Home » মতামত » বিশ্বমহামারি ও আমাদের মানবতা

বিশ্বমহামারি ও আমাদের মানবতা

আলম শাইন
দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে ততই বিশ্ববাসী শঙ্কিত হচ্ছেন। শঙ্কিত হচ্ছেন দেশবাসীও। তবে দেশবাসীর নিজ দেশের সংবাদের চেয়ে বেশি আগ্রহ বিশ্ব সংবাদের প্রতি। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার সংবাদ শুনতে বাঙ্গালিরা বেশি আগ্রহবোধ করছেন। তার কারণ হচ্ছে, বাঙ্গালিরা বরাবরই ইউরোপ-আমেরিকার প্রতি দুর্বল। এছাড়াও নিজেদের আত্মীয়-স্বজন থাকেন ওখানে, ফলে বিশ্বমহামারির খোঁজ খবর রাখতে হচ্ছে যুক্তিযুক্ত কারণেই। দ্বিতীয় কারণটি অবশ্য খুব বেশি নয়, যাদের স্বজনরা আছেন তারাই বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। আমরা লক্ষ্য করেছি, বাঙ্গালি বিনা প্রয়োজনেই পশ্চিমা দেশগুলোর মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী কিংবা জনগণের রীতিনীতির উপমা টানতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সুযোগ পেলেই তাদের মেনেচলার নিয়মনীতি নিয়ে খোশগল্প করেন। অথচ নিজেদের বেলায় লবডঙ্কা। নিজেরা দিক নির্দেশনা দিতে পছন্দ করলেও মেনে চলতে অভ্যস্ত নন। তেমনি একটি জাতি আমাদের। সরকার মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। নিজেদেরকে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি করে রাখতে নির্দেশনা দিয়েছে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সেনা মোতায়েনও করেছে সরকার। শুধু জনসাধারণকে নিজগৃহে অবস্থানের জন্য এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যাতে করে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের বিস্তার না ঘটে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা এবং দ্রব্যমূল নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রয়াসেও সেনা মোতায়েন করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। কিন্তু আমরা কি সেই ছুটি কিংবা নির্দেশনার মূল্যায়ন করতে পেরেছি? আমরা লক্ষ্য করেছি যেদিন থেকে ছুটি কার্য্যকর করা হয়েছে, তার আগের দিনই শহর ছেড়ে গ্রামমুখি হয়েছেন কর্মজীবীরা। আমরা দেখেছি সেদিন বাসস্টেশন, রেলস্টেশন কিংবা লঞ্চঘাটে লোকারণ্য। ভয়ানক গাদাগাদির চিত্র দেখেছি আমরা সংবাদপত্রের পাতায়। সত্যি বলতে কী, ঈদ কিংবা পূজা-পার্বণের ছুটিতেও এত লোকের সমাগম আমাদের নজরে পড়েনি আগে। কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিনের টানাছুটির ফলে গ্রামমুখি হয়েছেন মানুষ। অথচ সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা দিয়েছে কর্মস্থল ত্যাগ না করে প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মস্থলের আশেপাশের বাসস্থানে অবস্থান করার জন্যে। যেন সংক্রমিত মানুষটি রোগের বিস্তার না ঘটাতে পারেন অথবা নিজে সংক্রমিত না হোন। অথচ ঘটছে বিপরীতটি! দীর্ঘদিনের ছুটি পেয়ে মানুষ গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছেন। যার পরিণামে গ্রামাঞ্চল অনিরাপদ হয়ে ওঠছে। এখন ক্রমশ সংক্রমিত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষগুলোও। এর আগে প্রবাসীদের দ্বারা সংক্রমিত যা হওয়ার তো হয়েছেনই, এবার স্থানীয়দের পালা। আর এটিই হচ্ছে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার দ্বিতীয় ধাপ।
আমাদের সরকার চীন, ইরান, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মহামারির প্রাদুর্ভাব থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে সেটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছু অসচেতন মানুষের জন্য বিষয়টি সামাল দিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে এখন।
আমরা লক্ষ্য করেছি, পাড়া-মহল্লায় তরুণরা এখনও গাদাগাদি করে বসে আড্ডা দিচ্ছে, আবার একে অপরের কাঁধে হাতরেখে হাঁটছে। অপরদিকে ওদের মুখে মাস্ক লাগানো রয়েছে ঠিকই। আবার বোরিং সময় কাটাতে একে অপরের বাড়িতেও যাচ্ছে। ওদের ধারণা মুখে মাস্ক লাগানো থাকলেই বোধহয় সবদিক থেকে নিরাপদ। উল্লেখ্য, শুধু তরুণই নয়, অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা যে, মাস্ক ব্যবহারে ভাইরাস সংক্রমিত হয় না, নিজকে মুক্ত রাখা যায়। এটি যে কত বড় একটা ভুল ধারণা, তা এখনো মানুষকে বুঝানো যাচ্ছে না। বুঝানো যাচ্ছেনা এটি একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ, শুধু মাস্ক নয়, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। কারণ এ রোগের জীবাণু ৩-৬ ফুট দূরেও সংক্রমিত হতে পারে।
