Home » Uncategorized » পরম আনন্দের সেই দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল? -১

পরম আনন্দের সেই দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল? -১

 

 

 

আমার শৈশব-কৈশোর কাল যেভাবে কেটেছে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমাদের গ্রামটির রুপ ছিল ঋতু-বৈচিত্রে ভরা। বিভিন্ন ঋতুতে প্রকৃতির বিভিন্ন রুপ এমনভাবে ফুটে উঠতো তার সঠিক বর্ণনা করা দুরূহ বিষয়। একমাত্র কল্পনা করা যেতে পারে, সেটাও শুধু ভূক্তভোগীর পক্ষেই কেবল সম্ভব। যা’হোক, গ্রীষ্মকাল এলেই ধুম পড়ে যেত আম কুড়োনোর। কেননা গ্রামে আমগাছের সংখ্যা ছিল অনেক। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আর বর্ধমান রোড (কলকাতা-টু-দার্জিলিং)অতি সন্নিকটেই। বিদ্যালয় মাঠ আর বর্ধমান রোড পরিবেষ্টিত ছিল আম, কাঁঠাল, জাম, কদম্ব এবং আরও বিচিত্রসব গাছে। আমের নামও ছিল বিচিত্র, আমের সাইজ-স্বাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যরেখে। এখন ঐসব নাম ভুলেই গেছি। কিন্তু আমের স্বাদ এখনও মুখে লেগেই আছে। ওটি ভোলার নয়। ইদানিংকালের আম-কাঁঠালের গাছের আকার-আকৃতির ন্যায় তখনকার গাছগুলো এতো ছোট ছিলনা, ছিল প্রকাণ্ড আকৃতির এবং সুউচ্চ। এমনিতেই সকালবেলা আম পড়ে থাকতো প্রতিটি গাছের তলায়। আর যদি বাতাস বা ঝড় উঠতো তাইলে তো আর কোন কথায় নেই-আম কুড়ানোর ধূম লেগে যেতো। গ্রামে লিচু গাছের সংখ্যা ছিল কম।

 

আরও পড়ুন :

 

একুশ থেকে স্বাধীনতা – এম. এ. হান্নান

ব্রাজিলে বাংলাদেশ দূতাবাসে মহান একুশে উদযাপন

কিন্তু পেয়ারা গাছের সংখ্যা ছিল উল্লেখ করার মত। তবে আমরা তথা আমাদের পরিবার কখনও লিচুর অভাব বোধ করি নি। কারণ, আমাদের বাড়ির ভিতর আঙ্গিনায় ছিল একটি বিশাল আকৃতির লিচু গাছ। এর ফলগুলোর সাইজ ছিল যেমনই বড়, তেমনই সুমিষ্ট। ইচ্ছে হলেই আমরা দু’ভাই(কোলে-পিঠের)গাছে উঠে পেটপুরে লিচু খেয়ে তারপর গাছ থেকে নামতাম। বাঁধা কেউ দিত না। কারণ, লিচু বিক্রি করা হতো না। ছোট্ট গ্রাম, লোক সংখ্যাও কম। এক সিজনে অন্তত দু’চারবার তো সবার বাড়িতে লিচু বিলানো হতোই। গ্রামের ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েরা তো লিচুর সিজনে আমাদের বাড়িতেই পরে থাকতো। আমাদের গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে ছিল চকচকির মাঠ। তারই উত্তরে মহানন্দা নদীর পূর্বধারে ছিল এক বিশাল জঙ্গল। সেই জঙ্গল ছিল অত্যন্ত গহীন, আম-কাঁঠাল আর নানান জাতের গাছে ঠাসা। দিনের বেলাতেও অনেকে সাহস পেতনা জঙ্গলে ঢোকার। সপ্তাহে অন্তত তিন-চারবার আমাদের গ্রামের বড়-ছোট সব ছেলে দলবেঁধে যেতাম সেই জঙ্গলে আম কুড়াতে। বাঘের ভয়ে গা ছম-ছম করতো। এরুপ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রত্যেকে বস্তা ভর্তিকরে আম নিয়ে আসতাম ! এভাবে চলতো আমাদের আম কুড়োনোর আনন্দ অভিযান। আমের সিজন শেষ হলেও আমাদের বাড়ির উত্তর দিকে ফাঁকা ভিটে বাড়িতে ছিল সূর্যাপুরি আম গাছ। যেটির আম, পাকা শুরু হতো ভাদ্রের শেষে, চলতো পুরো আশ্বিন মাস। আমাদের গ্রামের মধ্যভাগে ছিল ফরিদউদ্দিন মাস্টার নামে জনৈক শিক্ষকের বাড়ি। তিনি ছিলেন একাধারে তৎকালীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক সমিতির সভাপতি, দিনাজপুর জেলা বিচারালয়ের ‘জুরার’, পরবর্তীতে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট…..। তার সান্নিধ্য এবং স্নেহ-আদর আমার থেকে বেশি কেউ পেয়েছে বলে আমি মনে করি না। যদিও তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন, স্কুলে তাকে ডাকতাম ‘স্যার’ আর বাড়িতে ‘ভাই’। তার বাড়ির দক্ষিণ পাশে ছিল বেশক’টি পেয়ারার গাছ। তার পাশেই ছিল ‘পেন্দা-কাকুর’ বাড়ি। সে বাড়িতেও ছিল একাধিক পেয়ারা গাছ। সেসব গাছে ফলতো হরেক সাইজ ও স্বাদের পেয়ারা । ছোট বেলায় সেসব গাছেই দেখা মিলতো ‘কাঠবিড়ালি’। কাঠবিড়ালির সাথি হয়ে আমরাও গ্রামের সব ছেলে-মেয়ে মিলে কত যে পেয়ারা খেয়েছি, তার কোন ইয়ত্তা আছে? নাইরে ভাই, নাই! ছোট্ট এ পরিসরে আজ শুধু আম-কাঁঠালের বর্ণনা দিলাম। পরবর্তীতে অন্যসব আনন্দ-স্মৃতির চিত্র অঙ্কনের ইচ্ছা রইল।
(২৩ সেপ্টেম্বর,২০২০ খ্রিঃ)

-লেখক একজন মুক্তিযোদ্ধা, প্রাক্তন শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, পঞ্চগড় জেলা শাখা সভাপতি।E-mail : hannan368@yahoo.com; Cell. Ph. 01718436584)

0 Shares