Home » জাতীয় » যার কবিতার অপেক্ষায় থাকতে হয়

যার কবিতার অপেক্ষায় থাকতে হয়

নিজস্ব প্রতিবেদক,
শুভ জন্মদিন কবি হেলাল হাফিজ।
নতুন কবিতা দেখা যায় কালেভদ্রে। বিরলপ্রজ লেখকদের একজন তিনি। অথচ তার কবিতার জন্য অপেক্ষায় থাকেন কত কত পাঠক। প্রসঙ্গ ভিন্ন হলেও কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার মতো করে বলা যায়, ‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উম্মক্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে’। কিন্তু তা নিয়ে তার কোনো উৎসাহ নেই! উত্তেজনা নেই! আগ্রহও নেই! নির্লিপ্ত ধ্যানীর মতো উপেক্ষা করেন সব কৌতূহল। আপাতদৃষ্টিতে শান্তসুবোধ মনে হলেও জীবন যাপনের ব্যাপারে তিনি কিন্তু ভীষণ অসংযমী ও অমিতব্যয়ী। জীবনটাকে খোলামকুচির মতো উড়িয়ে দিলেও কবিতা লেখার ব্যাপারে তিনি অসম্ভব সংযমী।

শব্দ ব্যবহার করেন মিতব্যয়ীর মতো। জীবনের আনন্দ-বেদনা ছেঁকে নির্মাণ করেন এক একটি কবিতা। পাঁচ দশকেরও বেশি কাব্যজীবনে সত্যিকার অর্থে একটিই তার কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। এরপর পেরিয়ে এসেছেন ৩৩ বছর। তারপর তিনি আর কবিতায় আগুন জ্বালাতে আগ্রহী হননি। অবশ্য তাঁর ‘কবিতা একাত্তর’ এবং ‘এক জীবনের জন্মজখম’কে পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ বলা যায় কিনা সেটা নিয়ে ঢের ঢের সংশয় রয়েছে। তাতে নতুন কবিতার সংখ্যা একদমই হাতেগোনা। তিনি নিজেও সংকলন দুটিকে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে নাকচ করে দিয়েছেন।

খুব বেশি না লিখলেও তার কবিতা লেখা কিন্তু থেমে নেই। কারণ, তার ‘মনে ও মগজে গুন গুন করে/প্রণয়ের মৌমাছি’। কাগজে যতটা না লেখেন, তারচেয়ে বেশি লেখেন হৃদয়ের চিরকুটে। মাঝে-মধ্যে রঙধনুর মতো টুকরো টুকরো লেখা কবিতার আকাশকে রাঙিয়ে দিলেও অপ্রকাশিত থেকে যায় অধিকাংশই। তবে তাঁর প্রতিটি কবিতাই সৌরভ ছড়িয়ে দেয় দুর্লভ কস্তুরীর ঘ্রাণের মতো। তার কবিতায় আগুন আছে। ভালোবাসা আছে। আছে বিরহকাতরতা। কবি মাত্রই কল্পনাবিলাসী। সেটি তো সাধারণত লেখালেখির ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়

তখনও তিনি গ্রন্থবিহীন কবি। ইতি-উতি কবিতা লিখলেও গ্রন্থ প্রকাশের কোনো তাগিদ অনুভব করেন নি। গ্রন্থ প্রকাশিত না হলেও কবি হিসেবে সুখ্যাতি ও সমাদরের ক্ষেত্রে কোনো খামতি ছিল না। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার কবিতাগ্রন্থ। একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেই বাজিমাত করে দেন। হয়ে ওঠেন বাংলা কবিতার রোমান্টিক রাজকুমার। সে সময় পাঠকদের সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ না থাকলেও তার কবিতা পৌঁছে যায় তরুণ প্রজন্মের হৃদ মন্দিরে।

কথা বলেন গুছিয়ে এবং স্পষ্টভাবে। সবকিছুর মধ্যে থাকে একটা কাব্যিকতা, ছন্দবদ্ধতা ও পরিমিতিবোধ। প্রাতরাশ কিংবা মধ্যাহ্নের ভোজন শেষে সিঁড়ি বেয়ে চলে যেতেন দোতলার কার্ডরুমে। সেখানেই বিনিয়োগ করেন তাঁর অধিকাংশ সময়। এখন যেখানে ক্যান্টিন, সেটি ছিল টিভি রুম। টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক ছিলেন। লাইব্রেরিতেও তাঁকে হরহামেশা দেখা যায়। তাঁর এ রুটিনের খুব একটা ব্যত্যয় হতো না।

