Home » মতামত » ভিটিলিগো (শ্বেতী) শিশু ও বাংলাদেশ -ইঞ্জিনিয়ার রাসনা

ভিটিলিগো (শ্বেতী) শিশু ও বাংলাদেশ -ইঞ্জিনিয়ার রাসনা

ভিটিলিগো (শ্বেতী) শিশু ও বাংলাদেশ
-ইঞ্জিনিয়ার রাসনা
শরীরের ‘ইমিউন সিস্টেম’ বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে নিজের শরীরের বিভিন্ন কোষ ও কলাকে ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টা করে। এই জাতীয় রোগকে বলা হয় ‘অটো ইমিউন ডিজিজ।’ শ্বেতী বা ত্বকের দুধ-সাদা দাগও এই ধরনের ‘অটো ইমিউন ডিজিজ’।

 

 

যে কোনো প্রাণীর মেলানোসাইট কোষ মারা গেলে মেলানিন সৃষ্টি হয় না আর এই মেলানিনই আমাদের ত্বকের রং। আর মেলানোসাইট কোষ মারা যাওয়ার ফলে মৃত মেলানোসাইট কোষগুলোর অঞ্চলটি সাদা হয়ে যায়; যাকে আমাদের দেশে শ্বেতী বলা হয়, পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চলে চামড়ার এই সাদা হওয়াকে বলে ভিটিলিগো। ভিটিলিগো পরিস্থিতিতে শিশু, নারী, পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গ, যে কোনো বয়সেই পড়তে পারে। জন্মগত ভিটিলিগো শিশু বা এ্যালবিনো অষনরহড় নিয়েও আলোচনার এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
ত্বকের রং উৎপাদকারী মেলানোসাইট কোষের অনুপস্থিতিসহ ভূমিষ্ট শিশু, যা বংশগত জীব বৈচিত্র্য এবহবঃরপ ওসসঁহরঃু উরংড়ৎফবৎ এ আক্রান্ত, জন্মগত ভাবেই ভিটিলিগো শিশু, যাদের ত্বক, চুল এমনকি চোখের কোথাও গবষধহরহ থাকে না। চিকিৎসাশাস্ত্রে এ সমস্যাকে অ্যালবিনিজম বলা হয়। এটিও ভিটিলিগো বা অটো ইমিউন ডিজিজের অন্তর্ভূক্ত।
ভিটিলিগো বা শ্বেতী তে আক্রান্ত মানুষদের নিয়ে সমাজে এখনও নানা কুসংস্কার আছে। অথচ ত্বকের এই সাদা দাগের সঙ্গে কুষ্ঠর কোনও সম্পর্ক নাই। এ রোগে আক্রান্ত হলে আতঙ্কে আক্রান্ত মানুষটি ও তার পরিবার ভয়ানক ভেঙে পড়েন। ‘ওয়ার্ল্ড একজিমা কাউন্সিল’-এর এ দেশের প্রতিনিধি ত্বক বিশেষজ্ঞ সন্দীপন ধর বলেন, দেখতে অন্যরকম লাগা ছাড়া সে অর্থে শ্বেতীর অন্য কোনও বিপজ্জনক দিক নেই। ত্বকের ভিতের থাকা মেলানোসাইট কোষ মেলানোজেনেসিস, অর্থাৎ ত্বকের রঞ্জক মেলানিন তৈরির প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মেলানিন তৈরি হয়। মেলানিন বেশি হলে গায়ের রং কালো, মাঝামাঝি হলে বাদামি ঘেঁষা আর কম হলে ত্বকের রং ফর্সা হয়। আর এই মেলানোজেনেসিস প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হলেই ত্বক হয়ে ওঠে দুধ সাদা। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার গোলযোগের জন্য রক্তে এক ধরনের শ্বেত কণিকা টি-লিম্ফোসাইট বেড়ে গেলে এরাই মেলানোসাইট কোষ ধ্বংস করে। ভিটিলিগো, শ্বেতী বা লিউকোডার্মা যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এ সমস্যার একটাই উপসর্গ- ধবধবে সাদা দাগ। এতে কোনও জ্বালা, ব্যথা বা চুলকানি কিছুই থাকে না।
অটোইমিউন ডিজিজ ছাড়াও নানা কারণে ত্বকে সাদা দাগ হতে পারে। আলতা, সিঁদুর বা প্রসাধনে ব্যবহৃত রাসায়নিকের প্রভাবে অথবা প্লাস্টিকের চটি দীর্ঘ দিন পরলে অনেকের ত্বকে সাদা দাগ হতে দেখা যায়। চিকিৎসার পরিভাষায় এর নাম কেমিক্যাল লিউকোডার্মা। আবার অনেক দিন ধরে জোরে বেল্ট বেঁধে পোশাক পরলেও কোমরে এক ধরনের সাদা দাগ হয়। যথাযথ চিকিৎসায় এ সবই সেরে যায়। তবে অনেকেই নানা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে শ্বেতীর চিকিৎসা করাতে ভয় পান। অথচ এ ধরনের ভাবনার কোনও ভিত্তি নেই।
