Home » সাহিত্য » প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্পে মধ্যবিত্তের জীবনসংকট-১, জহিরুল ইসলাম

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্পে মধ্যবিত্তের জীবনসংকট-১, জহিরুল ইসলাম

 

প্রস্তাবনা

সাহিত্য সমাজের প্রতিচ্ছবি একথা সত্য। একইভাবে সেখানে প্রতিবিম্বিত হয় ব্যক্তির মন, চিন্তন ও ভাবনা। পুরো মানুষকে তো সাহিত্য ধারণ করেই। দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান লেখক সমাজে যা ঘটে সাহিত্য-শিল্পে শুধু তারই রূপায়ণ করেন না। লেখক মননের পরিশীলিত রঙতুলিতে ভাবনা, স্বপ্ন ও কল্পনায় শিল্পসত্যের রূপময় জগৎ গড়ে তোলেন। সমাজসত্যের চিত্রকল্প সৃজনের তাগিদকে অস্বীকার না করেও এমন মন্তব্য অবিবেচনা প্রসূত নয়। কালজয়ী শিল্পী ব্যক্তিমনের স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা ও চিন্তনলব্ধ প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটান তাঁর সাহিত্যকর্মে। যা যেভাবে আছে সব ঠিক আছে এমন ধারণাকে তমসঘরে রেখে তিনি সমাজকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে চান এবং এর প্রকাশ ঘটান। এই স্বপ্নসাধনা সাহিত্যকর্মে রূপায়িত হয়ে তার তরঙ্গ-তাড়ন পাঠক হৃদয়েও ছড়িয়ে যায়। এভাবে কাল পরিক্রমায় সমাজ ও সাহিত্য ভাবনার পরিবর্তন আসে।

সমাজসত্যের উপর নির্ভর করে শিল্পসত্যের ভিত নির্মিত হয়। শিল্পসত্য সমাজসত্যকে অবিকল গ্রহণ করবে এমন কথা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং সেই লেখকই শক্তিশালী ও কালোত্তীর্ণ শিল্প রচনা করতে সক্ষম হন, যিনি সৃষ্টিকর্মে শিল্পসত্তার উজ্জ্বল প্রভা দান করতে পারেন। এছাড়া সমাজ ও প্রতিবেশের বাইরের ঘটনাপ্রবাহ ও গড়ে ওঠা নতুন মতবাদ লেখককে প্রভাবিত করে। উদাহরণ হিসেবে ইউরোপীয় রেনেসাঁস ও রুশ বিপ্ল­বের কথা বলা যেতে পারে। মার্কস বা ফ্রয়েড এদেশের লেখকদের নানা সময়ে প্রভাবিত করেছেন। অন্য ভাষী লেখকদের ক্ষেত্রেও একথা সমানভাবে প্রযোজ্য। এই সত্যের সমর্থন দিয়েছেন বিভিন্ন ভাষার অনেক শক্তিমান লেখক। শক্তিমান লেখক সমাজসত্যের চেয়ে শিল্পসত্যকে সবসময় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই বলা যায়, সমাজসত্যের চেয়ে শিল্পসত্যের মূল্য অনেক বেশি।১ সেজন্য শিল্প-সাহিত্যে লেখকের মনন ও বিশ্বাস প্রতিফলিত হওয়াকে অস্বাভাবিক বলে মনে করা যায় না।

সাহিত্যের সর্বকনিষ্ঠ শাখা ছোটগল্প ও তাঁর লেখক সম্পর্কে এ বক্তব্য সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো সমানভাবে প্রযোজ্য। উনিশ শতকে সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প রচনার ভিত্তি তৈরি হয়। নতুন চিন্তা চেতনার সমাজসংলগ্ন একটি শিক্ষিত শ্রেণি ছোটগল্প সৃজনে বিশেষ অবদান রেখেছেন। অবশ্য শিক্ষা ও মননের এই রূপান্তর শুরু হয় উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে। বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত ঔপন্যাসিকদের সময়েই বাংলা ছোটগল্প একটি সমৃদ্ধ শিল্পমাধ্যমে পরিণত হয়। তবে ছোটগল্পের ভুবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অদ্বিতীয় আলো। তিনি ছোটগল্পকে পরিপূর্ণতা দান করেছেন। ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান সম্পর্কে অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের অভিমত-

‘‘বাংলা ছোটগল্পের জনক ও প্রধান শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। তাঁর হাতেই এর পত্তন, পরিচর্যা, বিকাশ। এই ঐতিহাসিক সত্য আমরা বিস্মৃত হতে পারি না। বাংলা উপন্যাসের প্রথম শিল্পী বঙ্কিমচন্দ্র; মহাকাব্য, সনেট আর নাটকের স্রষ্টা মধুসূদন; আধুনিক গীতিকবিতার জনক বিহারীলাল। কিন্তু ছোটগল্পের প্রবর্তক ও প্রথম শিল্পী রবীন্দ্রনাথ। এক্ষেত্রে তাঁর কোনো পূর্বসূরী নেই।’’২

এরই ধারাবাহিকতায় বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নের ভাঙা-গড়া ও ব্যাপক পরিবর্তনশীল অস্থির ও সংকটাপন্ন সময়ে বাংলা ছোটগল্পে আসে নতুনত্ব। এ সময় বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। বিশেষ করে বেনিয়া পুঁজির বিকাশ ঘটায় বাঙালিদের একটি অংশ সেই পুঁজির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে। এ প্রসঙ্গটি সমকালীন সাহিত্যে উঠে এসেছে।

0 Shares