এখন অবশ্য তাতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। চোখে ভারী চশমা। অত্যল্প কেশরাশি। চলাফেরার গতি আরো মন্থর হয়েছে। বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেন তিন তলার কম্পিউটার রুমে। কবিতাকে কেন্দ্র করে ভার্চুয়াল জগতে তার যে বিশাল সা¤্রাজ্য গড়ে উঠেছে, সেখানেই তিনি সময় দেন। কখনো-সখনো ফেসবুকে উপহার দেন হিরের টুকরোর মতো এক একটি পঙ্ক্তি। অপার্থিব ভুবন নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকতেই এখন তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। একটা সময় নিভৃতচারী যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, সেখান থেকেই প্রকাশ্য হওয়ার পর ভক্ত-অনুরাগীরা প্রায়শই তাকে ঘিরে রাখেন। সেলফি কিংবা ছবি তোলার জন্য তাঁকে সময় দিতে হয়।

আর কোনো কবির সঙ্গে কি এত এত সেলফি তোলা হয়েছে? কারও কোনো আবদারই তিনি ফেলতে পারেন না। অবশ্য ভালোবাসার বায়না কীভাবেই দূরে ঠেলে দেবেন? এখন অবশ্য শরীরটা ভালো যায় না। প্রায়ই বেগড়বাই করে। এ কারণে অনেক বেশি শ্লথ হয়ে গেছেন। তবে জেল্লা এসেছে জীবনযাপনে। পরনে রঙদার পোশাক-আশাক। গলায় রুদ্রাক্ষমালা। হাতে ব্রেসলেট। সবটাই বান্ধবীদের পছন্দে ও পরামর্শে। অবশ্য বরাবরই তিনি উজ্জ্বল-উচ্ছল থাকতে ভালোবাসেন।
বুকের মধ্যে যেভাবে ভালোবাসা লালন করেন, তেমন প্রেমিক কেইবা হতে পেরেছে?

উষ্টা মেরে চলে যাওয়া প্রেমিকাকে যখন বলেন ‘বসো না লক্ষীটি/ক্ষমার রুমালে মুছে সজীব ক্ষতেই/এন্টিসেপটিক দুটো চুমু দিয়ে দেই’ কিংবা সব শুভ্রতা দেওয়ার অঙ্গীকার করে যখন ঘোষণা দেন, ‘আমি নিপুণ ব্লটিং পেপার/সব কালিমা, সকল ব্যথা ক্ষত শুষেই নেবো’-এমন সংবেদন কে হতে পেরেছেন? এক জীবনের সব হাহাকার বুকে নিয়েও তিনি অভিশাপ দেন, ‘তুমি সুখী হবে, খুব সুখী হবে’। এমনকি ভালোবেসে নীলকণ্ঠ হতেও তার কোনো আপত্তি নেই, ‘মন না দিলে/ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা।’ কিছু দেওয়ার বেলায়ও তার কোনো কার্পণ্য নেই, ‘কতোটুকু দিলে বলো মনে হবে দিয়েছি তোমায়/আপাতত তাই নাও যতোটুকু তোমাকে মানায়।’ কবিতায় এমনভাবে নিজেকে নিবেদন করার সক্ষমতা কজনই বা দেখাতে পেরেছেন? এ কারণেই তিনি অন্য সবার চেয়ে আলাদা।অকৃতদার জীবনে তাঁর ‘সংসার হলো না, সন্ন্যাস হলো না’। অনিকেত জীবনে বলতে গেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবই তাঁর গৃহ, তার সংসার। তার অধিকাংশ কবিতাই লেখা প্রেস ক্লাব চত্বরে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের জন্য অনেক দিন যাবৎ তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মনস্থির করতে না পারায় ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রসবের বেদনা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। মূলত এক ধরনের নার্সিসাস কমপ্লেক্সের কারণে প্রকৃতঅর্থে এখন অব্দি তার একটির বেশি কাব্যগ্রন্থ হলো না। প্রথম কাব্যগ্রন্থের তুমুল জনপ্রিয়তা এবং সেই কবিতাগুলোর প্রতি নিজের মুগ্ধতার কারণে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করতে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে।

অবশ্য আর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত না হলেও তাতে তার খুব বেশি আসে যায় না। কত বিখ্যাত কবিই তো এক জীবনে কত কত কবিতা লিখেছেন। কিন্তু কজন কবি পাঠকদের কাছে এমন বিপুলভাবে সমাদৃত হতে পেরেছেন? কিন্তু অল্প কবিতা লিখলেও তার অধিকাংশ কবিতাই পাঠকনন্দিত। কবিতাগুলোয় আছে কালজয়ী হয়ে থাকার উপাদান। বেদনা আর ভালোবাসায় মাখামাখি হয়ে তা দীর্ঘকাল উজ্জ্বলতা ছড়াবে।

শুভ জন্মদিন কবি হেলাল হাফিজ।

নিউটার্ন.কম

0 Shares