Home » জীবনধারা » ফ্রান্স থেকে করোনালিপি ২৭

ফ্রান্স থেকে করোনালিপি ২৭

 

এক.
করোনা ভাইরাসের ভয়ে না খেয়ে ঘরে বসে থাকাও সম্ভব নয়। জীবনকে প্রবহমান রাখার জন্য কিছু কেনাকাটা মাঝে মাঝে করতেই হয়। ভয় উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে বের হবার বহির্গমন সনদপত্র সঙ্গে নিয়ে বাইরে এসে দেখি, আলেস আজ আরও ভয়ংকর নীরব। কোথাও কেউ নেই।

যাব নিকটদূরের একটি সুপার শপ লিডার প্রাইজে। ভাবলাম এই ফাঁকে একটু হাঁটাহাঁটি করে নিই।
আলেসের প্রধান থিয়েটার হলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই আচমকা বিনীত কণ্ঠস্বর কানে আসে, ‘আন ইউরো সিলভু প্লে।’
একটু ভয় পাই। কোথাও কেউ নেই, যেদিকে তাকাই দেখি ঝলমলে রোদ্দুর পোহাচ্ছে নবীন পাতার তরুণপ্রাণ বৃক্ষ শতদল।
পিছন ফিরে তাকাতেই দেখি একজন যাযাবর ভিক্ষুক এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। বেশ দূর থেকে তিনি আমার কাছে এক ইউরো চেয়েছেন।
গাড়ি নেই সাইকেল নেই পাখিছাড়া আর কোনও প্রাণী আশপাশে নেই বলে যাযাবরের কথা আমি শুনতে পেয়েছি।

ময়লা পোশাকে ঢাকা এক মাতাল যাযাবর ভিক্ষুক করোনা সতর্ক দূরত্ব না মেনে আমার পাশেই দাঁড়ালেন। মুখে মাস্ক নেই। চোখে তন্দ্রা।
ব্যাগ থেকে দ্রুত এক ইউরোর একটি কয়েন বের করে বললাম, ডান হাতটা নিচু করুন।
এক ফুট উপর থেকে তাঁর হাতে কয়েনটা দিয়ে তাড়াতাড়ি আলেস শহরের দক্ষিণাপ্রান্তে চলে গেলাম।

দ্রুত হেঁটে শহরের সবচেয়ে বড়ো এবং ব্যস্ত রেস্তোরাঁর সামনে এসে দাঁড়ালাম। মনে ভয়, আজই বুঝি করোনায় সংক্রমিত হয়ে পড়ব।

ফ্রান্সের প্রায় সব শহরেই কিছু যাযাবর মাদকাসক্ত ভিক্ষুক আছেন। এই করোনাকােলে তাঁদেরকে ফরাসি সরকার হোটেলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। হোটেলেই তাঁদের এখন থাকা খাওয়া সব। কিন্তু উদ্ভ্রান্ত এই মাতাল আজ কোথা থেকে হাজির হল?

ফ্রান্সে আমরা এখন চরম মহামারির মধ্যে আছি। আলেসে শহর এবং শহরের আশপাশের আট জন করোনা রোগী মারা গেছেন গত তিন সপ্তাহে। আমরা প্রায় সারাক্ষণই ঘরবন্দি হয়ে আছি। আজ একটু বাজার করতে বেরিয়েই এমন বিপত্তি ঘটবে কল্পনাও করিনি।

একটু স্বাভাবিক হবার জন্য আবার হাঁটতে শুরু করলাম। চলে গেলাম লো গারদোঁর নদের কিনারে। ঝর্না জলের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। একটু পরে চোখ তুললাম সেভেন পাহাড়ের চূড়ার দিকে।

লো গারদোঁ নদের জলে রাজহাঁস শান্ত হয়ে গা ভাসিয়ে স্রোতের অনুকূলে চলে যাচ্ছে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। একঝাঁক শঙ্খচিল পশ্চিম পাহাড় থেকে উড়ে এসে নামল নদের জলে।

হাঁস শঙ্খচিল পায়রা চড়ুুই ওরা কি জানে আমরা কেমন সম্মিলিত মহামরহণ-ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছি!

