Home » জাতীয় » সুনামগঞ্জে হাওররক্ষা প্রকল্পের টাকা রাতারাতি বৃদ্ধি
সুনামগঞ্জে হাওররক্ষা প্রকল্পের টাকা রাতারাতি বৃদ্ধি

সুনামগঞ্জে হাওররক্ষা প্রকল্পের টাকা রাতারাতি বৃদ্ধি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :

সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ পুন:র্র্নিমাণ ও মেরামতকাজ শুরু করার কথা গত ১৫ ডিসেম্বর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিনে উপজেলার দেখার হাওর, সাংহাইর হাওর, কাচির ভাঙ্গা হাওর, খাই হাওর, জামখোলার হাওর ও কাউয়াজুড়ি হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজে শুরুতে মোট ৪৯ টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পিআইসি কমিটি গঠন করে। বর্তমানে বেড়ে প্রায় ৬০টি প্রকল্পের মাধ্যমে পিআইসি দেওয়া হয়েছে।

হাওরের অধিকাংশ পিআইসি কমিটির লোকজন বাঁধের কাজ করলেও এখনো অনেক পিআইসি তাহাদের কাজ শুরু করতে পারেননি। চলতি বছরে উপজেলার কাউয়াজুরী হাওরে মোট ৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পিআইসি গঠন করা হয়। কাজের মেয়াদের ১ মাস ১০ দিন পর পানি উন্নয়ন বোর্ড রাতারাতি কাউয়াজুরী হাওরের ৫টি প্রকল্প ভেঙ্গে মোট ১৫টি প্রকল্প গ্রহণ করে। আগের ৫টি প্রকল্পের মোট ব্যায় ধরা ছিল ৮৪ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকা। এখন ৫টি ভেঙ্গে কাজের পরিমান না বাড়িয়ে ১৫টি প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

পিআইসিদের কার্যদেশ প্রদান সহ পিআইসি কমিটি গঠন কিংবা তাদেরকে বাঁধের কোন কাজ এখন পর্যন্ত বুঝিয়ে দেয়া হয় নাই। এমনকি ১০টি পিআইসি কমিটি গঠন করা হয় নাই। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের কাউয়াজুরী হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট লোকজন সার্ভে জরিপ, প্রক্কলন তৈরী করে এবং কাজের শুরুতে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মোট ৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের জন্য পিআইসি কমিটি গঠন করা হয় এবং তাদের কাজও বুঝিয়ে দেওয়া হয়। উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারি প্রকৌশলী মাহবুব আলম কোন এক অদৃশ্য কারণে কাউয়াজুরী হাওরের ৫টি প্রকল্পের কাজ পিআইসি কমিটির লোকজনদেরকে কার্যাদেশ বুঝিয়ে না দিয়ে সময় ক্ষেপন করেন। হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শুরুর ১ মাস ১১ দিন পর (৯ ফেব্রুয়রী) কাউয়াজুরীর হাওরের ৫টি প্রকল্প ভেঙ্গে কাজের পরিমান না বাড়িয়ে ১৫টি প্রকল্প তৈরী করে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরেজমিনে মঙ্গলবার কাউয়াজুরী হাওরে ঘুরে দেখা যায়, কাউয়াজুরী হাওরের ২২ কিলো মিটারের মধ্যে ১১ কিলো ৩০০ মিটার বেরী বাঁধের মধ্যে পুরো বাঁধের অধিকাংশ বাঁধ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ কুমিল্লায় ঢাকা পোস্টের বর্ণিল উদ্বোধন

স্মার্টকার্ড বিতরণ শুরু নবীগঞ্জে

কিন্তু ৫টি পিআইসির মধ্যে দুইটিতে ১ শত ৫০ মিটারের মতো মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। অন্য কোন পিআইসিকে কাজ করতে দেখা যায়নি। কাওয়াজুরী হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজের শুরুতে ৫টি পিআইসি গঠন করে। পিআইসি লোকজনদের দাবীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারি প্রকৌশলী মাহবুব আলম পিআইসি কমিটির লোকজনদেরকে দাবীতে দু একটি পিআইসির কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। নতুন পিআইসিদের কার্যদেশ প্রদান সহ পিআইসি কমিটি গঠন কিংবা তাদেরকে বাঁধের কোন কাজ বুঝিয়ে দেয় হয় নাই। কাউয়াজুরী হাওরের বিগত ২০১৭-১৮ অর্থ বছর কোন কাজ হয় নাই। স্থানীয় কৃষিকদের দাবীতে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে দুইটি ভাঙ্গা বন্ধ করণের কাজ হয়। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে কাউয়াজুরী হাওরে নতুন করে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হলে বরাদ্দের পরিমান ছিল ১ কোটি ৫৮ লক্ষ ৩১ হাজার ২০৪ টাকা। চলতি বছর ২০২০-২১ অর্থ বছরে পুরাতন বাঁধের উপর সংস্কার কাজের মৌখলা গ্রামের পূর্ব পাশ হতে বীরগাঁও প্রামের পশ্চিম পর্যন্ত অক্ষত বাঁধ রয়েছে। কৃষকদের মতে কাউয়াজুরী হাওরের সাড়ে ৭ কিলো মিটার বাঁধকে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাগজে কলমে ১১ কিলো ৩০০ মিটার কাজ দেখিয়ে পুরাতন বাঁধের উপর তিনগুন প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে।