পৃথিবীতে করোনাপূর্ব পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ^ জনসংখ্যার ২% ভিটিলিগো ভিকটিম নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। সেঅর্থে আমরা যদি বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১%ও ধরি, তাহলে ভিটিলিগো জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ। ভিটিলিগো শিশুদের কত পার্সেন্ট অ্যালবিনো শিশু, তার পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। তবে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, সেখানকার মোট ভিটিলিগো জনসংখ্যার অর্ধেকই এ্যালবিনো, সেঅর্থে আমাদের ৩০ লক্ষ ভিটিলিগো জনসংখ্যার ১৫ লক্ষ কি তাহলে অ্যালবিনো শিশু? বিশ্ব পরিসংখ্যানের এ হিসাবে বাংলাদেশের অ্যালবিনো শিশুদের বিষয়ে এ কথা সংশয়হীনভাবে বলা যাচ্ছে না, যেহেতু আমাদের দেশে এ বিষয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে লক্ষ লক্ষ অ্যালবিনো শিশু এদেশে যে বর্তমান, তা ভিটিলিগো অ্যাক্টিভিস্টরা ইতোমধ্যেই আঁচ করতে পেরেছেন। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ প্রকৃতপক্ষেই শংকাময়। কারন ভিটিলিগো ভিকটিম বা আক্রান্তরা সমাজে নানাভাবে হেয় হন, অপদস্ত হন।
আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামাজিক পরিম-লে ভিটিলিগো অজ্ঞতা এক মারাত্মক দুর্ভোগ। এটা কোনো রোগ না, কিন্তু বিনা রোগে ভুগতে হয় ভিটিলিগো ভিকটিমদের রোগী হিসেবে সমাজে। একইভাবে ভুগতে হয় তাদের আত্মীয়-স্বজন, প্রিয়জন ও শুভাকাঙ্খীদেরকেও।
একজন ভিটিলিগোকে কেন্দ্র করে এক গুচ্ছ নন ভিটিলিগো মানুষও ঘনীভূত হয়ে আছেন এ ভিটিলিগো জগতে। তাই সবাইকে নিয়ে গড়ে তোলা দরকার একটি ভিটিলিগো সমাজ, যে জগতে কুসংস্কারাচ্ছন্নতা কাটিয়ে গড়ে উঠবে ভিটিলিগো গণসচেতনতা, পৌঁছে যাবে সবার কাছে এক মানব উন্নয়ন শান্তি ও প্রগতির বার্তা।
ভিটিলিগো যে কোনো বয়সের মানুষেরই হতে পারে, তবে ১-২০ বছর বয়স পর্যন্ত আক্রান্তদের শিশু ভিটিলিগো বলে চিহ্নিত করা যায়। শিশু ভিটিলিগো ভিকটিম সবচেয়ে বেশি সমস্যায় ভোগে অসচেতনতার অভাবে। সাধারণত ১-১০ বছর পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। তবে এ কথা বাস্তব যে, যেখানে ভিটিলিগো বিষয়ে কুসংস্কারই দূরীভূত হয়নি, সেখানে শিশুদের সচেতনতার বিষয়টি আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয় আমাদের সমাজের জন্য। একটি শিশু ভিটিলিগো আক্রান্ত হলে সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েন তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন। আশে পাশের লোকজনের নানাবিধ প্রশ্ন ও মন্তব্য ভিটিলিগো আক্রান্তদের। সবচেয়ে বড় যে সমস্যা সেটা হলো, ভিটিলিগো আক্রান্ত শিশু পরিবার আত্মীয়-স্বজন ও সমবয়সী বন্ধুদের সাথে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারে না, ফলে তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়। তাছাড়া এমন অনেক পরিবার আছে, যারা এটাকে ছোঁয়াচে মনে করে আক্রান্ত শিশুদের পরিবার থেকেও আলাদা করে ফেলে। পরিবারের অন্যান্যদের ব্যবহার্য জিনিসও ভিটিলিগো আক্রান্ত শিশুদের ধরতে বা ব্যবহার করতে নিষেধ করে।
ইউরোপ-আমেরিকার বাসিন্দারা শ্বেতীকে অসুখের পর্যায়েই ফেলে না। উন্নত দেশগুলিতে ভিটিলিগো আক্রান্তরা শ্বেতীর দাগ মেলাতে ‘ওয়াটার রেজিস্ট্যান্ট কভার’ ব্যবহার করে। আমাদের দেশের মানুষ অসুখ নিয়ে অত্যন্ত বিচলিত বোধ করে, অবসাদে ভোগে। তবে রোগের শুরুতে চিকিৎসা করলে শ্বেতীর সাদা দাগ মুছে ফেলা কঠিন কাজ নয়।
তবে একথা সত্য এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তথাপি শ্বেতীর চিকিৎসায় অতিবেগুনি রশ্মি দিয়ে ফোটো থেরাপি ব্যবহার করা হয় অনেক সময়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে প্রাথমিক অবস্থায় ওষুধের সাহায্যে বা ন্যারো ব্যান্ড আল্ট্রাভায়োলেট (এনবি-ইউভি) ফোটোথেরাপিতে অনেক সময়ই শ্বেতী সেরে যায়। তবে, সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকা অনেকদিনের শ্বেতীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা করে খুব ভালো ফল পাওয়া যায় না এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শ্বেতী আগ্রাসী ভাবে দেহে ছড়াতে থাকলেও সেক্ষেত্রে খুব বেশি কিছু করা যায় না।
২৮০-৩২০ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘের সাধারণ অতিবেগুনি রশ্মিগুচ্ছ নয়, এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বরং এই ফোটোথেরাপিতে ব্যবহার করা হয় ৩১১-৩১২ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘের বিশেষ অতিবেগুনি রশ্মি। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই রশ্মিগুচ্ছের নামে হলো ন্যারো-ব্যান্ড অতিবেগুনি রশ্মি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, একমাত্র এই আলোরই আছে ঔষধি গুণ। অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে অতি জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অতি ধীরে ধীরে আবার মেলানিন তৈরি হয়, ফলে ত্বকে স্বাভাবিক বর্ণ ফিরে আসে। শ্বেতীর যে কোনো চিকিৎসার মতোই এই ফোটো থেরাপিতেও ধৈর্য ধরতে হয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা শ্বেতীকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেন-সেগমেন্টাল ও নন সেগমেন্টাল। নন সেগমেন্টাল শ্বেতী কখনও দ্রুত আবার কখনও ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ত্বকের একাধিক স্থানে আবদ্ধ সেগমেন্টাল শ্বেতীর বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেলেও প্রায় এক বছর আর না বাড়লেও পুরনো শ্বেতীর জন্য চিকিৎসা শুরু হয়। তাই শ্বেতী ধরা পড়লেই দ্রুত চিকিৎসা করানো প্রয়োজন।
এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, শিশু ভিটিলিগো ভিকটিমরা প্রচ- মানসিক চাপ বহন করে চলে এবং সামাজিক প্রবাহ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা প্রথমত হীনমন্যতায় ভোগে, হতাশা বিষন্নতায় এমনকি আত্মহত্যা প্রবণও হয়ে ওঠে অথবা সামাজিক শৃংখলা ভেঙে মাদকাশক্ত হয়ে সমাজে বিভিন্ন অপরাধকাজে লিপ্ত হয়ে যায়।
জাতিসংঘ নির্ধারিত উন্নয়ন লক্ষ্যের সাফল্য নির্ভর করবে সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, ভিটিলিগো শিশুরাও আমাদের ভবিষ্যত। আর প্রজন্মকে অবজ্ঞা করে কোনো সুনিপুন উন্নয়ন সাফল্য অর্জিত হতে পারে না। দু:খজনক কারনে আমাদের উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ, সমাজচিন্তক ও সিদ্ধান্ত গ্রহনকারী রাষ্ট্রের কর্মকর্তাগণের ভিটিলিগো নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নাই। সমাজ যেন এখনো এ ক্ষেত্রে অন্ধকারেই আছে, যদিও রাষ্ট্রের সংবিধান সকল মানুষের সমান অধিকার ঘোষণা করেছে, তারপরও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ভিটিলিগো শিশুদের নিয়ে কারোর কোনো ভাবনা নেই। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ¯্রােতে অংশগ্রহণ করার কোনো সুযোগ এখনো সৃষ্টি হয়নি।
আমাদের রাষ্ট্র ভাবনায় যত দ্রুত ভিটিলিগো আক্রান্ত বড়দের পাশাপাশি ভিটিলিগো শিশুদের কমিউনিটিকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমাজের মূল¯্রােতে বহমান করানো যাবে, তত দ্রুত এরা তাদের মানসিক সংকট থেকে মুক্তি পাবে, সমাজও এর দায় থেকে মুক্তি পাবে। আমরা কেউই এ দায় এড়াতে পারিনা। প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা, মানসিক পরিবর্তন এবং বাড়িয়ে দেয়া সহযোগিতার হাত।

পিআইডি- শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম (৫ম পর্যায়) প্রকল্প কার্যক্রম।

 

 

 

0 Shares