লো গারদোঁর জলে এখন অসংখ্য মুলে মাছ বিপরীত স্রোতমুখী হয়ে খেলা করছে। ইচ্ছে করলে খালি হাতেই এখান থেকে মাছ তুলে নেওয়া যায়।
পাখি আর মাছেদের জীবন দেখে দেখে একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে লাগলাম। মনের মধ্যে নির্লিপ্ত ভাবের সঙ্গে অন্য ভাবনাও এল– আলেসের ওই যাযাবর ভিক্ষুক তো সবার থেকে আলাদাই আছেন। ওঁর কাছকাছি এখন কারও যাবার কথা নয়। খুব সম্ভব তিনি একলা একাই থাকেন। মনে পড়ল, এই রোমানিয়ান যাযাবরকে আমি আগেও দেখেছি। তিনি আলেসের উত্তরপ্রান্তে রাস্তার পাশে একটি পরিত্যক্ত কারাভানে থাকেন বলেই মনে পড়ল। মনে হল, আলেসে এই জিপসিই একমাত্র করোনার ভয় জয় করে নিত্য মদমত্ত হয়ে ভালোই আছেন।

আলেসের করোনা ইতিহাস বলছে, এখানে এখনও কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়নি। এখন পর্যন্ত আলেসের যত জন করোনা-সনাক্ত হয়েছেন এবং করোনার চিকিৎসকালে মারা গেছেন তাঁরা সবাই সম্প্রতি ইতালির বিভিন্ন শহর এবং উত্তর ফ্রান্সের মুলুজ থেকে ফিরে এসেছিলেন। এখানে বিশেষ উল্লেখ্য যে, এঁরা যেহেতু করোনাদুর্গত এলাকা থেকে ফিরেছিলেন, সেহেতু তাঁরা কঠোরভাবে হোম কোয়ারেন্টিন মেনেছিলেন। ফলে আলেস শহরবাসী লোকাল এবং কমিউনিটি ট্রান্সমিশন রুখে দিয়েছে।

উত্তর ফ্রান্সের তুলনায় দক্ষিণ ফ্রান্স এখন ক্রমশ উষ্ণতর হয়ে উঠছে। কোনও কোনওদিন এখানে দুপুরবেলায় তাপমাত্রা বিশের উপরে থাকছে। উচ্চতাপের সঙ্গে করোনার কী সম্পর্ক তা আমি এখনও পরিষ্কার জানি না। তবে আমাদের এই অক্সিতানি রাজ্যে গতকাল পর্যন্ত মোট ১৫৫৩ জনের শরীরের করোনা ভাইরাস কোভিড ১৯-এর উপস্থিতি মিলেছে। এই সংখ্যা উত্তর ফ্রান্সের শহরগুলোর তুলনায় খুবই কম। এখানে সবচেয়ে বেশি করোনা রোগী পাওয়া গেছে আমাদের ক্যাপিটাল সিটি মোঁপেলিয়েতে। অক্সিতানি রাজ্যের মোঁপেলিয়ে শহরেই করোনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে।

নানা তথ্য উপাত্ত এবং ভাবনা থেকে সাহস ফিরে এল। মনে হল–গত দুই সপ্তাহে ময়লা পোশাকপরা সংসার-উদাস প্রকৃতিপ্রেমী যাযাবর ভিক্ষুকটির আলেস ছেড়ে কোথাও যা‍বার কথা নয়। আলেস থেকে তাঁর করোনা সংক্রমণ হবার দুর্ভাবনা নেই বলেই ধরে নেওয়া যায়। তাছাড়া আমার নাক মুখ থ্রিএম মাস্কে ঢাকা ছিল।

ধ্যাত, কী যে ভয় পেয়ছিলাম! একজন রোমানিয়ান জিপসি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বলে এতক্ষণ যে ভয় মনের মধ্যে জমাট বেঁধেছিল সেই ভয় দশ সেকেন্ডের লম্বা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলাম।
স্পর্শ কিংবা সংস্পর্শও যাঁর সঙ্গে হয়নি তাঁকে নিয়ে অত ভয় পেলে চলে? অতএব মন চলো যাই ক্ষুধার বাজারে।

দুই.
সবচেয়ে দ্রুত করোনা রোগী সনাক্তকরণ চলছে আমেরিকায়। আমেরিকার করোনাক্রান্তদের খবর দেখে ভয় পাবারই কথা। তবু বলি, এটাই স্বাভাবিক। আমেরিকাকে বাংলায় আমরা বলি যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র কথাটির অন্য মানে আছে। কিন্তু এখন আমি বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র মূলত জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর মানুষের রাষ্ট্র। কত বিচিত্র মানুষ সেখানে যুক্ত। এক ভাষা এক জাতির মানুষকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বাংলাদেশে, বহু জাতিকে এক রাষ্ট্রে সচেতন করা কত কঠিন এখন আমি কিছুটা বুঝি।

