Home » পর্যটন » হিমলুং শিখরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান

হিমলুং শিখরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউটার্ন.কম : ৫ অক্টোবর। রাতেই সব প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করে রেখেছি। একাধিকবার ব্যাকপ্যাক ও ডাফলব্যাগ দেখে নিয়েছি যেন ভুলে কিছু বাদ না থাকে। মনের মধ্যে উত্তেজনা কাজ করছে। রাতে ভালো ঘুম হলো না।শেষবারের মতো গুগল ঘেটে হিমলুং নিয়ে আরো কিছু ধারণা নিয়ে নিলাম বিভিন্ন সাইট থেকে। সকাল ৭ টার মধ্যে একটা উবার নিয়ে চলে এলাম বনানী ডিওএইচএস-এর ৪ নাম্বার রোডে ইনাম ভাইয়ের বাসায়। অ্যান্টার্কটিকা ও সুমেরু অভিযাত্রী ইনাম আল হক হলেন আমাদের মেন্টর। তার হাতেই গড়ে উঠে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব (বিবিসি)। তিনিই আমাদের স্বপ্ন সারথি। তার কারণেই আজ বাংলাদেশের তরুণেরা অ্যাডভেঞ্চারের স্বপ্ন দেখছে। দেশের পতাকা উড়িয়েছে এভারেস্টের চূড়ায়। তার বাসাই হলো পর্বতারোহণের আঁতুরঘর।

বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সব অভিযানই শুরু হয় ইনাম ভাইয়ের বাসা থেকে। এখান থেকেই অভিযাত্রীদের শুভকামনা জানিয়ে বিদায় দেয়া হয়। আমার বাসা যেহেতু বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়, ফলে আমার আসতে পাঁচ-ছয় মিনিটের মতো সময় লাগলো। বাসার গেইটে গাড়ি থেকে নেমে ঝামেলায় পড়ে গেলাম। ভাড়া দিতে গিয়ে দেখি আমার কাছে খুচরো টাকা নেই। এদিকে ড্রাইভারের কাছেও ভাংতি নেই। টাকা কোথা থেকে দেই? আশপাশে কোনো দোকানও নেই টাকা ভংতি করবো। হঠাৎ দেখি কেউ একজন আমার পেছন থেকে খুচরো টাকা এগিয়ে দিচ্ছেন। আমি চমকে গেলাম! পেছনে ফিরে দেখি রুপক ভাই। যাই হোক, ড্রাইভারকে ভাড়া দিয়ে ছেড়ে দিলাম। রুপক ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে ডাফলব্যাগ নিয়ে ইনাম ভাইয়ের বাসায় চলে এলাম। আমাদের আগেই দেখি নুর ভাই চলে এসছেন। ইনাম ভাইও বসে আছেন। ভরতদা চা বিস্কুট, ফল, মিষ্টি সামনে টি-টেবিলে রেখে গেলেন। ইনাম ভাই হাসি মুখে বললেন, শাকিল আপনাকে খুব এক্সাইটেড দেখাচ্ছে। আমি সবগুলো দাঁত বের করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলাম। একে একে সবাই ৭টার মধ্যে চলে এলো।

আমাদের শুভকামনা জানাতে এসেছেন ক্লাব সদস্য দেশের অভিজ্ঞ পর্বতারোহী নুর মোহাম্মদ ভাই, কাজী বিপ্লব ভাই, সাদিয়া সুলতানা সম্পা আপুসহ শামীম ভাই, রুপক ভাই, খাদিজা আপু, মুনতাসীর ভাই ও আরো অনেকে। এর আগে যতবার অভিযানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো ততবারই নুর ভাই ও বিপ্লব ভাইকে সাথে পেয়েছি। এবারই প্রথম মুহিত ভাইয়ের সাথে আমি একা যাচ্ছি। তাই নুর ভাই ও বিপ্লব ভাই আমার জিনিসপত্র ঠিক আছে কিনা চেক করে দিলেন। আমরা ৭.৪৫ টার দিকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সবাই আমাদের দু’জনকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলো, তারাও আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। যদি ফিরে আসি তাহলে আবার এই অসাধারণ মানুষগুলোকে পাশে পাবো।

