Home » ধর্ম-কর্ম » শরী‘আতের ভিত্তিতে যাকাত ও ফিতরা -এম জসীম উদ্দিন

শরী‘আতের ভিত্তিতে যাকাত ও ফিতরা -এম জসীম উদ্দিন

 

 

ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত নিছাব পরিমাণ মালের নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার নাম যাকাত। কুরআন ও হাদিসের অনেক স্থানে যাকাত-কে ছাদাক্বাহ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কুরআন মাজীদের ৮ টি মাক্কী ও ২২টি মাদানী সূরার ৩০টি আয়াতে যাকাত শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি আয়াতে ছালাত-এর সাথেই যাকাত শব্দ এসেছে। ‘‘তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো এবং রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো’’ (সূরা নূর-৫৬)। সামর্থবানদের জন্য যাকাত প্রদান একটি ফরয হুকুম। যাদের বছরান্তে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে তাদের উপর যাকাতের হিসাব বর্তায়। যাকাত ইসলামের ৫টি রুকনের মধ্যে ৫ম । ইসলাম শিক্ষায় যাকাতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই যাকাত প্রদানের হুকুম স্বয়ং আল্লাহ্‌ (সুবঃ) তা’আলার। পবিত্র কুরআন শরীফ এ বর্ণিত আছে যে, যাকাত দানে সম্পদ পবিত্র হয় ও বৃদ্ধি পায়।

আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য আনন্দ ও খুশির দিন হিসাবে ঈদুল ফিৎর ও ঈদুল আযহা নামক দু’টি দিন নির্ধারণ করেছেন। ঈদুল ফিৎরের খুশির দিনে ধনীদের সাথে গরীবরাও যেন সমানভাবে আনন্দ ও খুশিতে শরীক হ’তে পারে সেজন্য মুসলমানদের উপর যাকাত ও ফিতরার বিধান ফরয করা হয়েছে। যাকাত বণ্টনের খাত নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘হে মু’আয! তুমি জানিয়ে দাও আল্লাহ তাদের সম্পদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যা ধনী ব্যক্তিদের থেকে নিয়ে দরিদ্র ব্যক্তিদের মাঝে বিতরণ করা হবে।’’ (বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযি)। যাকাত ও ফিতরার সঠিক পদ্ধতি মেনে বান্দার হক আদায় করা জরুরি। আর আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে যাকাত বণ্টনের ৮টি খাত উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “সাদাকাহ হচ্ছে শুধু গরীবদের এবং অভাবগ্রস্তদের, আর এই সাদাকাহর (আদায়ের) জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের এবং (দীনের ব্যাপারে) যাদের মন রক্ষা করতে (অভিপ্রায়) হয় (তাদের), আর গোলামদের আযাদ করার কাজে এবং কর্জদারদের কর্জে (কর্জ পরিশোধে), আর জিহাদে (অর্থাৎ যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য) আর মুসাফিরদের সাহায্যার্থে। এই হুকুম আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময় (সূরা তাওবা ৯/৬০)।

ফিতরাকে শরী‘আত ‘যাকাতুল ফিতর এবং সাদাকাতুল ফিতর’ বলা হয়েছে অর্থাৎ ফিতরের যাকাত বা ফিতরের সদকা। ফিতর বা ফাতূর বলা হয় সেই আহারকে যা দ্বারা রোযাদার রোযা ভঙ্গ করে (আল মুজাম আল ওয়াসীত/৬৯৪) । ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে গরিব, দুঃস্থদের মাঝে রোজাদারদের বিতরণ করা দানকে যাকাতুল ফিতর বলা হয়। ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন ছিয়াম পালনকারীর অসারতা ও যৌনাচারের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করার জন্য এবং মিসকীনদের খাদ্য স্বরূপ। যে ব্যক্তি তা ছালাতের পূর্বে (ঈদের ছালাত) আদায় করবে তা যাকাত হিসেবে গ্রহণীয় হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাতের পরে আদায় করবে তা (সাধারণ) ছাদাক্বার মধ্যে গণ্য হবে। অন্য হাদীছে এসেছে, ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ(সাঃ)যাকাতুল ফিতর হিসেবে মুসলমানদের ছোট-বড়, পুরুষ-নারী এবং স্বাধীন-দাস প্রত্যেকের উপর এক ছা খেজুর অথবা এক ছা যব ফরয করেছেন এবং তিনি ঈদের ছালাতের উদ্দেশ্যে লোকেদের বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।

যাকাতুল ফিতর ফরয হওয়ার জন্য নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত নয়। কেননা যাকাতুল ফিতর ব্যক্তির উপর ফরয; মালের উপর নয়। মালের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। মালের কম-বেশির কারণে এর পরিমাণ কম-বেশি হবে না। অত্র হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছোট ও ক্রীতদাসের উপর যাকাতুল ফিতর ফরয বলে উল্লেখ করেছেন। যাকাতুল ফিতর ফরয হওয়ার জন্য নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত হ’লে, ছোট ও ক্রীতদাসের উপর যাকাত ফরয হ’ত না। কেননা সবেমাত্র জন্মগ্রহণ করা সন্তানও ছোটদের অন্তর্ভুক্ত, যার নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। অনুরূপভাবে দাস সাধারণত নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় না। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দাসের উপর যাকাতুল ফিতর ব্যতীত তার সম্পদের যাকাত ফরয করেননি। এবিষয়ে আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যাকাতুল ফিতর ব্যতীত ক্রীতদাসের উপর কোন ছাদাক্বা (যাকাত) নেই’।

