Home » জাতীয় » সাদা বুলেট – জামিমা ইসলাম
সাদা বুলেট - জামিমা ইসলাম

সাদা বুলেট – জামিমা ইসলাম

(পর্ব – ১)
(মনিমায়া সিরিজ গোয়েন্দা কাহিনি)
ভক্তদের ভিড় কাটিয়ে ট্রেনে উঠলেন মনিমায়া। বন্ধুর সাথে বাংলাদেশ ঘুরবেন। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান আর এর কাছাকাছি দর্শণীয় জায়গাগুলোতে সময় নিয়ে ঘোরার প্ল্যান তাদের। বিখ্যাত গোয়েন্দা হিসেবে পরিচিত বেশ মনিমায়ার। কে জানত, মনিমায়ার পেশা যে তার পিছু ছাড়বে না।
“আমি তো বিশ্বাস-ই করতে পারিনি। তুই ট্রেনে? বমি – টমি হবে না তো?”
“নাহ, আমার বহুদিনের শখ ট্রেনে উঠব। আর, আমি বমি করি না। ছোটবেলা থেকেই আমার এই অভ্যাস। তুই জানিস না?”
“জানলে কি আর জিজ্ঞেস করতাম?”
ট্রেনের সিটগুলোর মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ মনিমায়ার শাড়ির আঁচলের একটা কোনা সিটের বল্টুর সাথে লেগে মনিমায়া হোঁচট খেয়ে পড়লেন।
“ও মা রে………। কোমরটা মনে হয় ভেঙেই গেল।”
“উফ! ঠিকমত হাঁটতেও পারিস না?”
“গাধি, হাতটা দে না বাড়িয়ে!”
“হুঁ, ওঠ।”
মনিমায়া কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,“তুই না, সময়ে সময়ের কাজের চেয়ে অন্য কাজ বেশি করিস!”
“তুই এত অসাবধান কেন?”
“বস, এটাই আমাদের সিট।”
বেশ কিছু ঘণ্টা পর মনিমায়া আর হেডমিস পৌঁছলেন কক্সবাজার। আগে থেকেই একটা নামি হোটেলের একটা রুম বুক করে রেখেছিলেন মনিমায়া। কিন্তু আসার পর হেডমিস জানতে পারলেন সেটা ক্যানসেল করে দিয়েছেন মনিমায়া-
“অ্যাই কোথায় তোর হোটেল সানসাইন?”
“বুকিং ক্যানসেল করে দিয়েছি।”
“কি….? কেন?”
“ইচ্ছে হলো তাই।”
“মানেটা কি? তুই এখন বলতে চাচ্ছিস যে আমরা রাস্তায় রাত কাটাবো?”
“রাস্তায় কেন রাত কাটাতে যাবো?”
“তোর কথা শুনে তো সেরকমই মনে হচ্ছে। স্পষ্ট করে বলতো, তুই আসলে কি চাস?”
“আমি এই ভ্যাকেশনটাকে নরমালি কাটাতে চাই। সাধারণ মানুষের মতো। আমরা এখন চারদিকের কোনো একটা নরমাল হোটেলে যাবো। যেকোনো ফাকা রুম পেলেই সেটাই নেবো। শোন, যেই ভালো রুমগুলো আছে সেগুলো সবাই হয় আগেভাগে বুক করেছে নাহয় নিয়ে নিয়েছে। তাই আমরা সবচেয়ে সাধারণ রুমটা নেবো। যাতে আমরা সাধারণ মানুষের জীবনজাপন সম্পর্কে জানতে পারি, বুঝতে পারি।”
“তোর মাথায় কখন যে কি ভাবনা চেপে বসে…”
“চল ওইটাতে যাই। নামটা… ও, ‘হোটেল হোটেল’। সুন্দর না?”
“হুঁ!”
চারপাশের কোথাও কোনো রুম পেলো না তারা।
“আর কত?”
“দাড়া দেখছি তো।”
“যদি আর না পাই?”
“পাবো না কেন?”
“কেন বুঝতে পারছিস না?”
“আ-” মনিমায়া কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই দূর থেকে এক লোক তাদের ডাকছে-
“ম্যাম…..”
