Home » জীবনধারা » বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর পিছিয়ে পড়া নয়

বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর পিছিয়ে পড়া নয়

মো.আককাস আলী,নওগাঁ : বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর পিছিয়ে পড়া নয়। তাদের পরিবার থেকে ছেলে মেয়েরা এখন স্কুল কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে অধ্যায়নত। একসময় তারা বরেন্দ্র অঞ্চলের জঙ্গল, উঁচু-নিচু জমি কেটে আবাদ যোগ্য ক্ষেতের জমি করে তুলেছিল।

আরও পড়ুন :

কোভিড : মৃত্যু ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ছাড়াল

ছাতক পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী কালাম চৌধুরী বিজয়ী

এরপর বিভিন্ন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে জমি হারিয়ে এ অঞ্চলের আদিবাসীরা ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর থেকে এ পর্যন্ত ৯৫ভাগ আদিবাসী তাদের জমি হারিয়েছে। অবশিষ্ট যে ৫ ভাগ আদিবাসীর নিজস্ব জমি আছে তারাও জমি হারানোর আতংকের মধ্যে দিন কাটিয়ে ছিল। এমনকি আদিবাসী গোরস্থানগুলো দখলদারের কবল থেকেও রক্ষা পায়নি। ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাতন্ত্র আইনে নিজ নিজ নামে জমি রেকর্ডের সুযোগ সৃষ্টি হলেও সাংস্কৃতিক কারণে আদিবাসীরা তা করেনি। কেননা আদিবাসীরা মনে করত জমি হল প্রাকৃতিক সম্পদ। এর উপর মানুষের কর্তৃত্ব থাকা উচিত নয়। এখান থেকেই আদিবাসীদের ভূমি হারানো শুরু। ১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধকালে অন্যদের মত অধিকাংশ আদিবাসীই বেঁচে থাকার আশায় ভারতে পাড়ি জমায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা বাড়ি ফিরে এসে আর জায়গা-জমি ফেরত পায়নি। তাদের জমি দখল করে নেয়া হয়েছে। আদিবাসীরা সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে তারা কোন প্রতিবাদ করতে পারেনি। অনেকেই নিজের জমিতে দিন মজুর হিসেবে তাদের জীবন নতুন করে শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর যে সব আদিবাসী আর ফিরে আসেনি তাদের জমি সমাজের প্রভাবশালীরা দখল করেছে এবং এক সময় তাদের নামে রেকর্ড নিয়েছে। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাতন্ত্র আইনে ৯৭ ধারা অনুযায়ী আদিবাসী কর্তৃক আদিবাসীদের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নেয়ার নীতিমালা থাকলেও আদিবাসীদের চিহিৃত করণ বিষয়ে সুনিদিষ্ট ঘোষণ না থাকায় তা কার্যকর হচ্ছে না। এ বিষয়টিই এখন প্রতারনার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি আদিবাসী সম্প্রদায় বাস করলেও ৯৭ ধারায় মাত্র ৮টি সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই উক্ত ৮টি সম্প্রদায় ছাড়া অবশিষ্ট সম্প্রদায় গুলোকে সরকারি কর্মকর্তারা আদিবাসী হিসেবে আমলে নিচ্ছে না। আবার যে সকল সম্প্রদায়ের নাম আইনে উল্লেখ আছে তাদের

 

সস্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও জেলা প্রশাসকের অনুমতির ঝামেলা এড়ানোর জন্য কৌশলের আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। উরাও পদবীধারীদের সরদার উপাধি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তার সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে আদিবাসীদের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনুমতির ঝামেলা ক্রেতাদের পোহাতে হচ্ছে না। আদিবাসীরা যেহেতু বিভিন্ন কারণে তাদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তা বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক এ বিষয়ে তারা কোন ভূমিকা রাখছে না।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আদিবাসী সম্পদায়ের জন্য গণমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। উল্লেখযোগ্য দৈনিক বাংলাবাজার,দৈনিক আজকালের খবর, দৈনিক আমাদের রাজশাহী পত্রিকায় আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা এনায়েতপুর ইউনিয়নের ইটালী গ্রামের বরুন উরাও”র ও উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের ধীরেন পাহানের জীবনচিত্র প্রকাশ হওয়ায় তাদের ভাতা নিশ্চিত হয় এবং নিয়মিত তারা ভাতা পাচ্ছেন। গণমাধ্যম কর্মিদের বলিষ্ট লেখনীর ফলে সমাজের এক শ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী চতুরদের হাত থেকে এই সম্পদায়ের মানুষ আশার আলো দেখতে শুরু করেছে। এছাড়া তারা মাদক সেবন থেকে বিরত থাকছে এবং বর্তমান সমাজের প্রতিটি স্তরে তাদের অবস্থান সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে মেধার বিকাশসহ নেতৃত্বের বহিপ্রকাশ ঘটছে। গণমাধ্যম এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মডেল সমাজে তাদের অবস্থান ফিরিয়ে দিয়েছে যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া গণমাধ্যম সক্রিয় ভূমিকা রাখায় আদিবাসীরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন মুখি এবং তারা তাদের ন্যায্য অধিকার ও মানবাধীকার বিষয়ে সচেতন। সেই ১৯৭১সাল থেকেই ব্র্যাক আদিবাসী ও সমাজের হতদ্ররিদ মানুষের সেবায় নিয়োজিত থেকে কাজ করছে। এই সংস্থা মুক্তিযুদ্ধ চালাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে ছিল এবং আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সকল সেবা দিয়েছিল। এছাড়া ব্র্যাকের মত এনজিও, বরেন্দ্র ভূমি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ও আদিবাসী উন্নয়ন কেন্দ্রের হাত বাড়ানোর ফলে বর্তমান সময়ে আদিবাসীরা তাদের ছেলে-মেয়েদের সুশিক্ষার জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে অধ্যায়নরত রয়েছে। । বর্তমানে আদিবাসীদের পরিবার অনেক উন্নত হয়েছে। স্কুল, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে অসংখ্য আদিবাসী ছেলে-মেয়েরা অধ্যায়নরত রয়েছে। এখন আর আদিবাসীরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নয়। তাদের পাশে এবং সাথে সবাই।

0 Shares