মুসলমানদের উপর যেমন যাকাতুল ফিতর ফরয করা হয়েছে। তেমনি তা কি দ্বারা আদায় করবে তাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘তোমরা যাকাতুল ফিতর আদায় কর এক ছা‘ খাদ্যদ্রব্য দ্বারা’। অন্য হাদীছে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, ‘আমরা এক ছা‘ ত্বা‘আম বা খাদ্য অথবা এক ছা‘ যব অথবা এক ছা‘ খেজুর অথবা এক ছা‘ পনির অথবা এক ছা‘ কিছমিছ থেকে যাকাতুল ফিতর বের করতাম’। অত্র হাদীছে যাকাতুল ফিতর প্রদানের ব্যাপারে বিভিন্ন খাদ্যশস্যের নামসহ সাধারণভাবে ‘ত্বা‘আম’ বা খাদ্যের কথা এসেছে, যা দ্বারা পৃথিবীর ঐ সকল খাদ্যশস্যকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। ‘ত্বা‘আম’ বা খাদ্য-শব্দ প্রযোজ্য হতে পারে, সেই সকল বস্তু দ্বারা সদকা প্রদান করা কর্তব্য। আল্লাহ বলেছেন: “তোমরা খাদ্যের খবিস (নিকৃষ্ট) অংশ দ্বারা আল্লাহর পথে খরচ করার সংকল্প করিও না। অথচ তোমরা স্বয়ং উহা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নও।” (বাক্বারাহ – ২৬৭)। হাদিসে সরাসরি চালের কথা উল্লেখ না থাকলেও তা যে ‘ত্বা‘আম’ বা খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ধান খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা ধান মানুষের সরাসরি খাদ্য নয়। যবের উপরে ধানের ক্বিয়াস করা যাবে না। কেননা যব খোসা সহ পিষে খাওয়া যায়। কিন্তু ধান খোসা সহ পিষে খাওয়া যায় না। সুতরাং বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য হিসেবে চাল দ্বারা ফিতরা প্রদান করাই শরী‘আত সম্মত।

টাকা দ্বারা ফিতরা আদায়ের রীতি ইসলামের সোনালী যুগে ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরাম টাকা দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন মর্মে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা বাজারে চালু থাকা সত্ত্বেও তিনি খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন, আদায় করতে বলেছেন এবং বিভিন্ন শস্যের কথা হাদীছে উল্লেখ রয়েছে। অতএব খাদ্যশস্য দ্বারা ফিতরা আদায় করাই ইসলামী শরী‘আতের বিধান। ব্যক্তি নিজে যা খান, তা থেকেই ফিতরা দানের মধ্যে অধিক মহববত নিহীত থাকে। যে ব্যক্তি ২০ টাকা কেজি দরের চাল খান সে উক্ত মানের চাল এক ছা‘ ফিতরা দিবেন। আর যে ব্যক্তি ৫০ টাকা কেজি দরের চাল খান সে উক্ত মানের চাল এক ছা‘ ফিতরা দিবেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে টাকা-পয়সার দ্বারা ফিতরা আদায়ের ফলে একজন রিক্সা চালক যে ২০ টাকা কেজি দরের চাল খায়, আর একজন সম্পদশালী যে ৭০-১০০ টাকা কেজি দরের চাল খান, উভয়ের ফিতরার মান সমান হয়ে যায়। অতএব প্রত্যেক মুসলিমকে ফিতরা হিসেবে এক ছা‘ খাদ্যশস্য প্রদান করতে হবে। রামাদান শেষে শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের পর থেকে ঈদের মাঠে গমনের পূর্ব পর্যন্ত সময়ে ফিতরা আদায় করতে হবে। হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল(সাঃ) ছালাতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।

ফিতরা আরম্ভ হয় রামাদান শেষে শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের পর থেকে। অতএব শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের পর থেকে ঈদের মাঠে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময় ফিতর আদায়ের অতিউত্তম সময়। তবে প্রয়োজনে এক অথবা দু’দিন পূর্বে থেকে আদায় করা যায়। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) ঈদুল ফিতরের এক অথবা দু’দিন পূর্বে ফিতরা আদায় করেছেন। হাদীছে এসেছে, ইবনু ওমর (রাঃ) জমাকারীদের নিকট ছাদাক্বাতুল ফিতর প্রদান করতেন। আর তারা ঈদুল ফিৎরের একদিন অথবা দু’দিন পূর্বে তা আদায় করত।

ফকির-মিসকিন ফিতরার অধিক হকদার। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ফিতরাকে মিসকিনদের খাদ্যস্বরূপ ফরয করার কথা উল্লেখ করেছেন। রাসূল (সাঃ)-এর এই বাণী ফিতরাকে শুধু ফকির-মিসকিনদের জন্য খাছ বা নির্দিষ্ট করে দেয় না বরং এর উদ্দেশ্য হ’ল, ফিতরার মধ্যে ফকির-মিসকিনদের খাদ্য নিহীত রয়েছে। এর ফলে সমাজে সম্পদের যে অসম বণ্টন তা কিছুটা লাঘব হবে। অসহায় মানুষগুলোর কয়েকটা দিন ভালো কাটবে। তাই যাকাত ফিতরার বিষয়টি আজ হতে ১৪০০ বছর পূর্বে আল্লাহতায়ালার নির্দেশে রাসূল (সাঃ)-ফরয করেছিলেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার ও মানার তাওফীক দান করুন- আমীন।

-লেখকঃ সহকারী তথ্য অফিসার, পিআইডি

0 Shares