“আমাদেরই ওতো ডাকছে মনে হয়। চল তো, গিয়ে দেখি কি বলে।”হেডমিস বললেন।
মনিমায়া বললেন,“চল”
“ম্যাম, আমাকে চিনতে পারছেন?” সেই লোক হেডমিসকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
“ও…তুমি সাইমান না?”
“হ্যা ম্যাম, ক্লাস টেন-এ ২০০৫ ব্যাচ। ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে ছিলাম। আমার নাম যে দিয়েছিলেন, ‘নটিটেন’, মানে দুষ্টু১০।”
“হু!”
“আচ্ছা, আপনারা হঠাৎ এখানে?”
“আমি এখানেই একটা পর্যটন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা অফিসে কাজ করি। আচ্ছা আপনার সাথে উনি কে?”
“আমার এক বন্ধু। আমরা একসাথে বেড়াতে এসেছি। কিন্ত কোন হোটেলে রুম পাচ্ছি না। সব এর জন্য।” হেডমিস মনিমায়ার হাতে খোঁচা দিয়ে বললেন।
“উফ্!” বললেন মনিমায়া।
“ম্যাম আপনারা চাইলে আমার বাড়িতে এসে থাকতে পারেন। আমি খুবই খুশি হব।”
“বলছ!”
“হ্যা ম্যাম। আমার বাসায় চলেন। পাঁচ কামড়ার একটা মধ্যবিত্ত বাড়ি। গেস্ট রুম আছে। আপনারা চলুন আমার সাথে। তাড়াতাড়ি… মনে হয় বৃষ্টি আসবে।”
“এই শীতে?” বললেন হেডমিস।
“ম্যাডাম, এখন কি আর বৃষ্টির কোনো আলা সিজন আছে? এখন তো শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম সব সিজনই তো বৃষ্টি।”
“আসেন সিএনজি-তে উঠেন। অসুবিধা হবে না তো?”
“না না।” বললেন মনিমায়া।
দশ মিনিট পর মনিমায়া সাইমানের বাড়িতে এসে পৌঁছালেন তারা।
“এনারা কারা?” সাইমানের স্ত্রী হিমা মনিমায়া আর হেডমিসকে দেখে বললেন।
“আমার স্কুলের এক টিচার আর তার বন্ধু। বেড়াতে এসে হোটেলে রুম পাচ্ছেন না। তাই আমি জোর করে ধরে আনলাম।” সাইমান বলল।
“ও! আসেন, ঘরে বসেন।”
“মধ্যবিত্তের বাড়ি। থাকতে অসুবিধা হবে না তো?”
“না।”
মনিমায়া আর হেডমিস ঘরে এসে বললেন। ঘরটা ছোট হলেও অনেক গোছানো, পরিপাটি।
“মিতু মা, দেখে যা কারা এসেছে।”
“কী হয়েছে আব্বু আমি কী বয়রা যে আমাকে এত জোরে ডাকতে হচ্ছে।”
“আহ্, মিতু তোমাকে আমি কতবার বলেছি এরকমভাবে কথা বলা যাবে না? কথা শোনো না কে তুমি? যাও, বাবা ডাকছে নিশ্চয়ই প্রয়োজনে। অ্যামন ব্যবহার কেউ বাবার সাথে করে?” রান্নাঘরের ধোঁয়ায় কাশতে কাশতে হিমা বললেন।
খানিকটা বিরক্ত হয়েই মনিমায়াদের থাকতে দেয়া রুমটায় এসে ঘুকলো একটা মাঝবয়েসি মেয়ে। তাকে আসতে দেখে সাইমান হাসি হাসি মুখ নিয়ে বললেন,
“এইযে এই হচ্ছে আমার একমাত্র মেয়ে মিতুল।”
মনিমায়া বললেন,“তা মিতুল তুমি কোন ক্লাসে পড়?”
