নিউটার্ন ডেস্ক :
বয়স যখন ১৭, তখন হজকিন লিম্ফোমা নামে বিরল রক্তের ক্যান্সার সনাক্ত হয় ক্যাসান্ড্রা বেকনের। প্রাথমিক কেমোথেরাপির একটি কোর্সই তাকে রোগমুক্তির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল ওই সময়।বিবিসি

কিন্তু এক বছর পর ক্যান্সারটি আবার ফিরে আসে এবং এবার আরও মারাত্মকভাবে। ডাক্তাররা বেকনকে জানান যে তাকে অবিলম্বে উচ্চ মাত্রার কেমোথেরাপি শুরু করতে হবে।

“যখন তুমি ড্রাইভিং শিখছো এবং একই সঙ্গে এ-লেভেল (স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষা)- এর মাঝখানে আছো, তখন ওই বয়সে এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কেউই যেতে চায় না। এটা বেশ কঠিন ছিল,” বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি অনুষ্ঠান ‘নিউজআওয়ার’-কে বলেন তিনি।

কিশোরী হওয়া সত্ত্বেও বেকন ওই সময়ই চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং কীভাবে তিনি তার প্রজনন ক্ষমতা রক্ষা করতে পারেন, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন।

ডিম্বাণু হিমায়িত করার জন্য প্রয়োজনীয় মাসিক ঋতুচক্রের জন্য অপেক্ষা করার সময় না থাকায়, বেকন সেই সময়ে একটি বিকল্প ও পরীক্ষামূলক পদ্ধতির জন্য জোর দেন; আর সেটি ছিল ডিম্বাশয়ের টিস্যু প্রতিস্থাপন।

বেকনের ডিম্বাশয় থেকে বায়োপসি নমুনা হিমায়িত করার ২৩ বছর পর, সেগুলো ৪৪ বছর বয়সে আবার তার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। তিনি গত মাসে ল্যান্ডন নামের তার প্রথম সন্তান, একটি ছেলেশিশুর জন্ম দিয়েছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত প্রতিস্থাপিত ডিম্বাশয়ের টিস্যু থেকে জন্ম নেয়া সে-ই প্রথম শিশু।

নিজের কৈশোরের দিকে ফিরে তাকিয়ে বেকন বলেন, তিনি সবসময় মা হতে চেয়েছিলেন। যখন তিনি জৈবিক সন্তান ধারণ করতে না পারার আশঙ্কার মুখোমুখি হন, তখন তিনি কিছু একটা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।

তিনি বলেন, “আমি জানি না কেন, কিন্তু আমি এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছিলাম না যে, যদি শেষ পর্যন্ত তাই হয় এবং আমি স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করতে না পারি, তাহলে আমাকে আশা দেয়ার মতো কিছুই করার থাকবে না।”

ডিম্বাণু হিমায়িতকরণ একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি, যা সেইসব নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় যারা স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে অক্ষম। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু সংগ্রহের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে হরমোন ইনজেকশন নিতে হয়। বেকনকে বলা হয়েছিল যে তার হাতে সেই সময় নেই।

চিকিৎসার আগে তার ডিম্বাশয়ের কিছু টিস্যু অপসারণ করা উচিত। এ বিষয়ে ডাক্তারদের রাজি করানোর পর বেকন ডক্টর সারা ম্যাথিউসের সন্ধান পান, যিনি যুক্তরাজ্যে এই বিশেষ অস্ত্রোপচারটি করতে সক্ষম হাতেগোনা কয়েকজন শল্যচিকিৎসকের মধ্যে একজন ছিলেন।

ম্যাথিউস বেকনের ডিম্বাশয় থেকে চারটি বায়োপসি নিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো থেকে একদিন সন্তান জন্মাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

‘একমাত্র আশা’
বেকনের জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা, যার মধ্যে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন এবং কেমোথেরাপি অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা সফল হয়েছিল এবং তিনি আবারও ক্যান্সারমুক্ত হয়েছিলেন।

কিন্তু চিকিৎসকদের সন্দেহ মতোই, এই জটিল চিকিৎসা তার ডিম্বাশয়ের মারাত্মক ক্ষতি করেছিল এবং ৩৩ বছর বয়সে বেকনের অকাল মেনোপজ শুরু হয়।

সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুত হয়ে, তিনি এমন একজন ডাক্তার খুঁজে বের করার জন্য লড়াই শুরু করেন, যিনি তার হিমায়িত ও সুস্থ টিস্যু পুনরায় তার শরীরে প্রতিস্থাপন করতে পারবেন। আর এতে সময় লাগে প্রায় এক দশক।

বেকনের ডিম্বাশয়ের টিস্যু অপসারণের অস্ত্রোপচারটি এই পদ্ধতি সংক্রান্ত যুক্তরাজ্যের আইন প্রণয়নের আগে করা হয়েছিল। যার অর্থ হলো, ২০ বছর পরে ডিম্বাশয়ের টিস্যু প্রতিস্থাপন করার জন্য এখন যে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়, তার কাছে সেগুলোর কোনোটিই ছিল না।

পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে ম্যাথিউস তার পাশে ছিলেন এবং অবশেষে তাকে ইসরায়েলে এমন একটি ক্লিনিক খুঁজে পেতে সাহায্য করেন যারা কাজটি করতে রাজি ছিল।

