‘কঠোর’ বিল সোমবারেই, সংসদ কি শান্ত হবে? রাজপথের লড়াই ধর্মেন্দ্র প্রধানেই ‘শেষ নয় শুরু’, ঘোষণা ‘আরশোলা’ প্রধানের

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রবিবার ফের ভিডিয়ো-বার্তা দিয়েছেন। অমিত শাহ বিবৃতি দিয়েছেন। রাহুল গাঁধী চিঠি পাঠিয়েছেন শাহকে। সোমবার সংসদের অধিবেশনের আগে সব পক্ষই যে যার মতো করে তৈরি।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার পর রবিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছেন প্রহ্লাদ জোশী। যন্তর মন্তরের চত্বর খাঁ খাঁ করছে। আন্দোলনকারীরা যে যার বাড়ি। কিন্তু ‘শেষ’ হয়েও সব কিছু শেষ হয়নি। বরং নতুন শুরুর প্রস্তুতি সব তরফ থেকেই স্পষ্ট।আনন্দবাজার ডট কম

প্রশ্নফাঁস বিরোধী ধারা-অনুচ্ছেদকে আরও কঠোর করতে, আরও কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে সোমবারই লোকসভায় বিল পেশ করবে নরেন্দ্র মোদী সরকার। রবিবার সন্ধ্যায় ভিডিয়োবার্তায় তা আর এক বার নিশ্চিতও করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু বিরোধীদের দাবিমতো সংসদ অভিযানে যাওয়া পড়ুয়াদের উপর পুলিশি অভিযানের ‘বাড়াবাড়ি’ নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা দূরে থাক, কোনও প্রকাশ্য বিবৃতিও দেননি তিনি। এ নিয়ে সরকার এবং বিরোধীপক্ষের দ্বৈরথ যে সোমবারও থেমে থাকবে না, তা রাজধানীর গতিপ্রকৃতি থেকে স্পষ্ট।

লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী রবিবার চিঠি পাঠিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। তাতে জানতে চেয়েছেন, আন্দোলনকারীদের উপরে ছর্‌রা গুলি কেন চালানো হল? কে চালাল? কে-ই বা সেই নির্দেশ দিলেন? দিল্লি পুলিশের দাবি, তাদের বাহিনী ছর্‌রা গুলি ছোড়েনি। অথচ রাহুলের দাবি, জখম এক পড়ুয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিতে ছর্‌রার আঘাতের উল্লেখ রয়েছে। তবে ঘটনার সময়ে সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীও উপস্থিত ছিল। ফলে কোথা থেকে কী ভাবে ছর্‌রা গুলি চলেছে, তা স্পষ্ট নয়।

t
রাহুলের দাবি, কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিবাদীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবাদ মিছিলের দিন, সাধারণ পোশাকে যারা আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করেছেন, তাদের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেতা। তারা কি আদৌ পুলিশ ছিলেন? শাহের কাছে জানতে চেয়েছেন রাহুল।

যন্তর মন্তরে টানা ৩৬ দিন চলা ধর্না শনিবারই প্রত্যাহার করে নিয়েছে সিজেপি। তবে পিছু হটছে না বিরোধীরা। পড়ুয়াদের মিছিলে ‘পুলিশি জুলুমের’ অভিযোগে সংসদে কেন্দ্রকে কোণঠাসা করতে চাইছে তারা। ‘ছর্‌রা’ কাণ্ডে কেন্দ্রের জবাবদিহি চাইছে কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি। সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিট্টাস জানিয়েছেন, শাহের ইস্তফার দাবিতে সংসদে সরব হবেন বিরোধীরা। কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খড়্গেরও দাবি, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে।

ধর্মেন্দ্রের ইস্তফার পর থেকে রবিবার রাত-ইস্তক ছাত্র-বিক্ষোভ বা শিক্ষামন্ত্রী বদল নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি প্রধানমন্ত্রী। ‘মন কী বাত’-এ এই বিষয়ে নীরব ছিলেন। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই অনুষ্ঠানটি আগে রেকর্ড করে পরে সম্প্রচারিত হয়। পরে ‘বিকশিত ভাইব্র্যান্ট ভিলেজ প্রোগ্রাম’-এও এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি তিনি। সন্ধ্যায় সমাজমাধ্যমে দেয়া ভিডিয়োবার্তায় পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের লক্ষ্যে টাস্ক ফোর্স গঠনের ঘোষণা করেন মোদী। সেখানেও ধর্মেন্দ্রর ইস্তফা, আন্দোলন এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নীরবই থেকেছেন।

বস্তুত, মোদী জমানায় এই প্রথম কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আন্দোলনের চাপে ইস্তফা দিলেন। ফলে ধর্মেন্দ্রের ইস্তফার পরে প্রধানমন্ত্রী কী বার্তা দেন, তা নিয়ে গোটা দেশে কৌতূহল বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকের মতে, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ যে ভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়াতে শুরু করেছিল, তাতে শিক্ষামন্ত্রী বদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। আবার কারও মতে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে, ধর্মেন্দ্রের ইস্তফায় তাতে আপাতত প্রলেপ দেয়া গেছে মাত্র। শিক্ষিত যুবাদের জন্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলিও এতে অনুঘটকের মতো কাজ করেছে। এগুলির থেকে নিস্তারের একটি গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে দেশের অর্থনীতিকে আরও উন্নত করাই একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ সরকারের কাছে।