মিতুল মুখে একধরণের অগ্রাহ্যতার ভাব দেখিয়ে বলল,“অনুগ্রহ করে আমাকে মিতু ডাকবেন। সবাই আমাকে-”
মিতুলের কথা শেষ না হতেই সাইমান বললেন,“মিতু, তুমি তোমার ঘরে যাও।” সাইমান মিতুল না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর বললেন,“ওর কথায় আপনারা কিছু মনে করবেন না। কয়েকদিন ধরে কেমন যেন অদ্ভুদ আচরণ করছে। যাহোক, আপনারা কিছু মনে করবেন না। আমি যাচ্ছি, আপনারা জার্নি করে এসেছেন, হাত-মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে, খেতে আসেন।”

রাতের খাওয়া শেষে ঘুমিয়ে যখন উঠলেন তখন সারা বাড়িতে একরকম হৈ-চৈ শুরু হয়ে গিয়েছে। মনিমায়া সকাল সকাল উঠে যখন বসার ঘরে এলেন দেখলেন মিতুলকে তার বাবা বললেন,“মিতু, রেডি হ। তোকে আজ একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”
“জায়গাটায় যেহেতু আমিও যাচ্ছি, তখন আমার জানা দরকার। আগে বল কোথায়।” মিতুল বাবার দিকে তাকিয়ে বলল।
“মা ফাতিহার কাছে নিয়ে যাব।”
“দরবেশ?”
“হ্যা। তোকে জ্বিনে ধরেছে। জ্বিনের কবল থেকে রক্ষা করা লাগবে। আর যাতে তাকে দিয়ে তো আর জ্বিন নামানোর কাজ হয় না, একজন এক্সপার্ট দরকার হয়। আর আমাদের এখানে এরকম একজন মানুষই আছে, মা ফাতিহা।”
“আমি যেতে পারব না। আর আমাকে জোর করার চেষ্টা করো না, লাভ হবে না।”
“আজ আমি কোনো না শুনতে চাই না।”
“কিন্তু বাবা আমার ১৫ বছর বয়স হয়েছে। এই বয়সে অন্তত আমি কোথায় যাব না যাব সেটা আমিই ডিসাইট করতে পারি।”
“আমি তোকে রেডি হতে বলেছি মিতু।” এবার বেশ জোরেই বললেন সাইমান।”
“দাড়ান, আমি মনে করি আপনার এটা করা ঠিক হচ্ছে না।” বললেন মসিমায়া।
সাইমান সেটা না শুনল কিনা, বোঝা গেল না। সে রাগে হড়বড় করে ঘরে চলে গেল। আর হিমা মিতুকে নিয়ে ওর ঘরে ঘুকে দরজা বন্ধ করে দিতেই সেখান থেকে শুধু হিমার রাগান্বিত গলায় চিৎকার আর মিতুর আর্তনাদ শোনা গেল। মনিমায়া চিন্তিত হয়ে হেডমিসকে ডাকতে গেলে, সাইমান যদি ওনার কথা শোনে।

হেডমিসকে ডেকে তুলে সবকিছু বোঝাতে বোঝাতে মেটামুটি আধঘণ্টা লেগে গেল। তারা বেড়িয়ে দেখলেন ডাইনিং রুমের একটা কোনার চেয়ারে বসে বসে হিমা কাদছেন।
“আপনি এভাবে কাদছেন কেন?” বলে মনিমায়া হিমার পাশের চেয়ার বসলেন। আর হেডমিস তাদের সামনেরায় বসলেন।
হিমা ভাঙা গলায় “আমার মেয়েটা……” বলে মনিমায়ার কাধে মাথা রেখে কাদতে শুরু করলেন। মনিমায়া আর হেডমিস যথাসম্ভব ওনাকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন,“আপনারা জানেন আমরি মেয়েটা না, দুদিন আগে শান্তশিষ্ট, ভদ্র একটা মেয়ে ছিল। হঠাৎ একদিন স্কুলে গিয়ে কেমনযেন হয়ে বাড়ি ফিরল। তারপর থেকে কেমন ছেলেদের আচরণ রপ্ত করার চেষ্টা করে। আমরা অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি। কোনোদিন কিছু বলেনি। তাইআজ ওর বাবা ওকে আমাদের এখানকার একখ্যিাত দরবেশের মা ফাতিহার কাছে নিয়ে গেছে। উনি যদি কোন সুরাহা করতে পারেন।”
“আচ্ছা সেই জায়গাটা কোনদিকে?”
“রেইল স্টেশনের কাছেই একটা পোড়ো বাড়িতে উনি সাধনা করেন।”
সঙ্গে সঙ্গে ওনারা দুজন সেদিকে যাত্রা করলেন। অন্যদিকে যা ঘটছে-
“তা মেয়ে তুমি কোন কেলাশে পড়..?”
“এইট!”
সাধারণ অবস্থায় থাকলে মিতু মা ফাতিহা নামের মানুষটার প্রশ্নের উত্তর কোনোভাবেই দিত না। কিন্তু ওকে একটা উগ্রগন্ধযুক্ত তরল খাইয়ে দেবার পর ও মাতাল মাতাল আচরণ করছে। মা ফাতিহা মিতুর থুতনি চেপে ধরে বললেন,“তুমি বুকের ভিতর জ্বিন পুষতাছ, জান?”
“হুঁ”
“চাও জ্বিন নামাইবার? চাও ত?”
“হুঁ”
“জ্বিন নামাইবার লাইগ্গা তুমারে বিয়া করন লাগব। করবা?”
“যা বলবেন তাই করব!”
“তাহলে বাবাজীবন, তুমি দুইদিনের মধ্যে এই মাইয়ার বিয়া দেওনের ব্যবস্থা কর।” সাইমানকে উদ্দেশ্য করে মা ফাতিহা বললেন।
“মা আপনি তো বলছেন, কিন্তু ও কি রাজি হবে?”
“এই নাও, এইডা খাওয়াইয়া দিবা, প্রত্যেকদিন সকালে।”
“কিন্তু মা, আমার মেয়ের বয়স তো কেবল ১৫। নাবালিকা একটা মেয়েকে কে বিয়ে করবে? উল্টো বিয়ে দিতে গিয়ে যে পুলিশের ঝামেলায় পরব!”
“না, না। কোনো পুলিশের ঝামেলা নাই। একটা পাত্তর ঠিক করছি ওর লাইগ্গা। মানিকরতন চৌধুরির লগে বিয়া হইলে….. হে যা বড়লোক, পুলিশ ডাহনের কেউ সাহস পাইবো না। আর তুমারো লাভ, বাবাজীবন। হে তুমারে লাখ লাখ টেহা দিয়া এটিএম-এর মতো ফুলাইয়া-ফাপাইয়া রাখব। তুমাগরও আর দুঃখে থাকা লাগব না। আর তুমিও আমার দুঃখ ঘুচাইবা।”
মনিমায়ারা পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাইমান মেয়েকে নিয়ে বেড়িয়ে এসেছেন। মনিমায়া বললেন,“আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”
“ওই…..মা ফাতিহার কাছ থেকে একটু সুরা পড়িয়ে আনলাম। আপনারা এখানে কেন? সমুদ্র, আইল্যান্ড সব ঘুরে আসুন। নইলে দুপুর হয়ে যাবে তো!”
মনিমায়া, হেডমিস আর কথা না বাড়িয়ে সমুদ্র দেখতে চললেন। তবুও একটু সন্দেহ মনিমায়ার মনে দানা বেধেই রইল। কিছুতেই সে সন্দেহ ছাড়ল না। এমনকি যখন সব খানিকটা ঘুরে-টুরে সন্ধ্যাবেলায় বাসায় ফিরলেন, তখনও না।
খাওয়ার টেবিলে খেতে বসে যখন মনিমায়ার পেশা সম্পর্কে সাইমান জানতে পারলেন, তখন রীতিমত বিষম খাওয়ার হাল হলো-
সাইমান বললেন,“আপনি কি করেন?”
মনিমায়া বললেন,“আমি পেশায় একজন গোয়েন্দা।”
“কি!!” বলে কাশতে কাশতে হাত ধুয়ে কাকে যেন কল করলেন।
মনিমায়া সেদিকটায় গিয়ে দাঁড়ালেন। শুনতে পেলেন সাইমান ফিসফিস করে বলছেন,“মা, এখন বাসায় টিকটিকির উৎপাত। কয়েকদিন পরে কাজ সারলে হয় না?”
একটু থেমে কিছুক্ষণ পর বললেন,“আচ্ছা মা, আচ্ছা।”
মনিমায়া খুব ভালো করেই বুঝলেন সাইমান টিকটিকি বলতে চেয়েছেন। তখনই তিনি বুঝতে পারলেন মা ফাতিহা নামের কোনো ভন্ড দরবেশ সাইমানের মতো সাধাসিধা একজন মানুষকে দিয়ে উল্টোপাল্টা কিছু করানোর তালে আছেন। তাই তিনি পরদিন সকাল সকাল হেডসিকে না নিজে নিজেই একজন বাদামওয়ালির ছদ্মবেশে।
(চলমান)

0 Shares