Home » সারাদেশ » সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের উথারিয়া ফসলরক্ষা বাঁধ নতুন মাটি একমুঠোও পড়েনি, মেশিনে খুঁড়ে দেয়া হয়েছে নতুন রূপ

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের উথারিয়া ফসলরক্ষা বাঁধ নতুন মাটি একমুঠোও পড়েনি, মেশিনে খুঁড়ে দেয়া হয়েছে নতুন রূপ

 

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি::
সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের গুরুত্বপূর্ণ উথারিয়া বাঁধে এখনো একমুঠো মাটিও পড়েনি। সম্পূর্ণ বাঁধটিও অক্ষত। সরেজমিনে বাঁধ এলাকায় গিয়ে এই দৃশ্য দেখা গেলেও গত সপ্তাতে নতুন বাঁধটি এস্কেভেটর মেশিনে খুঁড়ে নতুন রূপ দেয়া হয়েছে। যে কেউ দেখলেই মনে হবে নতুন মাটি ফেলা হয়েছে। অথচ কোথাও মাটি কাটার চিহ্ন নেই। দেখার হাওরের আস্তমা এলাকায় ডাইক-১ ও ডাইক-২-তে মহাসিং নদীর দুই তীরের ৫ হাজার ৬৯৫ মিটার অক্ষত বাঁধে এবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা।শান্তিগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব ডিবিশনাল অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত এই হাওরটিতে প্রায় ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়। হাওরের গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ হলো উথারিয়া বাঁধ ও ক্লোজার। এই উপজেলায় চলতি মওসুমে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৭টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মহাসিং নদী তীরের উথারিয়া এলাকায় ৭টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। সরকারিভাবে তিনটি ক্লোজার (বড় ভাঙ্গন) বলা হলেও ভাঙ্গনগুলো ছোট এবং ঝুঁকিমুক্ত দেখা গেছে। বাঁধগুলোও প্রায় অক্ষত। সামান্য ড্রেসিং করে কাজ স¤পন্ন করার সুযোগ থাকলেও পুরনো বাঁধের মাটি খুঁড়ে বাঁধগুলোকে নতুন রূপ দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। এতে সরকারি বিপুল বরাদ্দ লোপাটের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিনে গত শুক্রবার সকালে আস্তমা গ্রামে মহাসিং নদীর তীরের উথারিয়া বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর গ্রামীণ সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নকাজ করছে। গ্রামের শেষ প্রান্ত থেকেই ফসলরক্ষা বাঁধ শুরু। ফসলরক্ষা বাঁধ থেকে উথারিয়া ক্লোজার পর্যন্ত হেঁটে ও মোটরসাইকেলে গিয়ে দেখা যায়, সাতটি প্রকল্পের সবগুলোই অক্ষত।ক্লোজারগুলো সামান্য ওয়াশ আউট হলেও স¤পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত লক্ষ করা গেছে। তিনটি ক্লোজারই মোটরসাইকেলে সহজে পাড়ি দেয়া যায়। দেখার হাওরের ক্ষেতে কাজ করা একাধিক কৃষক জানান, গত সপ্তাহে পিআইসি’র লোকজন এস্কেভেটর মেশিন নিয়ে অক্ষত বাঁধটিকে খুঁড়েছে। এতে মাটি ছোট ছোট চাকায় রূপ নিয়েছে। দেখতে নতুন মনে হচ্ছে। যে কেউ দেখলে মনে হবে নতুন মাটি ফেলা হয়েছে। শুধু দুর্মুজ দিলেই কাজ পরিপূর্ণতা পাবে। এভাবেই এক মুঠো মাটি না ফেলেও পুরো বাঁধগুলোকে নতুন রূপ দেয়া হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, বরাদ্দ লোপাট করতে পিআইসি’র লোকজন চোখে ধুলো দিচ্ছেনাতো? এই ঘষামাজা করে কি বিপুল বরাদ্দ জায়েজ করা হবে? এই বাঁধটিতে এতো বরাদ্দ দেয়ারও প্রয়োজন নেই বলে জানান কৃষকরা। আস্তমা গ্রামের কৃষক আজির উদ্দিন বলেন, উথারিয়া বান্দ ও পাশের কোনও বান্দেই কাজ শুরু অইছেনা। গত সাপ্তাত মেশিনদি আমরার পুরান বান্দরে আইয়া কুইরা গেছে। এখন দেখতে নয়া লাগে। ইতা কেনে করছে বুঝিনা। তিনি জানান, উথারিয়া এলাকার সবগুলো বাঁধই অক্ষত। সামান্য কাজ করলেই বাঁধগুলো টেকসই হয়ে যাবে। কিন্তু এখনো কাজ ধরেনি পিআইসি’র লোকজন। বাঁধ তীরবর্তী ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হেকিম বলেন, উথারিয়া অইলো দেখার আউরের আসল বান্দ। ইবান্দ ভাঙলে আস্তা আউর ডুবি যায়। কিন্তু ইবার অখনও মাটি ফালাইছেনা। পুরান বান্দে আইয়া মেশিনদি কয়দিন আগে কুইরা গেছে। পাশের বড়দই বিলের মাছ আহরণ না হলে বাঁধের কাজ শুরু হয়না বলে জানান এই কৃষক। আস্তমা গ্রামের কৃষক ফরহাদ হোসেন বলেন, দেখার হাওর প্রাণকেন্দ্র কেলা উথারিয়া বাঁধ। বাঁধগুলোর সবকটিই ভালো আছে। সামান্য কাজ যদি এখন থেকে মনোযোগ দিয়ে করে তাহলে বাঁধ টেকসই হবে। কিন্তু তারা এখনো কাজ শুরু করছেনা। বাঁধে মাটি না দিয়ে কয়েকদিন আগে এসে সুন্দর বাঁধগুলো মেশিন দিয়ে খুঁড়ে গেছে। আমরা জিজ্ঞেস করলে বলেছে, গাড়ির যাতায়াতের জন্য খুঁড়ে সমান করে দিচ্ছে। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ স¤পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মিত হচ্ছে কয়েক যুগ ধরে। কখনো এই অভিনব পন্থা ছিলনা মাটি খুঁড়ে নতুন মাটি দেয়া হবে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে প্রকৌশলীরা বলছেন মাটি না খুঁড়লে নতুন মাটি বসবেনা। এভাবে প্রকল্প বানিয়ে সরকারি বরাদ্দ লোপাট করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মাটির সহজলভ্যতার কারণেই হাওরের বাঁধের কাজে বিলম্ব হয় মূলত মানুষের চোখে ধুলো দেয়ার জন্য। উথারিয়া এলাকায়ও সরকারি বরাদ্দ লোপাট করতে এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। একমুঠো মাটি না দিয়েও কেবল মাটি খুঁড়ে নতুন রূপ দেয়া হয়েছে। হঠাৎ একদিন বরাদ্দও তুলে নিবে কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে। শান্তিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব ডিবিশনাল অফিসার (এসও) কামরুজ্জামান মোহন বলেন, উথারিয়া এলাকায় ৭টি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ক্লোজার রয়েছে। ক্লোজারে কাজ শুরু হয়ে গেছে। পুরনো বাঁধ খুঁড়ে নতুন দেখানো হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাঁধ টেকসই করার জন্য খুঁড়ে দেয়া হয়। সার্ভেয়াররা যথাযথভাবেই প্রাক্কলন করেছেন। কোনও অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি।

0 Shares