এ সবের মধ্যে প্রশ্নফাঁস রুখতে সোমবার সংসদে সংশোধনী বিল আনছে কেন্দ্র। শিক্ষাব্যবস্থার উপর দেশের ছাত্র-যুবাদের আস্থা ফেরাতে লোকসভায় পেশ হবে ‘পাবলিক এগ্‌জ়ামিনেশন অ্যামেন্ডমেন্ট ২০২৬’ বিল। এই বিল আইনে পরিণত হলে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে দোষীদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। সঙ্গে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানাও করা হতে পারে। বিল নিয়ে বিরোধীদের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে সোমবার সকালে সংসদে খড়্গের ঘরে বৈঠকে বসবে ‘ইন্ডিয়া’। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়ার দাবি এবং শাহের ইস্তফার দাবি নিয়েও আলোচনা হতে পারে বিরোধীজোটের ওই বৈঠকে।

ধর্মেন্দ্রের ইস্তফা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নীরব থাকলেও মুখ খুলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মোদী সরকারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুখ শাহ রবিবার সকালেই দেশের ছাত্র-যুবাদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন। জানিয়েছেন, কোনও রাজনৈতিক পদই ছাত্র-যুবদের স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারে না। তার মতে, এই নীতিতেই বিশ্বাস করে বিজেপি। ধর্মেন্দ্রের ইস্তফাও বিজেপির সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।

শাহ আরও জানান, প্রশ্নফাঁস রুখতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে হাঁটবে কেন্দ্র। তিনি আত্মবিশ্বাসী, সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলি নিটে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার করবে। কেন্দ্রের আশ্বাসে আন্দোলন আপাতত স্তিমিত হলেও সরকারকে চাপে রাখতে চাইছে সিজেপি-ও। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে রবিবার ভোরে এক ভিডিয়োবার্তাতেই তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, “ধর্না শেষ মানে এই নয়, আন্দোলন শেষ। এই তো সবে শুরু। ককরোচ জনতা পার্টিকে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।’’

দীপকে যখন এই বার্তা দেন, তখন যন্তর মন্তরে আর গত কয়েক সপ্তাহের সেই ভিড় নেই। আন্দোলনকারীরা বাড়িমুখো হয়েছেন। গত প্রায় এক মাস ধরে যারা আন্দোলনের পাশে ছিলেন, তাদের সকলেকেই ধন্যবাদ জানান দীপকে। জানান, সকলের জন্যই এই ‘জয়’ সম্ভব হয়েছে।

ঘরমুখী প্রতিবাদীরা

সিজেপি শনিবারই ঘোষণা করে দিয়েছে যে, তারা যন্তর মন্তর থেকে বিক্ষোভ-অবস্থান তুলে নিচ্ছে। সিজেপি-র তরফে আন্দোলনকারী ও সমর্থকদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। তার পর থেকেই ধীরে ধীরে ভিড় পাতলা হতে শুরু করে যন্তর মন্তরে। কেউ এক সপ্তাহ, কেউ দু’সপ্তাহ, কেউ আবার আন্দোলনের শুরু থেকে বসে ছিলেন যন্তর মন্তরে। তারা একে একে বাড়িমুখি হয়েছেন শনিবার রাত থেকেই। ক্রমে পুরনো ছন্দে ফিরছে যন্তর মন্তর। প্রতিবাদীরা ধর্নাস্থল ছাড়তে শুরু করার পরই যন্তর মন্তর পরিষ্কারের কাজ শুরু করে নয়াদিল্লি পুর পরিষদ। শনিবার গভীর রাত থেকেই তা শুরু হয়ে যায়। ওই রাতেই ধর্মেন্দ্রের উত্তরসূরিরও নাম ঘোষণা হয়ে যায়। শিক্ষা মন্ত্রকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয় উপভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীকে।

দফতরে প্রহ্লাদের প্রথম দিন
দায়িত্ব পাওয়ার পর শনিবারই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কৃতজ্ঞতাপ্রকাশ করেন প্রহ্লাদ। রবিবার থেকেই নতুন দফতরের কাজ শুরু করে দেন। রবিবার সকালে দিল্লির শাস্ত্রী ভবনে নিজের দফতরে যান নতুন শিক্ষামন্ত্রী। আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকও সারেন। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পরে প্রথম বৈঠকের কিছু ছবিও সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। সঙ্গে প্রহ্লাদ লেখেন, ‘‘কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আজ আমি দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। আমার উপর আস্থা রাখার জন্য এবং এই দায়িত্ব আমাকে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। গভীর কর্তব্যবোধ এবং বিনয়ের সঙ্গে আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করছি।’’

নিট-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পর থেকে শিক্ষাব্যবস্থার ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌স্বচ্ছতার উপর জনসাধারণের ভরসা টলমল। সেই ভরসা পুনরুদ্ধার করাই এখন নতুন মন্ত্রীর কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কেন্দ্রের সর্বস্তরে— প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতরেও। রবিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিয়োবার্তাতেও তা-ই প্রতিফলিত হয়েছে।

মোদীর নয়া ভিডিয়োবার্তা

রবিবার রাতে এক্স হ্যান্ডলে একটি ভিডিয়োবার্তা পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী। ছাত্র-যুবাদের বিক্ষোভ এবং বিক্ষোভ পরবর্তী পর্ব মিলিয়ে এটি তার তৃতীয় এমন ভিডিয়ো। সেখানে মোদী জানান, দেশের পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের লক্ষ্যে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা হচ্ছে। পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেবে। কোথায় সংস্কার প্রয়োজন, তা জানিয়ে সরকারের কাছে দ্রুত প্রস্তাব পাঠাবে। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস, টাস্ক ফোর্সের প্রস্তাব মেনে আগামী পরীক্ষাগুলিতে স্বচ্ছতার বিষয়টি সুনিশ্চিত করবে সরকার। এই টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব দেবেন ইনফোসিস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নীলেকণি। পরীক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা ভিডিয়োবার্তায় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জানান, পরীক্ষাব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রযুক্তিকে যথাসম্ভব ব্যবহার করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *