Home » মতামত » সংঘাতময় অবস্থায় বৈশ্বিক সংকট উত্তরনে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রসঙ্গে -মোতাহার হোসেন

সংঘাতময় অবস্থায় বৈশ্বিক সংকট উত্তরনে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রসঙ্গে -মোতাহার হোসেন

বৈশ্বিক মহামারি করোনার ধাক্কায় পুরো বিশ্ব টালমাটাল ছিল গত দুই বছর। এই মহামারি শুধু মানুষের জীবন সংহার করেনি একই সাথে ব্যাবসাবাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থাসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে নিদারুণ সংকটে ফেলেছে। এখন বিশ্বের বহু দেশ করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে পারেনি। এমনি অবস্থায় বিশ্বকে আরেকটি অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখীন হতে হচ্ছে। এই অগ্নিপরীক্ষা হয়তো এড়ানো যেতো। কিন্তু নিজদের আদিপত্য, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এই অপ্রত্যাশিত সংঘাত, সংঘর্ষ, প্রাণহানির যুদ্ধ চলছে। মূলত: ইউক্রেন রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধাবস্থায় মাঠে ময়দানে এই দুই দেশ জড়িত হলেও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশ কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষ করে রাশিয়ার উপর বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ, ইউক্রেনে ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকায় তেল, আটাসহ অধিকাংশ নিত্য পণ্যের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফলে একদিকে করোনা পরবর্তী অবস্থা অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের সংঘাতের পটভূমিতে এ থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে পাঁচটি প্রস্তাব রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসক্যাপ) ৭৮ তম অধিবেশনে ভাস্যুয়ালি বক্তব্যে এই প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এই প্রস্তাবসমূহ প্রাসঙ্গিক এবং সময় উপযোগী ।
প্রসঙ্গত: বর্তমান সরকার কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পটভূমিতে আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে পাঁচটি প্রস্তাব রেখেছেন। ‘অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপ প্রয়োজন।’ সরকারের প্রস্তাবগুলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে এসক্যাপ বিবেচনা করতে পারে এবং অবিলম্বে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপ নিতে পারে।
বর্তমান সরকার আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা উন্নত করতে আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আরও বাস্তবসম্মত উপায়ে স্নাতক দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার অনুরোধ করেছে। জ্ঞান এবং উদ্ভাবনের জন্য সহযোগিতার সুবিধার্থে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোতে পর্যাপ্ত তহবিল এবং প্রযুক্তি বরাদ্দের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত হয়ে সহায়তা করার উন্নয়ন গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বৃদ্ধির জন্য আইসিটি’র প্রসারের যা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় পরিষেবাগুলোকে সক্ষম করবে।’ বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন রুশ-ইউক্রেনীয় সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ‘দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো যুদ্ধে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।’ ‘এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন অগ্রসর করার জন্য একটি সাধারণ এজেন্ডা,’ একটি টেকসই বিশ্বের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব এবং সংহতি জোরদার করতে সঠিকভাবে পদক্ষেপ বেছে নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশকে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে স্নাতক হওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের পরিকল্পিত উন্নয়ন যাত্রার বৈশ্বিক স্বীকৃতি যা, গত তেরো বছর ধরে বাংলাদেশ অনুসরণ করছে।’ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। জনগণই বাংলাদেশের উন্নয়ন সাধনার কেন্দ্রবিন্দু,এসডিজিতেও তাই। সরকার এসডিজিতে প্রদত্ত কাঠামোর পরিকল্পিত নথিতে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং আইসিটির একীভূ তকরণের চ্যালেঞ্জ অন্তর্ভুক্ত করেছে। সরকার ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যা এসডিজি-১ এবং এসডিজি-২ এর মূল প্রতিপাদ্য।
কোভিড -১৯ মহামারি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশে মহামারি মোকাবেলা করার সময় সরকার জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ পদক্ষেপগুলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় রক্ষায় ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ নেতিবাচক বা নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও মহামারি চলাকালীন বাংলাদেশ একটি প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। সরকার ২০২১-২২ সালে ৭ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির আশা করছে। সরকার ইতোমধ্যে প্রায় সকল নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়ার আওতায় এনেছে। বাংলাদেশ জ্বালানি স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’র খসড়া তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে সমৃদ্ধির দিকে, স্থিতিস্থাপকতার দিকে নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সমৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখি।’ বাংলাদেশ সার্ক, বিমসটেক, বিবিআইএন, বিসিআইএম-ইসি এবং ত্রিপক্ষীয় হাইওয়ের মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সাউথ-সাউথ নেটওয়ার্ক ফর পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন’ প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের এসডিজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে সাহায্য করে।’ শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ক্রস-বর্ডার পেপারলেস ট্রেড, এশিয়া-প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্ট, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ নেটওয়ার্কিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ইউএন এসক্যাপ-এর অন্যান্য উদ্যোগের সঙ্গেও জড়িত। তিনি বলেন, ‘আমরা এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে এবং অন্যান্য পদক্ষেপের জন্য ‘এসক্যাপ’এর উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছি।’ প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ১১ লাখ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দিয়েছে এবং এই মানবিক সংকট নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এই বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের শরনার্থীদের নিরাপদ, টেকসই এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের জোরালো আগ্রহ এবং সক্রিয় সমর্থন আশা করি।’ প্রত্যাশা থাকবে বিশ্ব মানবতার স্বার্থে,বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা,অর্থব্যবস্থা সচল এবং বৈশ্বিক পণ্য মূল্য সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে রাশিয়া ইউক্রেনের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়া জরুরি। তাই বৈশ্বিক শান্তি,স্থিতিশীলতা রক্ষা ও সংকট উত্তরণে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রাসঙ্গি,যৌক্তিক এবং সময় উপযোগী। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ একং তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

লেখক-সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।
-পি. ফি.

0 Shares