Home » অর্থনীতি » জাহাজ বানিয়ে বছরে ৩৪ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য

জাহাজ বানিয়ে বছরে ৩৪ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য

 

নিউটার্ন ডেস্ক
জাহাজ নির্মাণ করে প্রতি বছর ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয় সম্ভব বলে মনে করছে সরকার। এ জন্য সম্ভাবনাময় এই খাতকে সহায়তা দিতে একটি নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় এই নীতিমালা করছে। খসড়া নীতিমালায় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মতো এই খাতে বিনিয়োগকৃত ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিগত কয়েক বছরে দেশের শিপইয়ার্ডগুলো ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ৪০টি জাহাজ রপ্তানি করে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে আগামী পাঁচ বছরে জাহাজ রপ্তানির মাধ্যমে বার্ষিক প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার আয় (স্থানীয় মুদ্রায় ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা) সম্ভব হবে এবং ১ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। জাহাজ নির্মাণ শিল্প বিষয়ক উন্নয়ন নীতিমালা, ২০১৯-এর এই খসড়াটির ওপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে গত ২১ আগস্ট চিঠি দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। চলতি মাসের (৩০ সেপ্টেম্বর) মধ্যে এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে একটি দীর্ঘ উপকূলীয় সীমারেখা ছাড়াও প্রায় ২০০টি ছোটবড় নদী রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ হাজার ১৫৫ মিটার। এই উপকূলীয় অঞ্চলে নৌযান তৈরিতে ২০টি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও ১০০টি স্থানীয়মানের শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিপইয়ার্ডগুলো বছরে গড়ে ১০০টি জাহাজ নির্মাণে সক্ষম। দেশে বর্তমানে ১০ হাজার মেট্রিকটন (ডিডাব্লিউটি) ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণ হচ্ছে। সূত্রগুলো জানায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আকর্ষণীয় শিল্পখাত হিসেবে উঠে এসেছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে শিল্পখাতে আমূল পরিবর্তন সূচনা করে জাপান। সেসময় জাপানের কাছে বাজার হারায় ইউরোপের জাহাজ নির্মাণ খাত। ১৯৭০ সালে জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। চীন এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ নির্মাতা দেশ। ২০০৮-১০ সালে বৈশ্বিক সংকট চলাকালে মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শ্রেণিভুক্ত জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়াকে পেছনে ফেলে তারা। বর্তমান বিশ্বে প্রধান জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে চায়না স্টেট শিপবিল্ডিং করপোরেশন, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই এইচআই, দাইয়ু শিপবিল্ডিং এবং স্যামসাং এইচআই।

চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি জাহাজ নির্মাণ শিল্পে এগিয়ে আসছে বাংলাদেশও। এটি এখন এদেশের সর্বাধিক সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি।

বৈশ্বিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ এজেন্সি বিজনেস অয়্যারের মতে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ২০ হাজারের বেশি নতুন জাহাজ নির্মাণে ব্যয় করা হবে ৬৫০ বিলিয়ন ডলার। এদের বেশির ভাগই ছোট থেকে মাঝারি আকৃতির জাহাজ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের মতো জাহাজ নির্মাণ শিল্পে এগিয়ে থাকা দেশের শিপইয়ার্ডগুলো ইতিমধ্যেই আগামী ১০ বছরের জন্য বড় আকৃতির জাহাজ নির্মাণে অগ্রিম কার্যাদেশ পেয়ে গেছে। তাই ছোট ও মাঝারি জাহাজ নির্মাণের জন্য সবাই বাংলাদেশের মতো উদীয়মান জাহাজ নির্মাণ দেশের দিকে ঝুঁকবে ডব্লিউটিও-এর হিসেবে বিশ্বে সমুদ্রগামী ছোট জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বার্ষিক বাজার ৪০০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ এর মাত্র এক শতাংশ বাজার ধরতে পারলেও তা হবে চার বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের দীর্ঘ উপকূল, অসংখ্য নদ-নদী এবং সস্তা শ্রম জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। তবে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটির বিকাশে বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে যে ধরনের সহযোগিতা বিদ্যমান বাংলাদেশে তা নেই। শুধু তাই নয়, জাহাজ নির্মাণে এ পর্যন্ত কোনো নীতিমালাও হয়নি।

কর্মকর্তারা জানান, এটি একটি শ্রমঘন শিল্প। এখানে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। জাহাজ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে এই খাতটির উন্নয়নে একটি নীতিমালা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

খসড়া নীতিমালার আর্থিক ও বিনিয়োগ প্রণোদনা অংশে বলা হয়েছে, সরকারের চলমান মেগা উন্নয়নে অংশীদার হিসেবে জাহাজ নির্মাণে সম্পৃক্ত শিপইয়ার্ডগুলোর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করা দরকার। এই খাতে সর্বোচ্চ সুদের হার ৪ শতাংশ নির্ধারণ এবং প্রদেয় ঋণ পরিশোধে ৫ বছর মরেটরিয়ামসহ ২৫ বছরে পরিশোধের সুযোগ রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে। সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে শিপইয়ার্ডগুলোকে ১০ বছরের ট্যাক্স হলিডে সুবিধা এবং স্বল্প খরচে সার্বভৌম ব্যাংক গ্যারান্টির জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকার নন ফান্ডেড তহবিল গঠনের কথা উল্লেখ রয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আর্থিক সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিনিয়োগকৃত মূলধনের বিপরীতে উচ্চ সুদের হার কমানো এবং তা দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধের সুযোগের জন্য একটি নীতিমালা দরকার। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে কিছু বিষয় আছে যেমন : স্বল্প খরচে সার্বভৌম ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু সুবিধা, পারফরমেন্স গ্যারান্টি, এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) সুবিধার জন্য ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার একটি নন-ফান্ডেড তহবিল গঠনের বিষয়েও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।

0 Shares