শনিবার হওয়ায় রাস্তা ফাঁকা। বনানী আর্মি স্টেডিয়াম পেরিয়ে ফ্লাইওভারে উঠে এলাম। মোবাইলটা বের করে মাকে ফোন দিলাম। আমি রওনা হয়েছি মাকে জানানোর জন্য। দুইদিন আগে বাড়ি গিয়ে সবার সঙ্গে দেখা করে এসেছি। আমার সব কাজে আব্বা পাশে থেকেছেন। এর আগেও যতবার পর্বতে গিয়েছি ততবার আব্বা ঢাকায় এসে সংবাদ সম্মেলনে থেকে আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি আমার চেয়েও বেশি উৎসাহিত ছিলেন। এবারই প্রথম তিনি আমার পাশে নেই। জানুয়ারিতে তিনি গত হয়েছেন। আজ আব্বাকে ভীষণ মনে পড়ছে! বেঁচে থাকলে আমার পাশে থাকতেন। সফলতা ব্যর্থতায় উৎসাহ দিতেন। আমাকে নিয়ে মা ভয় পাচ্ছেন, কারণ তিনি জানেন পর্বতারোহণ খুব ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। তবু তিনি নিজে শক্ত করে আমাকে সাহস দিলেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ভরসা। ভালোভাবে ফিরে আসো। সাবধানে থেকো, আমাদের নিয়ে চিন্তা করো না। ইনশাল্লাহ, তোমরা পর্বত জয় করেই ফিরে আসবে।’

মুহিত ভাইও মার সঙ্গে কথা বললেন। কথা বলতে বলতে ৮টার মধ্যে আমরা চলে এলাম হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গাড়ি থেকে নেমে ট্রলিতে ডাফলব্যাগ নিয়ে লাইনে ভেতরে ঢুকে এলাম। বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে আমাদের টিকেট কাটা। বিমানের অফিস থেকেই মুহিত ভাই টিকেট কেটে বোর্ডিং পাস আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিলেন। তাই আমরা শুধু আমাদের ডাফলব্যাগগুলো বিমানের কাউন্টারে দিয়ে দিলাম। অনেক মানুষের ভিড়। পুজার ছুটিতে অসংখ্য মানুষ নেপাল যাচ্ছে বেড়াতে। আমরা ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছি। কাঠমান্ডুতে যাওয়ার পর মুহিত ভাইয়ের বন্ধুদের আবদার থাকে ঢাকার মিষ্টির। তাই বরাবরের মতো তাদের জন্য মিষ্টি কেনা হলো। এয়ারপোর্টের সকল কাজ সেরে নির্দিষ্ট গেইটে এসে সবাই বসে আছি। আমাদের ফ্লাইটের সময় ছিলো সাড়ে দশটা। কিন্তু সময় মতো যাওয়া হচ্ছে না। তাই কাঁচে ঘেরা ওয়েটিং রুমে বসেই বিমানগুলোর অবতরণ ও উড্ডয়ন দেখছি। দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। রানওয়েতে বিমানগুলো দ্রুতগতিতে দৌড়ে গিয়ে ডানা মেলে হাওয়ায় ভেসে উপরে উঠে যাচ্ছে।

সময় হয়ে গেছে। সবাই বিমানের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম। বিমানের পরিপাটি শাড়ি পরা তরুণী ক্রু আমাদের প্রত্যেককে অভ্যর্থনা জানালেন। আমাদের সিট সামনের দিকেই। ডান পাশের জানালায় আমি বসেছি। মাঝখানে মুহিত ভাই আর তার পাশে একজন ইউরোপিয়ান ভদ্রলোক। ঠিক সকাল ১১টার সময় বিমান রানওয়ের দিকে এগিয়ে চলতে শুরু করলো। রানওয়ের ঠিক উত্তর মাথা থেকে বিমান দৌড়ানো শুরু করে হাওয়ায় ভেসে উঠলো। জানালা দিয়ে উপরে উঠে আসাটা দেখছি। একটা সময় বিমান মেঘের উপরে চলে এলো। উপর থেকে ঢাকা শহর দেখছি। থোকায় থোকায় মেঘ এসে বিমানের সাথে মিশে যাচ্ছে।

নিউটার্ন.কম/এআর

1 Shares