সমুদ্রেও লড়াই আছে। লাইলীর মাছ ধরার নৌকাকে ট্রলার বলা যায় না। সেটা যন্ত্রচালিত বড় নৌকা মাত্র। এখন মাঝ সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় বড় বড় ব্যবসায়ীর অত্যাধুনিক ট্রলার। সেই ট্রলারের যন্ত্র খুঁজে দেয় মাছের ঝাঁক।

প‌রি‌বেশ প‌রি‌স্থি‌তি লাইলী‌কে বলে দেয়, কোনখানে কত স্পিডে ট্রলার চালাতে হবে। ওই ট্রলারই জাল ছিঁড়ে দেয় লাইলীদের মতো ভটভটি সম্বল মৎস্যজীবীদের। তবু লড়তে হয় ত্রিশোর্ধ্ব লাইলী‌দের। এক দিন রাতে বেরিয়ে পড়তে হয় ভটভটি ‘মা‌য়ের দোয়া’কে নিয়ে। ছে‌টি খাল বেয়ে ‌বিষখালীর মোহনা থে‌কে মা‌য়ের দোয়া ঝাঁপায় বঙ্গোপসাগরে।

লাইলী মানে লাইলী বেগম। বয়স ৩৫ ছুঁই ছুঁই। বি‌য়ে করেন‌নি। বৃদ্ধ বাবা মা‌য়ের সংসা‌রে একমাত্র উপার্যনক্ষম ব্য‌ক্তি। বাড়ি সাগরতী‌রের বরগুনায়। লাইলী প্রথম সমুদ্রে যাওয়া নারী মৎস্যজীবী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। ছিলেন মৎস্যজীবীর সন্তান। বাবার দুর্বিপাকে যোগ্য সন্তা‌নের মতো পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে সংসার ডাঙায় ফেলে জলে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

মাছ ধরতে যাওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না লাইলীর। সাগরতী‌রের গ্রা‌মে মাছ আ‌য়ের একমাত্র মাধ্যম। তবুও পরিবারকে ভরসা জোগান তিনি। বরগুনায় চি‌কিৎসা‌সেবা নি‌তে গি‌য়ে দু-একবার ট্রলারে চেপেছিলেন। সেই ভরসাতেই বলেন, সাগ‌রে মাছ ধরতে যাবে। আমি ট্রলার চালাব। প‌রিবা‌রের সদস্যরা তেমন উৎসাহ দেখাননি।

কিন্তু মে‌য়ের জেদের কাছে হার মানেন শেষ পর্যন্ত। মা‌কে বাড়ি রেখে জেলে‌দের সঙ্গে ভেসে পড়েন সমুদ্রে। সেই সময়ে তাঁর সিদ্ধান্ত বিস্মিত করেছিল স্থানীয় মৎস্যজীবী সমাজকে। পড়শিদের তো বটেই। সে জন্যই মাছ ধরে ফিরলে মেয়েরা সমুদ্রের গল্প শোনার জন্য ঘিরে ধরতেন।

চেয়েছিলেন বাবার রেখে যাওয়া ৩০ শতাংশ জমিতে কৃষিকাজ করে অভাব আর দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়বেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে বেছে নিলেন আরো কঠিন এক পথ। সাগর তীরবর্তী বরগুনার নারী লাইলি বেগম বহু বাধা আর প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন একজন সমুদ্রচারী মৎস্যজীবী হিসাবে। বরগুনায় তিনিই একমাত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত নারী জেলে। সাহস দেখিয়েছিলেন বলে স্বীকৃতিও মিলেছিল।

প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকার মানুষের সমালোচনা উপেক্ষা করে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিষখালী নদীতে নৌকা জাল বাইছেন সংগ্রামী এই নারী লাইলী বেগম। বাবার মৃত্যুর পর অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব ছেড়ে দেয় ভাইয়েরা। মাকে ছেড়ে কোথাও যাওয়ার উপায়ও নেই। সে কারণে বিয়েও করেননি তিনি।

বরগুনা জাগো নারীর নির্বাহী প্রধান হোসনে আরা হাসি বলেন, উপকূলে মানুষের জীবন সংগ্রামের চিত্র অনেকটা এমনই। মনে করেন, লাইলী বেগমের মতো সংগ্রামী নারীদের দরকার সরকারের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

আজ ১৫ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। অর্থনৈতিক কাজে নারীদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। বলা হয় যে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে কৃষিকাজসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে নারীদের ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও তাদের সেই কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

নিউটার্ন.কম/RP

0 Shares