মানুষের গাদাগাদির বিষয়টি প্রমাণিত হয় মাছ বাজারে গেলেই। মাছ বাজার কিংবা কাঁচা বাজার গেলে ভাবাই যায় না যে, বিশ্বব্যাপী মহামারি চলছে। দোকানপাট বন্ধের কারণে রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকলেও ভিড়বাট্টা ঠিকই লেগে রয়েছে নিত্যপণ্যের দোকানগুলোতে। শুধু দোকানে নয়, ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি গাদাগাদি দৃশ্য। যারা ত্রাণ নিচ্ছেন তাদেরকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে দাতারা একই কাতারে দাঁড়িয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত রয়েছেন। নিজেরদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে এ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তাহলে কি দাঁড়িয়েছে বিষয়টি? ত্রাণ গ্রহীতার শরীরেই ভাইরাস মুক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে! সব মিলিয়ে বলা যায়, আমরা কেউই সচেতন নই, সামাজিক দূরত্বও মানছি না। আবার নিজে মানতে গেলে অন্যজন পরিহাস করছেন, মুখ টিপেটিপে হাসছেন। তাতে বিষয়টি পরিষ্কার হচ্ছে, ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও আমরা এখনও সতর্ক হতে পারিনি অথবা হেঁয়ালি করছি।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কিছু সংখ্যক মানুষকে দেখেছি মহামারি নিয়ে রঙ্গব্যঙ্গ কিংবা তামাশা করছেন। ভাবটা তাদের এমন যে, এটি কোন রোগের আওতায়ই পড়ছে না। আবার কিছু লোকের ধারণা এটি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত গজব! দুষ্কৃতিকারীর জন্য এটি নাজিল হয়েছে। যার ফলে তিনি মুক্ত থাকতে পারবেন যদি ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ঠিকমত চালিয়ে যান। বিষয়টি মাথায় নিয়ে এ শ্রেণির মানুষগুলো দুর্যোগ সময়ে ধর্মীয় উপাসনালয়ে যাতায়াত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অথচ তিনি একবারও ভাবছেন না সেখান থেকেও তিনি সংক্রমিত হতে পারেন অথবা তিনি আগেই সংক্রমিত হয়ে থাকলে তার দ্বারা রোগের বিস্তার ঘটতে পারে। তিনি একটু সচেতন হলেই ঘরে বসে ইবাদত করতে পারেন। বরং খুব বেশি বেশি প্রার্থনা করতে পারেন। কারণ তিনি এখন সামাজিক কর্মকাণ্ড কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য অথবা অফিস-আদালতে যাচ্ছেন না, সবকিছু থেকে দূরে আছেন। ফলে ঘরে অবস্থান নিয়েই প্রার্থনার সুযোগ পাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও তদ্রুপ হওয়া উচিত; ঘরই পাঠশালা।
আমরা জেনেছি মহামারির ক্ষেত্রে মহানবী (সাঃ) ঘরে বসে প্রার্থনার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিষয়টি আমরা একটু মেনে চললে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জরুরিকাজ সেরে নিজগৃহে অবস্থান করতে পারলে চলমান এই বিশ্বমহামারির বিস্তাররোধ করা সম্ভব হতে পারে। তাহলেই আমরা এ যুদ্ধে জয়ী হতে পারব। বিশ্ববাসীকে দেখাতে পারব, আমরা ধনী না হলেও সচেতন। আমাদের সামান্য সম্পদ দিয়েই ভাইরাসটির মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি। এখন শুধু স্বেচ্ছায় গৃহে অবস্থানটাই পারে আমাদেরকে সুস্থ্য রাখতে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমরা যেন আতঙ্কিত না হই। আমাদের মনে রাখতে হবে বিশ্বে প্রতি বছরই বিভিন্ন ধরনের ঋতুকালীন ফ্লুতে অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে আড়াই থেকে পাঁচ লাখ মানুষ মারাও যাচ্ছেন। গত বছর সোয়াইন ফ্লুতে ভারতে মৃতের সংখ্যা ছিল ১১০৩ জন এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৪৯৯২ জন। এসব ধৈর্য্যরে সঙ্গেই মোকাবেলা করে আসছেন বিশ্ববাসী। সুতরাং আমরাও নিজগৃহে স্বেচ্ছায় অবস্থান করে মহামারির মোকাবেলা করে যাব ধৈর্য্যরে সঙ্গে। কারণ আমাদের দেশ এখনও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। শুধু একটু সমস্যা হচ্ছে গৃহে অবস্থান নেয়া খেটে খাওয়া মানুষদেরকে নিয়ে। সেক্ষেত্রে আমরা বলব সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসুন, আপনার দেয়া সাহায্যই তাদের কষ্ট প্রশমিত হতে পারে। সুযোগটি নিন, সম্পদের পাহাড় জমিয়ে রেখে কী করবেন? আপনি কি তা ভোগ করে যেতে পারবেন? সেই গ্যারান্টি আছে! সুতরাং একটু ভাবুন। এই দুর্যোগ মুহূর্তে জনকল্যাণে নিজকে বিলিয়ে দিন, সরকারকে সহায়তা করুন। ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্যের স্থিতি বজায় রাখুন। সাধারণ মানুষকে বাঁচতে দিন, তাহলে নিজেও বেঁচে যাবেন। সামনে জাকাতের মৌসুম, ইচ্ছে করলে সেই তহবিল থেকেও আপনি দান করতে পারেন, পরে না হয় সমন্বয় করে নিবেন। খেটে খাওয়া মানুষদের দুঃখ প্রশমিত করে সরকারের প্রচেষ্টার সঙ্গে আপনিও শরিক হোন। তাহলে আমাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে শতগুণ; আমরা জয়ী হতে পারব দ্রুত।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

8 Shares