Home » সাহিত্য » পরম আনন্দের সেই দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল?-২

পরম আনন্দের সেই দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল?-২

এম. এ. হান্নান : আমাদের গ্রামের অনন্য বৈশিষ্ট- নাম: কালারামজোত। এ গ্রামের বৈশিষ্ট হলো-গ্রামের পূর্বে দিগন্ত-বিস্তৃত খোলা মাঠ, পশ্চিমে সুউচ্চ-সড়ক এবং হিমালয় থেকে বয়ে আসা মহানন্দা নদী, উত্তর পাশসংলগ্ন বিদ্যালয়, দক্ষিণে পাশাপাশি দু’টো গ্রাম।

অত্র অঞ্চলে কিছু কিছু গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে ব্যক্তি-বিশেষের নাম এবং জায়গা-জমির পরিমাণের উপর ভিত্তি করে। যেমন- শারিয়ালজোত, সাহেবজোত, কৃষ্ণকান্তজোত, বদিনাজোত, কলিমজোত, বিড়াজোত, পেলকুজোত, কালাজোত, মুহুরিজোত, মহলালজোত, কালারামজোত, ইত্যাদি। একটি জোত কত পরিমাণ জায়গা-জমি নিয়ে গঠিত হয় তার একটি ধারণা উপস্থাপন করছি। যেমন, আমাদের গ্রামটির নাম কালারামজোত। জোত হলো-একটি নির্দিষ্ট জমির পরিমাণ সম্বলিত এলাকা। আমাদের গ্রামটি পূর্ব-পশ্চিমে আনুমানিক ২ কিঃমিঃ এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১/২ কিঃমিঃ। গ্রামের জনগণের বসতবাড়ির পূর্বদিকে ২/৩ ভাগ জায়গাজুড়ে নিচু আবাদি জমি, যাকে বলে দহলা। আর বসতবাড়ির পশ্চিমে ১/৩ ভাগ জায়গা। সেখানেও চাষাবাদ হয়। গ্রামের মাত্র ১০০ গজ পশ্চিমেই উত্তর-দক্ষিণ বরাবর কলকাতা-টু-দার্জিলিং ‘হাই-রোড’; রোডের আনুমানিক ৩০০ গজ পশ্চিমে হিমালয় থেকে বয়ে আসা মহানন্দা নদী, বয়ে চলেছে কুলকুল রবে। ইদানিং সে নদীতে তেমন জল না থাকলেও আমার শৈশব-কৈশোর কালে নদী থাকতো জলে পরিপূর্ণ, অর্থাৎ ভরাট নদী। নদীর পশ্চিমেই পশ্চিম বঙ্গ। গ্রামের উত্তর পাশসংলগ্ন বুড়িমুটকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর চকচকির মাঠ। মাঠের উত্তরেই (মহানন্দা নদীর পূর্বপারে) বিশাল গহীন জঙ্গল। এখানেও নদীর পশ্চিম পারেই ভারতের পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য। আমাদের গ্রামের দক্ষিণে মহলালজোত এবং সর্দারপাড়া গ্রাম। উত্তর-দক্ষিণ বরাবর হাইরোডের দু’ধারে ছিল প্রকাণ্ড আকারের নানান জাতের গাছ। ফলফলাদি গাছ ছাড়াও কদম্ব, পাখুরি, বট ও কৃষ্ণচূড়ার গাছও ছিল। বর্ষাকালে কদম্ব গাছে কদম্ব ফুলের যে ডালি সাজানো থাকতো সেসব ফুল নিয়ে কত যে খেলা করতাম সেকি আর বলার। কদম্ব ফুলের উপরিভাগ অত্যন্ত মোলায়েম ও রঙ্গিন। শুধু ফুলের রং ও গন্ধ নিয়ে মাতামাতি নয়, সেই কদম্ব ফুল ও ফল নিয়ে হরেক রকম খেলাও খেলতাম, এমনকি কদম্ব ফল পাকলে সেসব ফল খেতামও।
