Home » মতামত » দুই সহোদর মুক্তিযোদ্ধা একেএম হাফিজুর রহমান দুলু ও মফিজুর রহমান নিলু

দুই সহোদর মুক্তিযোদ্ধা একেএম হাফিজুর রহমান দুলু ও মফিজুর রহমান নিলু

 

বি এম ইউসুফ আলী : ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ যাতে ক্ষমতায় যেতে না পারে এ নিয়ে যড়যন্ত্র শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর প্ররোচনায় ও চাপে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকার জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত ঘোষণা করেন। এই স্থগিতকরণের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ৭ মার্চ ১৯৭১ এ একটি গণসমাবেশের আয়োজন করে। এই সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলেছিলেন, যার যা আছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে৷
এদিকে ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন। ১৬ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার জন্য বৈঠক শুরু করেন। ভুট্টোও আলোচনায় যোগ দেন।

আরও পড়ুন :

বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন এবং ব্যবস্থাপনার খসড়া কৌশলপত্র চূড়ান্তকরণ

দেশে সোনার দাম কমল

কিন্তু ১৬ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত আলোচনায় সময় গড়িয়ে গেলেও সমাধান মিললো না। উল্টো ২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগের পর পাকিস্তান পৌঁছানোর আগেই ঢাকায় গণহত্যা শুরু হয়৷ আর সেই রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে৷ কিন্তু তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৬শে মার্চ রাতের শুরুতেই ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়ে যান।

শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সশস্ত্র সাজে সজ্জিত হয়ে নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করছে। নারী, পুরুষ, শিশু কেউই তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। নির্বিচারে সবার ওপর গুলি চলছে।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ঘটনা। যশোর শহরতলীর নুরপুর গ্রামে পাক হানাদার বাহিনী বর্বরোচিত হামলা চালায়। কাশিমপুর ইউনিয়ন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মুন্সি বজলুর রহমান। রাজাকারের মাধ্যমে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এটা জানতে পারে। সেদিন তারা মুন্সি বজলুর রহমানের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং সেল মেরে বাড়ির ছাদ উড়িয়ে দেয়া হয়। তাদের হাত থেকে রেহাই পেতে নিজ বাড়ি ছেড়ে পরিবারের সকলকে নিয়ে মেয়ের বাড়ি বালিয়া ঘাট গ্রামে আশ্রয় নেন। তার চার ছেলে সন্তানের মধ্যে তৃতীয় ছেলের নাম একেএম হাফিজুর রহমান দুলু ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়তো যশোর কলেজে (বর্তমান সরকারি এম এম কলেজ)। চতুর্থ ছেলের নাম মফিজুর রহমান নিলু। নিলুর বয়স তখন ১৫ বছর হবে। তারা বয়সে নবীন। তাছাড়া একটু জেদি প্রকৃতিরও ছিল। চোখের সামনে দেখা এমন বর্বরোচিত সেই ঘটনা তারা যেন ভুলতেই পারছিলেন না।
আশেপাশের অনেকেই তখন মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছেন। সহোদর দুলু ও নিলু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন তারাও মুক্তিযুদ্ধে যাবেন এবং শপথ নিলেন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এই বর্বরোচিত হামলার সমুচিত জবাব না দিয়ে তারা ঘরে ফিরবেন না। তারা নিজ গ্রামের মফিজুর রহমান মফিজ, মতিউর রহমান মতি এবং পার্শ্ববর্তী কনেজপুর গ্রামের রকিবের সাথে গোপনে যোগাযোগ করেন।
এবার তারা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন। যাবেন ভারতে। প্রথমে তারা গেলেন যামুলতা গ্রামে। পরের দিন সকালে রকিবের মামার বাড়ি মুক্তারপুরে পৌঁছান। সেখান থেকে কালিপুর ঘাট পার হয়ে ভারতের বয়রা বাজারে পৌঁছান এবং বয়রা থেকে বনগাঁ টালিখোলা মুক্তিযোদ্ধা যুব ক্যাম্পে যোগ দেন।
এরপর টালিখোলা ক্যাম্প হতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিহার প্রদেশ শিংভুম জেলার চাকুলিয়া ক্যান্টনমেন্টে ট্রেনিংয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই ৪০ দিন ব্যাপি গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন।
প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধকালীন ৮নং সেক্টরের সদর দপ্তর কল্যাণীতে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে অঞ্চল ভিত্তিক ভাগ করে দেয়া হয়। এরপর দত্তপুলিয়া থেকে পেট্রোপোল হয়ে বয়রাতে আসেন। প্রতিটা গ্রুপে ১১ জন করে ভাগ করে দেয়া হয়। তাদের দলনেতা বা কমান্ডার ছিলেন একেএম হাফিজুর রহমান দুলু।
মুক্তিযুদ্ধের জন্য তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দেয়া হয়। অস্ত্র নিয়ে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের এই গ্রুপটি যশোরের সলুয়াবাজার থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে প্রাণপণ বাজি রেখে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের সাথে যুদ্ধ করেন।
চুড়ামনকাটি বাজার থেকে চৌগাছা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বড় বড় সাঁজোয়া যান নিয়ে অনায়াসে যাতায়াত করতো। পরিকল্পনা করা হয় এটি বন্ধ করতে হবে। তারা জুন মাসের শেষের দিকে সলুয়া ব্রিজটি এক্সপ্লোসিভ দিয়ে ধ্বংস করে দেন। এটিই ছিল তাদের প্রথম অপারেশন।
সম্ভবত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ হবে। সাজিয়ালী বাজার এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে ২ জন রাজাকার নিহত হয়। সেই খবর পেয়ে তারা অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করে। তখন দুলু তার সঙ্গীদের নিয়ে সেখান থেকে কিছুটা পিছু হটে যান এবং কৌশল পরিবর্তন করে তারা পুনরায় আক্রমণ করেন। সদস্য সংখ্যায় কম হলেও তাদের মনোবল ছিল অটুট। এভাবে যুদ্ধ চলতে থাকে এবং কিছুদিন পর তারা জয়ী হন।
পরবর্তীতে একদিন তারা খবর পান শ্যামনগর নন্দন সাহ পুকুর পাড়ে অনেক পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার যৌথভাবে হামলার পরিকল্পনা করছিল। এই সংবাদ পেয়ে তারা সেখানে যান এবং তাদের আশেপাশে অবস্থান নেন এবং পরিকল্পনা করে আক্রমণ করেন। অন্য গ্রুপের কিছু সংখ্যাক মুক্তিযোদ্ধা তাদের সাথে যোগ দেন। এই যুদ্ধে আমাদের কামারগণ্যের মান্নানসহ ২ জন শহীদ হয়। প্রতিপক্ষের ৩/৪ জন রাজাকার ও এক জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। এইভাবেই তারা একে একে বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করার নেশায় মেতে ওঠেন এবং চূড়ান্ত বিজয়ের আগেই ৬ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় যশোর।

যে স্বপ্ন ও আশা নিয়ে এই দুই সহোদর একেএম হাফিজুর রহমান দুলু ও মফিজুর রহমান নিলু মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন সেটি আজও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি বলে তারা মনে করেন। তারা এও জানান এখনো কিছু মানুষের কাছে কিছু মানুষ পরাধীন।
লেখক পরিচিতি : কলামিস্ট ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক

0 Shares