এযেন সরকারি টাকায় শুভংকরের ফাঁকি। যা পিআইসিদের মাধ্যমে কাজের প্রগ্রেস বাড়িয়ে দেখানোর নামে সরকারি টাকা আত্মসাতের মহোৎসবে নামেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, কাউয়াজুরি হাওরে চলতি বছর মোট আবাদী জমির পরিমান ১৮ হাজার ৭৫ হেক্টর এবং হাইব্রিড ও উফসি জাতীয় বোর ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৫ শত মেট্রিক টন ধান। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক কৃষি কর্মকর্তা জানান, হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে যে টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। যদি কৃষি বিভাগের কোন কর্মকর্তাদের এ কাজে সম্পৃক্ত করা হতো তাহলে কোন হাওরে কত হেক্টর ফসলি জমি আছে এবং কতটুকু আবাদ করা হয়েছে।

তা নিরুপন করে যুগোপযোগী সিন্ধান্ত নেওয়া হতো। মাঠে কাজ করে কৃষি বিভাগের লোকজন, কোন জায়গায় বাঁধ প্রয়োজন আর কোন জায়গায় বাঁধের কোন প্রয়োজন নাই তা সঠিক ভাবে তুলে ধরা যেত। হাওরে অপ্রয়োজনীয় বাঁধের ছড়াছড়ি হতো না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন একত্রে কাজ করলে সরকারি টাকার অপচয় কিছুটা রোধ হতো। কাউয়াজুরী হাওর এলাকা ঘুরে আরো জানা যায়, উপজেলার কাউয়াজুরী হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের শেষ দিকে এসে নামমাত্র পিআইসি গঠন করে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন পিআইসিদের কাছ থেকে ঠিকাদারী প্রথার মাধ্যমে কাজ বুঝে নেয় এবং যে যার মতো করে বৈশাখের শেষে বন্যার পানি আসার আগমুহুর্তে পর্যন্ত কাউয়াজুরী হাওরের বাঁধের চলমান থাকে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়।

কাউয়াজুরী হাওরটি দুর্ঘম এলাকায় অবস্থিত এবং পায়ে হাটা ছাড়া কোন বিকল্প পথ নাই। যার ফলে সরকারি কোন কর্মকর্তা, তদারকী কর্মকর্তা হওরে যাওয়াই দুষ্কর। তাই সময়মতো কাজ সম্পন্ন হয় এবং নামমাত্র পিআইসি গঠন করে পুরো টাকা যায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনদের পকেটে। মৌখলা গ্রামের কৃষক অমৃত দেবনাথ, অমুল্য দাস ও শচীন্দ্র দাস জানান যে, এবছর বাঁধের কাজ এখনো শুরু হয় নাই। দুইটি পিআইসি সামান্য মাটি ফেলে রেখেছে। এখন আর মাটি ফেলছেনা। এক্সেভেটর নষ্ট বলে বন্ধ করে রেখেছে। এবাঁধের প্রায় সাড়ে ৩ কিলো মিটার বাঁধ এখনও অরক্ষিত। বাঁধের কাজ কবে শুরু হবে এবং কবে শেষ হবে তা ভগবান জানেন। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারি প্রকৌশলী মাহবুব আলম জানান, কাউয়াজুরী হাওরের ৫টি প্রকল্প ভেঙ্গে এখানে ১৫টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কাউয়াজুরী হাওরের প্রকল্পটি মাস্টার প্ল্যান প্রকল্প। তাই বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জেলা কমিটি অনুমোদন দিলেই আমরা কাজ শুরু করবো।

তিনি জানান, কাজের মেয়াদের মধ্যে পিআইসি কমিটি কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে ঠিকাদারকে দিয়ে বাস্তবায়ন করবো। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান জানান, যে ৫টি প্রকল্প ছিলো এই ৫টিকেই ১৫টি প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। এখানে কোন ক্লোজার বা বড় ভাঙ্গা নেই। বাঁধে শুধু টানা কাজ, কাজের নকশা পরিবর্তন করে আগের উচ্চতা থেকে এখন একটু বেশি দেওয়া হয়েছে। তাই বরাদ্দে বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে পিআইসরা এই কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।

 

 

0 Shares