বর্ষাকলে গাছে-গাছে কদম্বফুলের রঙ্গের বাহার দেখার মত, তথা ঐসময় প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সাজতো। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কদম্ব ফুল নিয়ে আনন্দ উপভোগ করার বিষয়টি শুধু উপলব্ধি করা যায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। পাকা রাস্তার উভয় পাশে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ডোবাগুলো বর্ষাকালে বৃষ্টি-বন্যার জলে কাণায় কাণায় ভরে যেতো। জলের উপর শাপলা, পদ্ম ও কলমিফুলের রঙ্গের ছটা এখনো স্বপ্নের মত চোখে ভাসছে।শাপলা ফুলের স্থানীয় নাম হেলা-ফুল। এর কাণ্ড ভেঙ্গে-ভেঙ্গে মালা বানাতাম, ফুলটি থাকতো নিচের দিকে। বিশেষকরে মেয়েদের এ মালা খুবই পছন্দের। [কোথাও কোথাও এফুলের কাণ্ড সব্জি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।] ছোট বেলায় রাস্তা ধারের গাছ-গাছালি, কদম্ব-শাপলা-পদ্ম-কলমি ফুল ও স্কুল-মাঠে নানান খেলা নিয়েই পড়ে থাকতাম। আমাদের গ্রামের উত্তর এবং দক্ষিণ পাশ দিয়ে সীমানা বরাবর চওড়া আইল বা চলাচলের উঁচু রাস্তা ছিল পূর্ব দিগন্ত বিস্তৃত। শরৎ ও হেমন্তকালে ঐ রাস্তাগুলোর ধার বরাবর এবং বিশেষকরে মহানন্দা নদীর পূর্বধারে বালুচড়ে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে কাশফুলের বিপুল সমারোহ ঘটতো। কাশফুলের বাতাসে দোলন আর নাচন আজও যেন হৃদয়পটে এঁকে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হতো কাশফুলের শুভ্র ও মোলায়েম শীষগুলো যেন দিগন্তের নীল আকাশ এবং নদী ও খাল-বিলের নীল জলরাশির সাথে মনের সুখে খেলা করছে। কখনো কখনো মনে হতো নদীর ধার দিযে শুভ্রপাল তোলা নৌকোগুলো সারিবেঁধে নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলেছে কোন্ সেই পাহারের দেশে। কেননা হিমালয় পর্বতমালা এবং তার উপর কার্শিয়াং ও দার্জিলিং শহরতো ঐদিকেই । এসব দৃশ্য কখনও কি ভোলা যায়? হেমন্তের গ্রামবাংলা কেমন সাজে নিজেকে সাজায় সেকি কোন বাঙ্গালি ব্যক্তিকে বা প্রকৃতিপ্রেমিককে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে? এসময় মাঠ-ঘাট, দিগন্ত বিস্তৃত খাল-বিল আমনধানের সবুজশীষ ও প্রস্ফুটিত ধান-ফুলের মৌ সবকিছু মিলে প্রকৃতিকে যেন সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতা দান করে। হেমন্তে ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে সুগন্ধি ধানের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যেতাম। এসময় আমরা ছোটরা প্রকৃতির মাঝে যেন আনন্দ-উৎসবে হারিয়ে যেতাম। শরৎ ও হেমন্তে গ্রামে-গঞ্জে মেলা বসতো। মেলা থেকে হরেক রকমের খেলনা ও বাঁশি কিনে আনতাম। আর সেই খেলনা ও বাঁশি নিয়েই মেতে থাকতাম দিনের পর দিন, ওসব বিনষ্ট হওয়া অবধি। এভাবেই কেটেছে আমার এবং অন্যান্য খেলার সাথিদের শৈশব-কৈশোর এর দিনগুলো। এখন ওসব স্মৃতি, শুধুই স্মৃতি। সে স্মৃতিময় পরম আনন্দের ও সুখের দিনগুলোর কথা কখনও কি ভোলা যায়? ৩ অক্টোবর, ২০২০ খ্রিঃ
লেখক: একজন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত গেরিলা বাহিনীর সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষানুরাগী এবং সমাজসেবী।

0 Shares