Home » মতামত » যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান এবং কিছু কথা

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান এবং কিছু কথা

বি এম ইউসুফ আলী : তখন তিনি টগবগে যুবক। ডিগ্রি সেকেন্ড ইয়ারে পড়েন। যৌবনের সেই দিনগুলো চলছিল পড়াশোনা, খেলাধুলা আর আড্ডা দিয়ে। আর মাঝেমধ্যে বন্ধুরা মিলে শহরে গিয়ে সিনেমা দেখাও যেন এক ধরনের নেশা ছিল। সে সময়তো বিনোদন বলতে ওগুলোই ছিল। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। ক্যান্টনমেন্টের কাছেই তাদের গ্রাম। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ ও জ্বালাওপোড়াওয়ের কারণে গ্রাম মানুষজন শূন্য । অন্যদের মতো তারাও গ্রাম ছাড়লেন। গিয়ে উঠলেন একটি গ্রাম পরে বোনের বাড়িতে। আরো কয়েকটি পরিবারও আশ্রয় নিয়েছে সেখানে। চৈত্র – বৈশাখ মাস। নতুন ফসল চাষের মওসুম। তিনি হাল চাষে নেমে পড়লেন ।

 

আরও পড়ুন :

শাহজাদপুরে ইউপি চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধার পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মলন

গভীর রাতে শীতের কম্বল নিয়ে শীতার্তদের পাশে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক

মাঠে চাষাবাদ কাজ করছেন আর বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ করতে লাগলেন। কাউকে না জানিয়ে হঠাৎ একদিন গোপনে বাড়ি ছাড়লেন। উদ্দেশ্য জীবন দিয়ে হলেও দেশকে শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন করা। কয়েক বন্ধু মিলে চলে গেলেন ভারতে। যোগ দিলেন মুক্তি বাহিনীতে। ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে অংশ নেন। বিজয়ের কিছুদিন আগে পাকিস্তানিদের গ্রেনেডে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

প্রিয় পাঠক, এই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার নাম মো: মতিউর রহমান মতি। তিনি যশোর সদর উপজেলা শহরতলী নূরপুর গ্রামের মৃত করিম বক্স মৃধার তৃতীয় ছেলে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যশোর সেনানিবাস পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার সেল ছিল। আর ক্যান্টনমেন্টের আশেপাশে গ্রামের অধিবাসীরা তাদের ভয়ে আতঙ্কিত থাকত। এই বুঝি পাঞ্জাবিরা গ্রামে ঢুকে পড়লো। গ্রামবাসীরা গরুর গাড়িতে করে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরতেন এবং যে গ্রামে সন্ধ্যা হতো সেখানেই রাত কাটাতেন। কখনো কখনো বাড়ির সামনে গরুর গাড়ি প্রস্তুত করে রাখতেন। যাতে করে দ্রুত পালাতে পারেন। এই যখন পরিস্থিতি মো: মতিউর রহমান মতির পরিবারের সকলে আশ্রয় নেন কনেজপুর গ্রামে তার বোনের বাড়িতে। সহযোদ্ধা নূরপুরের মফিজুর রহমান নিলু, একেএম হাফিজুর রহমান দুলু, মো: মফিজুর রহমান মফিজ এবং কনেজপুরের রফিকসহ মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য বাড়ি ছাড়লেন। নিলু ও দুলু দু’জন সহোদর। তাদের খালার বাড়ি জগন্নাথপুরে গ্রামে। প্রথমেই তারা এখানে উঠলেন। সেখান থেকে পরদিন ভোরে পৌঁছালেন মুক্তারপুরে রকিবের এক নানা বাড়িতে। এরপর বিকেলে রওনা দিলেন ভারতের বয়রায়। পরে বনগাঁর টালিখানায় গিয়ে সকলেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিলেন । এখানে ৩/৪ দিন থাকার পরে ভারতীয় আর্মির গাড়িতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বিহারের চাকুলিয়া ক্যাম্পে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৪০ দিন ট্রেনিং নেন সেখানে। প্রশিক্ষণ শেষ হলে তাদেরকে বনগাঁয়ের কল্যাণী নিয়ে আসে। এটি ছিল সেক্টর হেডকোয়ার্টার। তারপর শিফট করা হয় নদীয়ার দত্ত ফুলিয়ায়। এখান থেকেই প্রথমে ছোট ছোট গ্রুপে তাদেরকে পাঠানো হয় বাংলাদেশে। দত্ত ফুলিয়ায় ছিলেন প্রায় দুই মাস। তারপর পেট্টাপোল। এখানেও দুই মাস থাকার পর তারা পূণরায় স্থানান্তরিত হলেন বয়রায়।

