Home » জীবনধারা » “পায়ে হেঁটে পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট”

“পায়ে হেঁটে পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট”

 

দেবনগড় বাজারের পৌছানোর একটু পূর্বে হঠাৎ করে এক ভ্যান চালক সামনে এসে ভ্যানের গতি কিছুটা কমিয়ে আমাকে বললো- ভাই, আসেন সামনের বাজার পর্যন্ত আপনাকে পৌছে দেই। আমি মুচকি হেসে বললাম, আমি হেঁটেই যাবো, ধন্যবাদ আপনাকে। কিন্তু ভদ্রলোক এতে ক্ষান্ত না হয়ে আমার সঙ্গী হয়ে গেলেন।
হাঁটার গতির সাথে তাল মিলিয়ে ভ্যান টানতেছেন আর আমার সাথে গল্প করছেন। এভাবে প্রায় এক কিঃমিঃ পথ ফুরিয়ে গেলো। দেবনগড় বাজারে এসে উনি এবার আমাকে অনুরোধ করা শুরু করলেন- এক কাপ চা খাওয়াবেন। চা যদিও ভালোবাসার আরেক নাম কিন্তু সময় সংকুলানের কারণে উনার হাত ধরে বুঝিয়ে বললাম যে আমার সময় কম এবং উনার সাথে একটা ছবি তুলেই ফের হাঁটা ধরলাম।

এই ঘটনাটা যেখানের, সেখান থেকে আমার গন্তব্য তখনও অনেক দূরে। মাঝপথে থামবো ভজনপুর আর শালবাহান বাজারে। ভজনপুর থেকেও কিছুটা দূরে তখন আমি। একা একা হাঁটতেছি। অথচ এই পথেই মিজান ভাইসহ হাঁটার পরিকল্পনা ছিলো আমাদের। কিন্তু গত ৬ তারিখে বৃষ্টির কারণে ট্রিপটা স্হগিত করতে বাধ্য হই এবং তার দুইদিন পর থেকে মিজান ভাই খুবই অসুস্হ। সেজন্য উনি যোগ দিতে পারেন নি। অবশ্য ভজনপুর পৌঁছানোর আগেই ইমরান কল করে কনফার্ম করেছিলো, বাকিটা পথ সে যোগ দিবে আমার সাথে।

পুরো ট্রিপের কাহিনী লিখলে অনেক বড় লিখা হয়ে যাবে, তাই সংক্ষেপে একটু উল্লেখ করি। পঞ্চগড় জিরো থেকে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ৪৬ (±১) কিঃমিঃ দূরত্বের এই পথে হাঁটার প্ল্যান ছিলো আমার। ফিরোজ-আল-সাবাহ্ ভাইয়ের সাথে ব্যাপারটা শেয়ার করার সাথে সাথে উনি আমাকে বললেন- এটার সাথে একটু ভিন্ন কিছু যোগ করা যায় কিনা! কারণ উনি পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন অনেক বছর যাবত। সাবাহ ভাই একজন বিখ্যাত বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী। এই ট্রিপের স্পন্সর ছিলেন তিনি। বন বিভাগের বিষয়টাও ভাই ব্যবস্হা করেছেন।

আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েক জায়গায় ক্যাম্পেইন করার কথা ছিলো এবং আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করেছি যতটুকু পেরেছি। হয়তো সেরকম ফর্মালিটি মেইনটেন করে, ছবি তুলে, ক্যাম্পেইন করার মতো করে কিছু করা হয়নি সবখানে। তবে যেখানেই থেমেছি সাধ্যমত চেষ্টা করেছি আমাদের মেসেজটা পৌঁছে দিতে।
আমরা এবারের এই হাইকিংটা করেছি- পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। পরিবেশের অন্যতম একটা অংশ বন্যপ্রাণী এবং খাদ্যজালেও এদের অবদান অনস্বীকার্য। আমরা না জেনে বুঝে অগত্যা এদের হত্যা করি। পাখি শিকার করে ভোজের আয়োজন করি। কিন্তু এরা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশটাকে একটা স্হিতিশীল অবস্হায় রাখতে সাহায্য করে, এটা আমরা বুঝিনা অনেকেই। হয়তো জেনেও এইসব কাজ করি।