টিস্যুটি রামাত গান শহরের শেবা মেডিকেল সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছিল, কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যোদ্ধারা ইসরায়েলে হামলা চালালে বেকনের বহু প্রতীক্ষিত অস্ত্রোপচার বিলম্বিত হয়, যার ফলে গাজায় একটি ব্যাপক ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হয়।

“আমি ভাবলাম, ‘আমার একমাত্র আশাও কি ধ্বংস হয়ে যাবে’?”, তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে বলেন।

২০২৪ সালের মে মাসে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি বেকনকে ভ্রমণ করতে এবং নিরাপদে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার সুযোগ করে দেয়। তিনি যুক্তরাজ্যে ফেরার ফ্লাইটে ওঠার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধবিরতি তুলে নেয়ার খবর আসে।

“আপনি এই অনুভূতি লিখে প্রকাশ করতে পারবেন না,” বলেন তিনি।

ডিম্বাশয়ের টিস্যু প্রতিস্থাপন কীভাবে কাজ করে?
একজন শল্যচিকিৎসক ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু উৎপাদনকারী টিস্যুর অংশবিশেষ অপসারণ করেন। রোগী সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো একটি ল্যাবে সংরক্ষণ ও হিমায়িত করে রাখা হয়।

কোনো ব্যক্তির দেহে টিস্যুটি পুনরায় প্রতিস্থাপন করা অনেকটা ত্বক প্রতিস্থাপনের (স্কিন গ্রাফট) মতোই — অবশিষ্ট ডিম্বাশয়ের উপরে বা কাছাকাছি স্থাপন করা হলে, গলিত টিস্যুটি আশেপাশের রক্তনালীগুলোর সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হয়ে যায় এবং ডিম্বাশয়গুলো প্রতি মাসে একটি করে ডিম্বাণু নিঃসরণ করতে শুরু করে।

২০২৪ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষেত্রে একজন নারী প্রজনন চক্র পুনরুদ্ধার হয় এবং ২০২২ সালের আরেকটি পৃথক গবেষণা অনুসারে, ডিম্বাশয়ের টিস্যু প্রতিস্থাপনের ফলে প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে জীবিত শিশুর জন্ম হয়।

২০১৬ সালে, দুবাইয়ের বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী মোজা আল মাতরুশিকে বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হয়েছিল, যিনি বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়ার আগে ডিম্বাশয় হিমায়িত করার পর সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন।

বিশ্বব্যাপী ডিম্বাশয়ের টিস্যু প্রতিস্থাপনের পর আনুমানিক ২০০টিরও বেশি শিশুর জন্ম হয়েছে।

‘নিজেকেই ধন্যবাদ জানাতে হবে’
২০২৪ সালে ডিম্বাশয়ের টিস্যু প্রতিস্থাপনের মাত্র কয়েক মাস পরেই বেকনের মাসিক ফিরে আসে। স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায়, ডাক্তাররা তাকে ও তার সঙ্গীকে আইভিএফ করার পরামর্শ দেন।

এই দম্পতি তিন দফা চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যান এবং অবশেষে, ২০২৫ সালের বড়দিনের দিনে, বেকনের হাতে একটি পজিটিভ প্রেগন্যান্সি টেস্ট আসে।

“আমার উনিশ বছরের অত্যন্ত উর্বর শরীরই ৪৩ বছর বয়সে আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে,” তিনি বলেন।

বেকনের ছেলে ল্যান্ডন এই বছরের সেপ্টেম্বরে জন্মগ্রহণ করেছে। আর এই শিশুর মা বেকন ২৫ বছর ধরে ক্যান্সারমুক্ত আছেন।

বেকন জানিয়েছেন, নিজের গল্পটি সবার সঙ্গে ভাগ করে নেয়ার পর থেকে তিনি এমন অনেক নারীর কাছ থেকে বার্তা পেয়েছেন, যারা তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

ম্যাথিউস বলেন, যেহেতু শিশুদের ক্যান্সারের পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে, তাই আজকাল অল্পবয়সী ক্যান্সার রোগীদের জন্য প্রজনন সংক্রান্ত বিকল্প নিয়ে আলোচনাকে আরও বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

“আমরা চাই এই শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে একটি স্বাভাবিক জীবনযাপন করুক, এবং এর একটি বড় অংশ হলো পরিবার গঠন করার ক্ষমতা,” তিনি বলেন।

তার গল্প শুনে অন্যদের মতোই বেকনও তার এত অল্প বয়সে দেখানো দৃঢ়তায় হতবাক হন।

“আমি এখনো আমার ১৮ বছর বয়সের জায়গায় নিজেকে রেখে ভাবার চেষ্টা করি, ‘আমি কী করে এত অধ্যবসায়ী ছিলাম? আমি কী করে এত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম?’ এবং আমার মনে হয়, এটা সেইসব বিষয়গুলোর মধ্যে একটা যার জন্য আমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে এবং নিজেকে ধন্যবাদ জানাতে হবে।”

Article Information
Author,রেবেকা থর্নRole,গ্লোবাল হেলথ এবং Author,সালমা নূরমোহামেদRole,নিউজআওয়ার, ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *