Home » মতামত » যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চাই

যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চাই

বি এম ইউসুফ আলী :
আমি পেশায় একজন শিক্ষক। যদিও নিজেকে এখনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্রই মনে করি। অনার্স প্রথম বর্ষে Western Political Though কোর্সটি পড়াতেন সরদার ফজলুল করিম স্যার। তিনি ছিলেন বন্ধুত্বসুলভ মনের একজন শিক্ষক। কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের সাথে স্যারের একটা হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। নির্দিধায় আমরা ক্লাসে স্যারকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতাম। একদিন তিনি ক্লাসে এলে কে যেন তাকে জিজ্ঞেস করল, স্যার, আজ আমাদের কী পড়াবেন? তিনি স্বভাবসুলভ ভাবে বললেন আজ আমাদের আলোচ্য বিষয়, “আমরা নব্বুইয়ের সন্তান”। সরদার স্যার ছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষক ও দার্শনিক । স্যার আজ আর এ জগতে নেই। কিন্তু তার কিছু কথা এবং চিন্তাভাবনা আমাদের অনেকেরই অনুপ্রেরণা যোগায়। “আমরা নব্বুইয়ের সন্তান” – বাক্যটির ছোট কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সত্যিই আমরা ভাগ্যবান। কারণ আমরা নব্বুইয়ের সন্তান। আমরা ৯০এর ডাকসু নির্বাচন ,সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য জোটের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ৫দল,৭দল ও ১৫ দলের জোটের এরশাদ হঠাও আন্দোলন ও তাদের তিন জোটের রূপরেখা তৈরি, এরশাদের পতন, অস্থায়ী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, ৯১ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির সরকার গঠন, সংসদীয় সরকার পুনপ্রর্বতন ইত্যাদি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি । সকল আন্দোলন ও সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে এসব দেখেছি। কখনো কখনো মিছিলেও অংশ নিয়েছি। প্রিয় পাঠক, আগেই উল্লেখ করেছি স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। ১০ বছর পর সবে মাত্র গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। সরকারের কাছেও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রংপুর, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ অঞ্চলের জনগণের দাবি তারা বিভাগ চায়। অন্যরা কেউ পদ্মাসেতু, বিশ্ববিদ্যালয় বা সিটি কর্পোরেশন কিংবা স্বতন্ত্র জেলা। আমাদের যশোর জেলার অধিবাসীরাও বসে নেই। তারা বিভাগের দাবি তুলেছে। ঢাকাস্থ যশোর সমিতিও (বর্তমানে বৃহত্তর যশোর সমিতি) বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এ দাবি আমন্ত্রিত মন্ত্রীদের নিকট উপস্থাপন করছে। আমাদের অনেকের সাথে যশোর সমিতির যোগাযোগ ছিল। অন্যদিকে ছাত্রদের একটি সংগঠন ছিল বৃহত্তর যশোর ছাত্রকল্যাণ সংসদ। এর সভাপতি ছিল বন্ধু ওমর মির্জা, সাধারণ সম্পাদক আমাদের জুনিয়র ছোটভাই মাহফুজ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ছিল বন্ধু মারুফ সামদানী। আমি এ সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। যশোর সমিতির মতোই এ সংগঠনটি যশোরের বিভিন্ন দাবির ব্যাপারে বেশ সোচ্চার ভূমিকা রাখত। কিন্তু আমার কাছে সবসময় মনে হত যশোরের অধিকার ও দাবি আদায়ে ভিন্ন প্লাটফর্ম দরকার। যাদের কাজই হবে সংশ্লিষ্ট দাবিতে আন্দোলন ও সংগ্রাম করা। এ ব্যাপারে আমি আমার রুমমেট ও বৃহত্তর যশোর ছাত্রকল্যাণ সংসদের সমাজকল্যাণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারেকের সাথে একদিন আলাপ করলাম। আমার যতদূর মনে পড়ে সেই আলোচনায় কয়েকটি বিষয় স্থান পায়। ১. আমরা যেহেতু ছাত্র সেহেতু শিক্ষাবিষয়ক দাবিকে আমাদের প্রাধান্য দিতে হবে। ২. আমরা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছি বরিশাল ও সিলেট বিভাগ গঠিত হবে।যশোরের পাশ্ববর্তী খুলনা বিভাগ । তাই বিভাগের আন্দোলন আপাতত আমাদের না করাই উত্তম। ৩. সাধারণ শিক্ষার বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব দিনদিন কমে যাওয়ায় টেকনিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর জোরারোপ করলাম। ৪. পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলায় চারটি অঞ্চলে চারটি কৃষি ইনিস্টিউট প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয় এবং তার মধ্যে যশোরও ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরও যশোরে তা প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষির উন্নতি মানেই দেশের উন্নতি। সরকার কৃষির ওপর বেশি গুরুত্ব দিবে। যশোরের জলবায়ু ও মাটি কৃষিকাজের জন্য উপযোগী। বৃহত্তর যশোর নব্য শস্য ভাণ্ডারে পরিচিতি লাভ করেছে। সবজি, ফুল ও মাছের পোনা উৎপাদনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হলে স্থানীয় জনগণ বেশি লাভবান হবে। । দেশে তখন একটি মাত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। আমরা ধারণা করেছিলাম সরকার আরও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবে এবং আমাদের আন্দোলন সফল হবে। ৫. এর আগেও সরকার যশোরে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল এবং ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল কিন্তু পরবর্তিতে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।
অবশেষে দুজনেই ঐক্যমতে পৌঁছালাম বৃহত্তর যশোরে মেডিকেল কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। এরপর অন্যদের সাথে আলাপ আলোচনা করলাম। তারাও একমত পোষণ করল।

১৯৯৩ সালের শেষে কিংবা ১৯৯৪ সালের প্রথমে দিকে কথা। গঠিত হল ” বৃহত্তর যশোর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়ন পরিষদ, ঢাকা। তরিকুল ইসলাম তারেককে আহবায়ক, যুগ্ম আহবায়ক যথাক্রমে বি এম ইউসুফ আলী (নিবন্ধকার) ও তানভীরুল ইসলাম তানভীর এবং মিজান তেহেরী একাকে সদস্য সচিব করে ১৭/১৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়। কমিটির অন্য সদস্য কারা ছিল আজ মনে নেই। তবে মারুফ সামদানী, কামরুল, আবু তালেব, আক্তারুজ্জামান লিটন, আবু জাফর, আশরাফুজ্জামান, লিটন ( মহসীন হল), শরীফ, ওয়াদুদ, লালটু, বেল্টু, রোকন, মাহফুজুর রহমান পান্না, তারিফুজ্জামান, নজরুল ইসলাম, আলম, হীরণ, আফজাল, নিশান, জাহিদ, শওকত, রাজ্জাক, সালাম, মাসুদ হাসান, বীথি, সীমা, নাসিমা, ঝর্ণা, লাভলী, ফৌজিয়া নাহিদ, লায়লা, নার্গিস, শামীমা, মুর্শিদা, হাসিনা মমতাজ, মুক্তি, সালমা, রত্না, ফারজানা করিম প্রমুখ আমাদের আন্দোলনের সহযোদ্ধা ছিল। ক্যাম্পাসে বৃহত্তর যশোরের ছাত্রনেতা, সিনিয়র ভাই ও বন্ধুরা আমাদেরকে সহযোগিতা করতেন। বিশেষ করে ডাকসুর পরিবহন সম্পাদক জাহাঙ্গীর ভাই, বনি ভাই, মলি আপা, বন্ধু কাজল, সোহেল, জুলমাত। আমাদের রুমটি হয়ে গেল অস্থায়ী কার্যালয়। প্রফেসর নুর মোহাম্মদ স্যার, প্রফেসর ড. শমশের আলী স্যার প্রমুখ ব্যক্তিদের দিকনির্দেশনা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করত। ঢাবির ১৪টি হলে নিয়মিত সভা এবং রাজনৈতিক নেতাদের সাথে মতবিনিময় করেছিলাম। তারই অংশ হিসেবে ১৯৯৪ সালের ৮ জুলাই তৎকালীন কৃষি, সেচ পানি উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী এম মজিদ- উল হকের সাথে আমরা তার গুলশানের বাসভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলে তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেন আগামীতে দেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হলে সেটা হবে যশোরেই। একই বছরের ১৬ নভেম্বর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে যশোরের কৃতি সন্তান নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এসংক্রান্ত বিষয়ে যশোরের আরেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম সাথেও আমরা বেশ কয়েকবার আলাপ করেছিলাম। তৎকালীন যশোর-৬ আসনের এমপি খান টিপু সুলতান( মরহুম) জাতীয় সংসদে যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসী যশোরবাসীও এ দাবির প্রতি একাত্মা প্রকাশ করে এবং এ দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান। আমাদের সংগঠনের কার্যক্রমের সংবাদ প্রকাশে দৈনিক ভোরের ডাকের সম্পাদক বেলায়েত ভাই এবং দিনকালের যুগ্ম-সম্পাদক সৈয়দ জাফর ভাই সহযোগিতা করতেন। যশোরের স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায়ও আমাদের সংবাদ পরিবেশন করত।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আমরা কতটুকু সফল হয়েছিলাম জানি না। তবে সামান্য হলেও সকলের মধ্যে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিলাম । লাভ করেছিলাম কিছু নির্দেশনা। এখনো এটি যশোরবাসীর অন্যতম দাবি। ইতোমধ্যে যশোরে মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। যশোরের উন্নয়নে বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠন কাজ করছে। এমনই একটি সংগঠন বৃহত্তর যশোর উন্নয়ন ও বিভাগ বাস্তবায়ন পরিষদ। তাদের ঘোষিত ১১দফার অন্যতম দাবি হচ্ছে বৃহত্তর যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। দশম সংসদের যশোর -২ আসনের সংসদ সদস্য জনাব মনিরুল ইসলাম জাতীয় সংসদে ১৩১ বিধিতে লটারিতে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব এবং ৭১ বিধিতে নোটিশ দিয়েছিয়েছিলেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে- “যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চাই”। লটারিতে তার “সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের” উপর আরো ১০ জন মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য প্রস্তাবকে সমর্থন করে সংশোধনী দিয়েছিলেন। এনিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

এদিকে গত বছর ২৭ জুলাই যশোর প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মে.জে. (অব.) ডা. নাসির উদ্দিন জানিয়েছিলেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে । বর্তমানে বিষয়টি কী অবস্থায় আছে তা আমরা অনেকেই জানি না।

১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে যশোর একটি পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জেলা। ১৮৬৪ সালে ঘোষিত হয় যশোর পৌরসভা। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে যশোর জিলা স্কুল, ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে যশোর পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে রয়েছে একটি বড় সেনানিবাস। বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স একাডেমি যশোরের মতিউর রহমান এয়ার ফোর্স বেস এ অবস্থিত। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ ও সামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এটি। বিমান বাহিনীর ​​মধ্যে কর্মকর্তা হতে প্রস্তুতদের এই প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন , নীল বিদ্রোহ, তে-ভাগা আন্দোলন, কৃষক সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে যশোরবাসী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোর এবং প্রথম ডিজিটাল জেলাও যশোর। পারস্যের শিরাজ নগরীতে অসংখ্য কবি প্রতিভার জন্ম হয়েছিল। আর বহু কবি-সাহিত্যিকের জন্মভূমি যশোর। তাই যশোরকে বাংলাদেশের শিরাজ বলা হয়। পাগলা কানাই, লালন শাহ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, গোলাম মোস্তফা, দীনবন্ধু মিত্র, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, সৈয়দ নওশের আলী, মনোজ বসু,ডা. লুৎফর রহমান, উদয় শঙ্কর, রবি শঙ্কর,কেপি বোস, কবি ফররুখ আহমদ, এসএম সুলতান, প্রফেসর নুর মোহাম্মদ মিয়া, সৈয়দ আলী আহসান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সৈয়দ আকরম হোসেন,ড শমসের আলী , সুচন্দা,ববিতা প্রমুখ কীর্তিমান এ যশোরেরই সন্তান। যশোরের বেনাপোল বন্দর থেকে প্রতি বছর পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পায় সরকার। এ ছাড়া কৃষি ও শিল্প খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা আয় হয়। এভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সমগ্র দেশের উন্নয়ন যশোরের অবদান অনস্বীকার্য।
অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতিতে ঐতিহ্যবাহী এ জেলার গর্ব, সুনাম আর যশ সারা দেশে ছড়িয়ে আছে।

যশোরে এক জমিতে ৫ ফসল চাষ করা যায়। এমন মাটি বাংলাদেশের অন্য কোনো জেলায় আছে কিনা আমার জানা নেই। সম্প্রতি এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিকরা। ২০১৬ সালে পরীক্ষামূলক চাষের পর শুরু হয়েছে মাঠপর্যায়ে চাষ। এরই মধ্যে সুফলও পেতে শুরু করেছেন কৃষকরা। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এ পদ্ধতিতে চাষ করলে কৃষক এক দিকে যেমন লাভবান হবেন তেমনি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম হবেন।

এই অঞ্চলে রয়েছে শত শত মাছের খামার, মাছের পোনা উৎপাদনের খামার,রয়েছে হাঁসমুরগির খামার । যশোরের গদখালী ও নাভারণ এলাকায় রকমারী ফুলের চাষ হচ্ছে। যার সিংহভাগই চলে আসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবং সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের চাহিদা মেটায়। সারাদেশে উৎপাদিত ফুলের ৮০ শতাংশই এ অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। এখানকার চাষিরা সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগ ও চেষ্টায় ফুলচাষ শুরু ও প্রসার ঘটিয়েছেন। যশোরের মাটি পরিবেশ প্রকৃতি ও ফুলচাষের উপযোগী। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা পেলে এখানকার ফুলচাষ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সবজি চাষে শ্রেষ্ঠ এ অঞ্চল। তৈরি হয়েছে শস্য ভাণ্ডার। খেজুরের গুড় -পাটালিতে বিখ্যাত। ধান,পাট, গম, তুলা চাষের উপযোগী এখনকার মাটি। এর পাশাপাশি কলা, কুল, পেঁপে ও আলু চাষ হচ্ছে ব্যাপক আকারে। কৃষক স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হচ্ছে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের অভাব।

উৎপাদনকারীরা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ, বিক্রি ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা পেলে কৃষিক্ষেত্রে আরও বড় অবদান রাখতে পারতো। সারাদেশের মোট চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০% রেণু পোনা উৎপাদন হয় যশোরের চাঁচড়া এলাকায়। এর সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষ। এ ক্ষেত্রকে আরও সম্প্রসারিত করা গেলে যশোরের ‘মাছ চাষ’ রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত হিসেবে বিবেচিত হতো। সৃষ্টি হতো কর্মসংস্থান। কৃষির এসব সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্যে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ। এ কারণে জাতীয় স্বার্থে যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে। সেইসাথে একই জায়গায় একসাথে এতগুলো রিসোর্সের মেলবন্ধন হয়েছে এই যশোর অঞ্চলেই। এজন্যই আমাদের এই সম্পদগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমরা সহজেই হতে পারি স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের যে রিসোর্সগুলো রয়েছে সেগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা ও এর মাধ্যমে উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল নিয়ে সরাসরি কাজ করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন।

কৃষিই সমৃদ্ধি, কৃষিই মুক্তি। কৃষি নির্ভর দেশ বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং এই ধারা অব্যাহত রাখতে কৃষিতে গবেষণা বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার কৃষির উপর জোর দেয়ার পাশাপাশি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপরও দিচ্ছেন বিশেষ নজর। দেশে অনেকগুলো পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আরও অনেকগুলো রয়েছে অনুমোদনের অপেক্ষায়। এই সময়ে যশোরের মত জায়গায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা অনেক বেশি যুক্তিসংগত বলে মনে করছি।

অনেকেই জানেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিসারিজ এন্ড মেরিন বায়োসাইন্স(FMB) এবং Agro Product Processing Technology (APPT) ডিপার্টমেন্ট আছে। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিশ থেকে চল্লিশটি ডিপার্টমেন্ট থাকে। অতএব শুধু এই দু-চারটি ডিপার্টমেন্ট আমাদের সম্পূর্ণ কৃষির উন্নয়নের জন্য কখনোই যথেষ্ট নয়। আর তাই উন্নত গবেষণার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় খুবই জরুরি।

বৃহত্তর যশোরের ঐতিহ্য, অবদান, প্রশাসনিক অবকাঠামো, ভৌগোলিক অবস্থান, প্রকৃতিক, পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি যশোরে অবিলম্বে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হোক।
লেখক পরিচিতি : কলামিস্ট ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক
bmyusuf01@gmail.com

0 Shares