Home » ইতিহাস ঐতিহ্য » রাজাও নেই, রাজ্য নেই,দাঁড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে বলিহার রাজবাড়ী

রাজাও নেই, রাজ্য নেই,দাঁড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে বলিহার রাজবাড়ী

 

মো: আককাস আলী,নওগাঁ : রাজাও নেই রাজ্য নেই, কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজবাড়ি। আছে দেবালয় সেখানে হয়না আর নিয়মিত পূজা-অর্চনা। দেবালয়ে দেবতার সন্তুষ্টিতে দেবদাসীদের নৃত্যাঞ্জলি, শংখ ধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ধূপের ধোঁয়া আর খোল-করতালের শব্দ থেমে গেছে বহু আগে। দেবালয়ের দুর্ভেদ্য প্রকোষ্ঠ আর দেয়াল পেড়িয়ে দেবদাসীদের হাসি-কান্নার শব্দ হয়তো এখনও ভেসে বেড়ায় বলিহারের ভগ্ন রাজ প্রাসাদের বাতাসে বাতাসে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের এক সনদ বলে নওগাঁর বলিহারের এক জমিদার জায়গীর লাভ করেন। জমিদারগণের মধ্যে জমিদার রাজেন্দ্রনাথ ১৮২৩ খ্রীস্টাব্দে বলিহারে একটি রাজ-রাজেশ্বরী দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মন্দিরে রাজেশ্বরী দেবীর অপরুপা পিতলের মূর্তি স্থাপন করেন। বলিহারের ৯ চাকার রথ এতদ অঞ্চলে প্রসিদ্ধ ছিল। প্রাসাদের কিছুটা দূরেই ছিল বিশাল বাগান বাড়ি। বসতো সেখানে নিয়মিত জলসা। বলিহারের রাজাদের মধ্যে অনেকেই উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন। রাজা কৃষ্ণেন্দ্র নাথ রায় বাহাদুর একজন লেখক ছিলেন। তার লেখা গ্রন্থগুলির মধ্যে কৃষ্ণেন্দ্র গ্রন্থাবলী ১ম ও ২য় খণ্ড অন্যতম।
দেশ বিভাগের সময় এবং জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে অন্য সব রাজার মত বলিহারের রাজার উত্তরাধিকারী বিমেলেন্দু রায় চলে যান ভারতে। এরপর প্রাসাদ ভবনটি রাজ পরিবারের অন্যান্য কর্মচারীরা দেখ ভাল করতে থাকেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তিতে লুট হয়ে যায় রাজবাড়ির বিভিন্ন নিদর্শন, আসবাবপত্র, জানালা-দরজাসহ বিভিন্ন সামগ্রী। দর্শনীয় প্রাসাদটির কয়েকটি ভবন বর্তমানে কোন রকমে দাঁড়িয়ে এক সময়ের বলিহার রাজাদের ঐতিহ্যের জানান দিচ্ছে। কথিত আছে বলিহারের জমিদারিতে ৩৩০টি দীঘি ও পুকুর ছিল। এখনো অনেক দীঘি ও পুকুর রয়েছে। নাম গুলো শ্রুতিমধুর যেমনঃ মালাহার, সীতাহার, বলিহার, অন্তাহার নানান নামেই ছিল দীঘি ও পুকুর গুলি পরিচিত। সৌখিন রাজাদের ছিল মিনি চিড়িয়াখানা। সেখানে ছিল বাঘ, ভাল্লুক, বানর, হরিণসহ নানান প্রজাতির পশু এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।
জনশ্রুতি আছে মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিং বার ভুঁইয়াদের দমন করতে এদেশে আসেন। তিনি তার সৈন্য সামন্ত নিয়ে এক পর্যায়ে বলিহার পৌঁছেন। দীর্ঘপথ অতিক্রম করায় সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বিশ্রামের জন্য ও মানসিংয়ের প্রেরিত গুপ্তচরের মাধ্যমে বার ভুইয়াদের খবর জানার জন্য যাত্রা বিরতি করেন সেনাপতি মানসিং। ওই সময় চলছিল বরেন্দ্র অঞ্চলে শুস্ক মৌসুম। বেশি দিন বসে থাকলে সৈন্যরা অলস হয়ে যেতে পারে ভেবে মানসিং সৈন্যবাহিনী দিয়ে ওই ৩৩০টি দীঘি ও পুকুর খনন করেন।
নওগাঁ সদর উপজেলার বলিহার ইউনিয়নে বলিহার রাজবাড়ি অবস্থিত। রাজবাড়ির একটি ভবন স্থানীয় একটি স্কুলের ক্লাশ রুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। নতুন স্কুল ভবন নির্মিত হওয়ায় সেখানে স্কুল পার হয়ে যাওয়ায় রাজবাড়ির ভবনটি বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে ভবনটি মাদকসেবীদের আস্থানায় পরিণত হয়েছে। প্রাসাদ কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত বিশাল দেবালয়টি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন জঙ্গল পরিষ্কার করে আবারও পূজা অর্চনা শুরু করেছেন। প্রাসাদের সিংহ দুয়ার এখনো অনেকটাই শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাসাদের পিছনের মালিপাড়ায় এখনো বিশাল আকারের পাশাপাশি ২টি শিবলিঙ্গ আছে। সেখানে পূজা হয়। কালো পাথরের শিবলিঙ্গ যাতে চুরি হয়ে না যায় সেই কারণে গোড়ায় খোয়-সিমেন্ট দিয়ে মজবুত করে ঢালাই দেয়া হয়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বলিহার ইউনিয়নেই বলিহার রাজবাড়ি নওগাঁ রাজশাহী সড়কের পশ্চিমে অবস্থিত। নওগাঁ শহর থেকে দূরত্ব ১৫ কিঃমিঃ। অনেক আগে নওগাঁ মহাদেবপুর সড়কে বলিহার মোড় থেকে একটি পাকা সড়ক দিয়েই চলাচল করা হতো। সড়কটির দু’ধারে ছিল বিশাল বিশাল আমগাছ। প্রতিটি গাছের আমই ছিল অত্যন্ত সুঃস্বাদু। বলিহারে সৌখিন জমিদাররা সড়কটি নির্মাণ করেছিলেন। তখন ওই সড়ক দিয়েই রাজশাহীর সাথে নওগাঁ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ওই সড়কই নওগাঁ-রাজশাহীর একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তিতে নওগাঁ-রাজশাহী অভ্যন্তরীণ মহাসড়ক নির্মাণ হলে বলিহার সড়কটি রক্ষণা-বেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। তবে এখনো সড়কটির কিছু কিছু স্থান অবশিষ্ট আছে। প্রাসাদের ভবন গুলি ছিল একটির থেকে অন্যটি কিছুটা দূরে। আটচালার নিকটতম ভবনের সিঁড়ি গুলো ব্যবহৃত হতো গ্যালারি হিসেবে।
নওগাঁর ঐতিহ্য বলিহার রাজবাড়ি আজ ধ্বংস প্রায়। হারিয়ে যেতে বসেছে নওগাঁর আরো একটি ইতিহাস। সরকারি ভাবে এখনও উদ্যাগ গ্রহণ করলে বাঁচিয়ে রাখা যায় শেষ চিহ্নটিকে।

0 Shares