আলেস শহরে অভিবাসীর সংখ্যা খুব বেশি নয়, সাকুল্যে সাড়ে পাঁচ হাজার। আলেসের মূল শহরের পনেরো হাজার মানুষের জন্য আমার মনে হয় এক দুজন পুলিশ থাকলেই বা একজনও না থাকলেও সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমাদের মতো সাড়ে পাঁচ হাজার বিদেশিকে নিয়ন্ত্রণ করতেই আলেসের বিশ-পঁচিশ জন পুলিশকে সজাগ থাকতে হয়।

তুলনামূলকভাবে আমেরিকায় খুব দ্রুত করোনা সনাক্তকরণ চলছে, সে জন্য সেখানে অতিদ্রুত লক্ষাধিক মানুষ করোনাক্রান্ত হবার খবর সারা পৃথিবীকে আরও জোরে নাড়া দিয়েছে। ইতালির চেয়ে আমেরিকায় মৃত্যুহার কম। করোনা দ্রুত সনাক্ত হলেই সুস্থ হবার সম্ভাবনা ৯০% বেড়ে যায়।
আমরা আশা করতেই পারি, আমেরিকা অন্য দেশের চেয়ে দ্রুতই করোনা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে।

তিন.
করোনাদৌড়ে ফ্রান্স আজ আবার ইরানকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। ফ্রান্সে আজ সবচেয়ে বেশি, ৪৬১১ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস কোভিড ১৯-এর উপস্থিতি মিলেছে।
গত ২৩শে জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ফ্রান্সের ৫৭০০ জন করোনা রোগী সুস্থ হয়েছেন। মারা গেছেন ২৩১৪ জন। মোট সনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৩৭৫৭৫ জন।
ফ্রান্সের এই চরম দুর্দিনেও আমাদের ফরাসি বন্ধু বন্ধুনীরা টেলিফোনে হেসে কথা বলেন। আমাদের খোঁজ খবর রাখেন।
প্যারিসের কজন প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে ফোনে আমরা এখনও স্বাভাবিক কথা বলি। সাহিত্য নিয়েও আলোচনা হয়।

ইতালি স্পেন জার্মানির মানুষ কত সাহস রেখে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন–আমরা নিশ্চয়ই ভাবতে পারছি।

চার.
গত সাতই মার্চ থেকে বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত সনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা ৪৮ জন, ১৫ জন সুস্থ হয়েছেন, মারা গেছেন ৫ জন। রাষ্ট্রীয় এই সনাক্তসংখ্যাকে যদি আমাদের আশঙ্কার ৩ দিয়েও গুণ করি, তাহলেও খুব একটা ভয় পাবার কিছু নেই। দেশে চলছে করোনার চতুর্থ সপ্তাহ। এই সপ্তাহটি বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে তৃতীয় ধাপে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের দুর্ভাবনার কাল চলছে এখন। কিন্তু চিন ইতালি ফ্রান্স স্পেন জর্মানি ইরানের কমিউনিটি ট্রান্সমিশনপূর্ব সনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হলেও হতে পারে বলে আশঙ্কা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গ নেপাল ভুটান সেই আশঙ্কার মধ্যে নেই বলেই মনে করি।

পাঁচ.
বনপথে হাঁটার সময় পিঁপড়ের কামড়কেও সর্পদংশন বলে ভ্রম হয়।
হে বাঙালি বন্ধুগণ, বসন্ত বাতাসের সঙ্গে চৈত্র মাসে লু হাওয়াও আসে। শীতেই শুধু ঠান্ডা লাগে না, চোত-বোশেখের গরমেও ঠান্ডা লাগে। মনে রাখবেন ৯৮ থেকে ১০১ জ্বর সর্দি কাশি হল লাল পিঁপড়ের কামড়। করোনা হল কাল কেউটের দংশন।

সাপে কামড়ালেই কি মৃত্যু হয়? চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপরে ভরসা রাখুন। মন যদি দুর্বল হয় ঈশ্বরকে ডাকুন।

ফ্রান্সে মরণাপন্ন করোনা রোগীর চিকিৎসায় ক্লোরোকুইন প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ফ্রান্সে আর দুদিন পর থেকে করোনা রোগীর মৃত্যুহার কমতে শুরু করবে।

ছয়.
বহুদিন পর যাঁরা ঘর এবং ঘরের মানুষকে কাছে পেয়েছেন– এই বেলায় আপনারা প্রকৃত আপন পর এবং ঘরের সংজ্ঞা নিরূপণ করুন। আপাতত আসুন আমরা ঘরকেই ধ্যানজ্ঞান করি।

সকলের মঙ্গল হোক।

রবিশঙ্কর মৈত্রী
২৮শে মার্চ ২০২০
আলেস, ফ্রান্স

20 Shares