Home » জীবনধারা » ফ্রান্স থেকে করোনালিপি ৭২

ফ্রান্স থেকে করোনালিপি ৭২

 

এক.
করোনাকালে আলেসের পাখিবাগানে শখ করে মিরতি ফলের ছোট্ট একটি গাছ লাগিয়েছি (myrtille)। মিরতিকে আমরা চিনি ব্ল ু বেরি (blueberry) নামে। গাছপাকা এই ফল মানেই অমৃত।

ব্ল্যাকবেরির চেয়ে ব্ল ু বেরির স্বাদ শতগুণে ভালো। এই ফল শুধুই অমৃতস্বাদযুক্ত নয়, এর গুণও অতুলনীয়। ভিটামিন সির পাশাপাশি এই ফলে ভিটামিন বি৬ আছে; অল্প পরিমাণ ভিটামিন এ এবং ম্যাগনেসিয়ামও আছে।

ফ্রান্সে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অসংখ্য blueberry গাছ আছে। বেড়াতে গিয়ে সে-সব গাছ থেকে এখন আর ফল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে না। তাই এবারই প্রথম নিজেদের বাগানে blueberry গাছ লাগিয়েছি।

আজ বিকেলে বাগানে গিয়ে দেখি blueberry গাছে ফল ধরেছে। মনে হচ্ছে, সামনের মাসে এই ফল পেকে যাবে। আহা, এখানে এই দূরপ্রবাস-দেশে এই সব মধুপ্রতীক্ষাগুলোই আমাদেরকে ভালো রেখেছে।

দুই.
মৃত্যুই তো আমাদের শেষ পরিণতি। মৃত্যুর পর কী আছে আমরা তা কেউ জানি না। আমরা অনেকেই তা জানতেও চাই না। শুধু মনে মনে ভাবি–মৃত্যু আছে বলেই আজকের এই বেঁচেথাকাটা খুব সুন্দর। কবে কখন কে মরে যাবে কেউ তা জানে না, কিন্তু অজানা অনাগত মৃত্যুর কথা ভেবে আজকের বেঁচেথাকার আনন্দকে নষ্ট করাটাও ভারী অন্যায়।

তিন.
কখনও কখনও আমরা মৃত্যুর আগাম সংকেত পাই। বুঝতে পারি, কোথায় কোথায় মৃত্যুর ঝুৃঁকি আছে। যদি জানতেই পারি, যদি মৃত্যুর ইশারা পেয়েই যাই– তবুও কি আমরা জেনে বুঝে মৃত্যুর দিকে পা বাড়াতে পারি?

ইউরোপে এখন করোনাভীতি লঘু হয়ে এসেছে। ফ্রান্সে লক ডাউন তুলে দিয়ে কিছু নিয়ম জারি করা হয়েছে, নিরাপদ দূরত্ব রেখে চলার সেই নিয়ম আমরা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছি।

চার.
আমাদের সকল আশঙ্কা এখন বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ঘিরে। আরও একবার মরণখেলায় অংশ নিয়ে আমরা কি আবারও প্রমাণ করব– আমরা বাঙালি? বাঙালি কি জীবন নিয়ে এখনও তামাশা করে?

জীবনের চেয়ে বড়ো আর কী আছে? করোনা-সচেতন হবার জন্য কি নিজের পরিবারের কারও মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?

পাঁচ.
ওষুধ নিজের ইচ্ছেমতো খেলে রোগ সারে না। নির্ধারিত দিনের আগে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিলে কিছু দিন পর একই রোগে দ্বিতীয়বার অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়।

করোনাকালে লক ডাউন শিথিল করে ফেললে পুনরায় ভাইরাস শক্তিশালী হয়ে আরও অধিক সংখ্যক মানুষকে অসুস্থ করে ফেলে। একটানা কঠোর লক ডাউন না মানলে করোনা রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

ছয়.
সমাজ রাষ্ট্র অপরিণামদর্শী হলে নিজ নিজ পরিবারও তার কুফল ভোগ করতে বাধ্য হয়। তবু দুঃসময়ে বাতিকগ্রস্ত সমাজ-রাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে আপনপ্রাণ বাঁচানোটাই জরুরি। অন্যরা করোনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মরণখেলায় মেতে উঠলে আপনিও কি তাই করবেন? নিশ্চয় আপনার উত্তর হবে– না। অতএব নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে করোনাকালে আগলে রাখুন।

সাত.
যার বারান্দায় ফুলের টব আছে, যার বাগানে ফুল ফল ও শাকসবজি আছে, তার জীবনেই আছে মধুপ্রতীক্ষা।

টবের গাছে কুঁড়ি এসেছে। বাগান ক্রমশ সবুজ হয়ে উঠছে, ফুলে ফুলে কুমড়োর ডগায় হলুদ বসন্ত বিকশিত হচ্ছে। গাছের পাতায় পাতায় আলোর নাচন, জল পড়ছে পাতা নড়ছে– আহা এই সকল অবলোকনই আমাদের পার্থিব অবলম্বন।

সকলের মঙ্গল হোক।

২০শে মে, ২০২০

রবিশঙ্কর মৈত্রী
আলেস, ফ্রান্স

31 Shares