Home » সাহিত্য » প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্পে মধ্যবিত্তের জীবনসংকট-৩, জহিরুল ইসলাম

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্পে মধ্যবিত্তের জীবনসংকট-৩, জহিরুল ইসলাম

 

প্রথম অধ্যায়

বাংলা ছোটগল্পের বিকাশ ও কল্লোলের লেখক গোষ্ঠী : সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

ছোটগল্প সাহিত্যের আধুনিকতম সৃষ্টি। কথাসাহিত্য বা উপন্যাসের হাত ধরে ছোটগল্পের যাত্রা শুরু হয় শিল্পবিপ্লবের পর। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ছোটগল্পের সার্থক পথচলা শুরু। এ সম্পর্কে অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের অভিমত-

“‘ছোটগল্প’ (শর্ট স্টোরি) একটি আধুনিক সাহিত্যিক রূপ বা ‘ফর্ম’ রূপে দেখা দিয়েছে মাত্র ঊনবিংশ শতাব্দে। ঘটনার বিবৃতি মাত্র নয়, নীতিশিক্ষা নয়, রূপক রচনা নয়, বৃত্তান্ত নয়; ছোটগল্প এক স্বতন্ত্র সাহিত্য সৃষ্টি।”১

ছোটগল্পের উৎপত্তি সম্পর্কে অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন-

“ছোটগল্পের ইতিহাসগত সূচনা হল উত্তর আমেরিকায়- ওয়াশিংটন আরভিং-এর ‘রিপভ্যান উইঙ্কল’, এডগার অ্যালান পো-র ‘ম্যানুসক্রিপ্ট ফাউণ্ড ইন এ বট্ল’, আর নথানিয়েল হথর্ন-এর ‘সিলেশ্চিয়াস ওমনিবাস’-এ।”২

এরপরেই ইউরোপীয়, আমেরিকান, ফরাসি ও রুশ সাহিত্যে ছোটগল্পের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যের অনুসরণে বাংলা সাহিত্যেও ছোটগল্প এসেছে সে সময়েই। আর ছোটগল্প নির্মাণোপযোগী বাংলা গদ্য সৃষ্টি হয়েছিল উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে। সে কৃতিত্বের দাবিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)।

ছোটগল্পের আবির্ভাব দেরিতে হলেও অসংখ্য লেখকের সম্মিলিত সাধনায় ছোটগল্প আজ বাংলা সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ শাখা। বাংলা ছোটগল্পের প্রথম সার্থক শিল্পী রবীন্দ্রনাথ। তবে পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৪-১৮৮৯), স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) এবং নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের (১৮৬১-১৯০৪) হাতেই ঘটে বাংলা ছোটগল্পের অঙ্কুরোদগম। উল্লেখ্য, ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-১৮৯১) বেতাল পঞ্চবিংশতি গ্রন্থের মাধ্যমেই বাঙালি প্রথম পায় সীমিত গল্পরসের আস্বাদ। এতে গল্পরসের আস্বাদ থাকলেও, গল্প বলতে যা বোঝায়, বেতাল পঞ্চবিংশতি- তে তা ঐতিহাসিক কারণেই দুর্লক্ষ। এ প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) ইন্দিরা (১৮৭২), যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪), রাধা রাণী (১৮৭৫) প্রভৃতি রচনার কথাও কোনো কোনো সমালোচক উল্লেখ করেছেন। বঙ্কিমের রচনাগুলো হচ্ছে ‘নভেলা’ শ্রেণির সৃষ্টিকর্ম বা ছোটগল্পধর্মি কয়েকটি রচনা মাত্র। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সহোদর পূর্ণচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের সূচনালগ্নে ছোটগল্প লেখেন। তাঁর ছোটগল্প সম্পর্কে বলা হয়েছে-

“১৮২০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় বঙ্কিম সহোদর পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মধুমতী’ [বঙ্গদর্শন, ২য় খণ্ড, ২য় সংখ্যা] গল্প দিয়েই বাংলা গল্পের যাত্রা শুরু।”৩

গল্পটি বৃহদায়তনের কারণে অনেকেই একে সার্থক ছোটগল্প হিসেবে মানতে রাজি হন নি। তবে এ কথা বলা যায় যে, এ গল্প ছোটগল্পের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরিত করেছে। বাংলা সাহিত্যে পরবর্তী ছোটগল্প দামিনী (১৮৭৪) প্রথম প্রকাশিত হয় জ্যৈষ্ঠ ১২৮১ (১৮৭৪) সংখ্যা ভ্রমর-এ এবং রমেশ্বরের অদৃষ্ট (১৮৭৭-ভ্রমর পত্রিকা)। ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ঘটনার একমুখিতা ও সমাপ্তির ইঙ্গিতময়তা এসব ছোটগল্পে নেই।

সমসাময়িক কালে বঙ্কিমচন্দ্রের ছোটগল্পধর্মি দুটি আখ্যান প্রকাশিত হয়। এর একটি ইন্দিরা (১৮৭৩), চৈত্র (১২৭৯) সংখ্যা বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। প্রমথনাথ বিশী দুটো ইন্দিরা ’র কথা বলেছেন। একটিকে তিনি ছোট ইন্দিরা বলেছেন। অন্যটিকে তিনি বলেছেন বড় ইন্দিরা। ছোট ইন্দিরা সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে এমনÑ

“১৮৭৩ থেকে ১৮৭৫ এর মধ্যে এক ঝাঁক ক্ষুদ্রায়ত কাহিনী লিখেছেন বঙ্কিমচন্দ্র, ইন্দিরা, যুগলাঙ্গরীয়, লোক রহস্য, রাধারাণী ও কমলাকান্তের দপ্তর, কোন কারণে খণ্ডীভূত অজ্ঞাত গ্রহরাজের টুকরা।”৪

10 Shares