যশোর ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৮ নং সেক্টরের অধীনে। কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী ছিলেন এই সেক্টরের দায়িত্বে। এরপর জেনারেল এমএ মঞ্জুর এবং সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল হুদা । তাদের অধীনেই যুদ্ধ করেছেন তিনি। চৌগাছা উপজেলার কোটালিপুর,মুক্তারপুর, ফুলসারা এবং সদর উপজেলার বারিনগর, কাশিমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আস্তানা গেড়ে যুদ্ধ করেছেন।

১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। গভীর রাত। সহযোদ্ধাদের নিয়ে বারিনগর অবস্থান করছেন। দেখলেন দূর থেকে একটি গাড়ি এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ। বারিনগর প্রাইমারি স্কুলের কাছে একটি গাছে উঠে গ্রেনেড হামলা করে গাড়িটি ধ্বংস করে দিলেন। পরদিন বিকালে চুড়ামনকাটি বাজারে গেলেন তারা। একটি টিস্টলে বসে বসে গতরাতের কাহিনীই বর্ণনা করছিলেন সেই গাড়ির চালক। আসলে মুক্তিযোদ্ধা মতিরা ভেবেছিলেন গাড়িটি পাকিস্তানি বাহিনীর। কিন্তু সেটি ছিল কেরোসিনের ট্রাক। পরদিন থেকে যশোর ঝিনাইদহ সড়কে সন্ধ্যার সব ধরনের গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সাতমাইল ও হাশিমপুরে ছিল রাজাকারদের ক্যাম্প। তারা এই ক্যাম্পগুলোতে বেশ কয়েকবার হামলা চালালে রাজাকাররা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

যশোর শত্রুমুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। ঠিক তার আগের দিনের ঘটনা। অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর। তারা তখন থাকেন বিজয়নগর গ্রামের আজিজের বাড়িতে। মুক্তিযোদ্ধা মতির সাথে আরো আছেন নিলু, দুলু, মফিজ, রকিব,আলী হোসেন, মোস্তফা, মহিউদ্দিন। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে। খবর পেলেন খোজারহাটে ৪ জন আর্মি এসেছে। তারা সেখানে গিয়ে তাদের সাথে উর্দুতে কথা বলে ভাব জমিয়ে ফেলেন এবং এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা জানান তারা খুবই ক্ষুধার্ত। তারা তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য এক বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে খাবার দিয়ে তাদের আত্মসমর্পণ করানো হয়। এই সময় চাবি খোলা একটি গ্রেনেড হস্তান্তর করছিলেন মতিউর রহমানের কাছে। হঠাৎ তার সহযোদ্ধা মফিজ গুলি করেন। তখনই গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। গ্রেনেডের স্প্রিন্টার মতিউর রহমানের মাথায় আঘাত হানে এবং তিনি গুরুতর আহত হন। স্প্রিন্টার উৎসুক জনতার মধ্যে একজনের হাতে এবং অন্যজনের চোখে লাগে। মতিউর রহমানকে চিকিৎসার জন্য যশোর সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু সেখানে তাকে চিকিৎসা করার মতো পর্যাপ্ত সুবিধা ছিল না। একদিকে যশোরবাসী শত্রুমুক্ত পরিবেশে উৎসবে মাতোয়ারা অন্যদিকে তিনি আহত হয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। অবশেষে তাকে কর্নেল হুদার নির্দেশে দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ভারতের বনগাঁ। যশোর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের মাইক্রো গাড়িতে সেখান নেয়া হয়। গাড়ির চালক ছিলেন সিদ্দিক। তার বাড়িও নূরপুর গ্রামে। তারপর পাঠানো হয় ব্যারাকপুরের আলীপুরে একটি হাসপাতালে । ১১ কিংবা ১২ ডিসেম্বর অপারেশন করা হয় এবং মাথা থেকে গ্রেনেডের স্প্রিন্টারের ৩/৪টি টুকরো বের করা হয়। অপারেশন সফল হলেও মতিউর রহমান স্মৃতি সমস্যায় ভোগেন অনেকদিন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ১৯৭৭ সালে তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ( বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়) অধীনে চাকরি জীবন শুরু করেন। অবসরে গেছেন ২০০৭ সালে। ২ সন্তানের জনক মতিউর রহমান পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকায় থাকেন। ছেলে সরকারি চাকরি করেন। আর মেয়ে বিবাহিত ও গৃহিণী।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। এখন চলছে ডিসেম্বর মাস। বিজয়ের এই মাসেই মুক্তিযুদ্ধে আহত এই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি রইল শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
লেখক পরিচিতি : কলামিস্ট ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক

0 Shares