খুব সকালে বের হওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বৃষ্টির কারণে তা হয়ে উঠেনি। বের হতে হতে সকাল ১০ টা বেজে গিয়েছিলো প্রায়। তারপর শুরু করলাম হাঁটা। জগদল বাজার থেকে গ্রামের রাস্তায় ঢুকেছি। আকাশে রোদের ছিটেফোঁটা নেই ঠিকই কিন্তু তারপরও গরম লাগা শুরু করলো হাঁটা শুরু করার কিছুক্ষণ পরেই। হাঁটতে হাঁটতে গোয়ালঝাড় বাজার ছেড়ে চলে গেলাম দেবনগড়। তার কিছুদূর পরেই ভজনপুর বাজার।
ভজনপুর বাজারে পৌঁছানোর একটু দূরে তখন আমি। হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা ছেলে বাইক নিয়ে এসে আমার সামনে ব্রেক দিয়ে আমাকে বলে উঠলো- “চলেন আপনাকে পৌঁছে দেই। আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখতেছি, আপনি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন”। আমি হেসে বললাম ধন্যবাদ ভাইয়া। আমি হেঁটেই যাবো আজ। সারাদিনে এরকম বেশ অনেকবার হয়েছে। কখনো অটো ড্রাইভার, কখনো সাইকেল নিয়ে যাওয়া মানুষগুলোও সামনে এগিয়ে দিতে চেয়েছে। হাঁটতে বের হলে এই ভালোবাসাগুলো বরাবরই পাই এবং এই মানুষদের কথা মনে থাকে আজীবন।

ভজনপুর বাজারে অপেক্ষায় ছিলো বন্ধুবর আসাদ। বাজারের ভিতরে এক জায়গায় ব্যানারটা টানিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেছি। বাজারে প্রবেশের একটু পরেই দেখা হয়েছিলো আমার বাকিটা পথ হাঁটার সঙ্গী ইমরান হোসেন সেখানে কিছু কথা বলে, তারপর বেরিয়ে পড়লাম বাকি পথ হাঁটার উদ্দেশ্যে।

এশিয়ান হাইওয়েতে দুপুরের হাঁটার সময় আমাদের সঙ্গী হলো দুপুরের রোদের তীব্রতা। সকাল থেকে রোদ ছিলোনা একদমই কিন্তু এখন যা শুরু হয়েছে, সেটা সহ্য করার মত না। আশেপাশে কোন গাছপালা নেই। পুরো ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতেছি আমরা। হাঁটতে হাঁটতে পৌছে গেলাম মাঝিপাড়া বাজার। তারপর সেখান থেকে ভিতরের রাস্তা দিয়ে শালবাহান বাজার।

শালবাহান বাজারে দেখা হলো বন্ধুবর হাসান এবং শ্রদ্ধেয় বড় ভাই লিমন ভাইয়ের সাথে। লিমন ভাই অবশ্য প্রোগ্রামের শেষ পর্যন্ত ছিলেন ভাইদের সাথে। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে, চা খাওয়া শেষে ফের শুরু করলাম হাঁটা। তখন আমাদের আরো কিছু পথ বাকি। দিনের সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সূর্যের আলোর তীব্রতা কমে আসতেছে ধীরে ধীরে।
আমরা যখন সিপাহীপাড়া বাজারে পৌছাইলাম, তখন সূর্যের আলোর তীব্রতা বলতে কিছুই নেই। আছে শুধু লালিমা রেখার কিছু অংশ। সূর্যাস্ত হয়নি যদিও, কিন্তু কিছুটা সময় পূর্বেই সূর্য অস্ত যাওয়ার মত অবস্হা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা হলো হান্নানের সাথে।
এবং…
আমরা কিছুক্ষণ পরেই পৌঁছে গেছি বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে। সেখানে গার্ডকে অনেক রিকোয়েস্ট করার পরেও জিরোর কাছে গিয়ে ছবি তুলতে দেয়নি। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো তখন প্রায়। গেইটের একদম খুব কাছে, সেখানে দাড়িয়েই ছবি তুললাম আমরা। হাতে থাকা লিফলেটগুলা সেখানেও কিছু বিতরণ করলাম। তারপর বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা…
উল্লেখ্য- এই পুরো আয়োজনে আমাদের সাথে ছিলেন বন্ধুবর তুষার, আরিফ, তুয্য, শরীফ ভাই এবং ছোটভাই সৌরভসহ আরো অনেকজন। সবাইকে মেনশন দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত, তবে সবার জন্য রইলো অসীম ভালোবাসা। বিশেষ করে বন বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আশা করি উনারা ভবিষ্যতেও আমাদের সাথে থাকবেন।

আসুন আমরা পরিবেশকে রক্ষা করি। বন্যপ্রাণীকে হত্যা না করে বরং তাদের বেঁচে থাকার পরিবেশ গড়ে তুলি। তারা যেন স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পারে, সে অনুযায়ী তাদের বাসস্হানের বনগুলোকে রক্ষা করি। আমরা ব্যক্তি পর্যায় থেকে একটু একটু এগিয়ে এলেই এসব করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ। উদ্দেশ্যঃ
“পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি”
মোট দূরত্বঃ ৪৬ (±১) কিঃমিঃ
মোট সময়ঃ ৮ ঘণ্টা (প্রায়)
(Ragib Sakil এর facebook থেকে নেয়া)

0 Shares