#বাবা ”’,,,,,“তুমি নাই, তবু আছোমনে জুড়ে বাসো,স্বপ্নে ডাকো রোজ যেনোপাশে এসে হাসো ।”মাকে নিয়ে অনেক লিখলেও আব্বাকে নিয়ে লেখা এটাই আমার প্রথম।। আমার বাবাকে কখনো বাবা বলিনি। আব্বা বলেই বড় হয়েছি। আমরা দশ ভাইবোন। আমি নবম। আব্বার কিছুটা ভালোবাসার পাত্র একটা কারনে। পড়াশোনায় অন্যদের চেয়ে ভালো ছিলাম। তাই কিছুটা ভিন্ন ভালোবাসা আব্বার মনে জায়গা ছিল ছোট্ট করে।।দশ ভাইবোন এর পরিবার তাও শহরে। আব্বাকে শুধুমাত্র বড় ভাইকে বাবা বলতে শুনেছি। আর বাকি ৯ ভাইবোন আমরা আব্বাই বলতাম।আমাদের জন্ম টংগীর নিশাত জুট মিলে। আব্বা জীবনে অনেক স্ট্রাগল করেছেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি উত্তরার ডিয়াবাড়ির এক নিভৃত পল্লী শুক্রভাঙা গ্রামে। ৯০ দশকের আগে ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না। গ্রামের চারিদিকে জলাশয়, ডোবা, নালা, নিচু জমি যেখানে ৬ মাস পানি থাকতো বর্ষায়। বর্ষাকাল চলে গেলে শীতের শুরুতে পানি তুরাগ নদীতে নেমে গেলে ৬ মাস এক ফসলি বোরো ধানচাষ হতো।।আমাদের অধিকাংশ আবাদী জমিই ছিল বর্তমানে উত্তরার ১৫ ও ১৬ নম্বর সেক্টরে। প্রায় ১৮/২০ বিঘা জমি বাড়ির ২ বিঘাসহ। অধিকাংশই আব্বার চাকুরীর কষ্টার্জিত উপার্জন থেকে কেনা। জমিতে প্রায় ৩০০ মন ধান হতো।বলছিলাম আব্বার কথা। আব্বা ছেলেবেলায় পুরান ঢাকায় কোন এক ব্যবসায়ী পরিবারে জায়গীর ছিলেন। মানে লজিং থেকে ৩ বেলা খাওয়ার বিনিময়ে বাড়ির বাচ্চাদের পড়াতেন। আব্বার কাছেই শোনাগল্প। যাদের বাসায় ছিলেন সেই দাদু নানুরা আমাদের বাসায় এসে বেড়াতেন তাও দেখেছি।। পুরান ঢাকায় তাদের দিয়াশলাই বানানোর কারখানা ছিল।। সেই বারুদে পুড়েই দাদু মারা যান।আব্বা তেজগাঁও থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ দিয়ে চলে আসেন সংসারের বৃহৎ হাল ধরতে তখনকার অজপাড়া ছায়াঢাকা পাখিডাকা এক অজপাড়াগাঁ শুক্রভাঙ্গা গ্রামে যা এখন বেশ ঘনবসতি গোছানো আধুনিক নগরীর ছোঁয়ায় পরিবর্তনশীল এলাকা।পরবর্তীতে আব্বা এইচএসসি মানে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছিলেন জায়গীর থেকেই যদিও আব্বার সার্টিফিকেট কখনো দেখিনি। আব্বার টানা হাতের লেখাগুলো ছিল চমৎকার! ইংরেজী লেখাও সুন্দর ছিল।। আব্বা কর্মজীবন শুরু করেন পাকিস্তান পিরিয়ডে টংগীর নিশাত জুট মিলে। ধীরেধীরে প্রমোশন পেয়ে জুট মিলের প্রোডাকশন ম্যানেজার পর্যন্ত উন্নীত হোন। আমার জন্ম, শৈশব, কৈশোর কেটেছে টংগীর নিশাত জুট মিলেই।।টংগীর মুদাফার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে আব্বা বিয়ে করেছিলেন। আম্মা ছিল ঐ গোষ্ঠীর বড় মেয়ে। আব্বা মুদাফার বড় জামাই । আমার নানার এক ভাই ছিলেন মাস্টার। টংগী পাইলট স্কুলে জীবন পাড় করেছেন ইসলামিয়াত পড়িয়ে। গফুর মাস্টার। নানার আরেক কাজিন ছিলেন টংগী গাজীপুর আসনের এমপি আব্দুল হাকিম মাস্টার।।আমার আব্বা খুব প্রিয় বড় জামাই ছিলেন ঐ এলাকার। নানারাও ছিলেন অনেক ভাই। বিশাল পরিবার। খালা মামাদের অভাব ছিলনা। চমৎকার যৌথ পরিবার। আমার বয়সী এবং অনেক জুনিয়র ছিলেন অনেক মামা খালারা।।আব্বাকে প্রথম বুঝ অবস্থায় পেয়েছি নিশাত জুট মিলের সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসাবে। কেননা এ নামে সব সময় চিঠি আসতো বাসায়।।আব্বাকে অনেক ভয় পেতাম আমরা ভাইবোনেরা।।কেন ভয় পেতাম তা জানিনা, জানতেও চাইনি। হয়তো তিনি অনেক রাগী ছিলেন কিন্তু বদমেজাজী ছিলেন না। অত্যন্ত ধর্মভীরু। চমৎকার কোরআন পড়তেন। আমাদের সাথে খুনসুটিও করতেন।।ভরাট কন্ঠ ছিল আব্বার। শরীর স্বাস্থ্য ভালো ছিল আলহামদুলিল্লাহ।। আমাদের বাসায় টিভি ছিল না, ফ্রিজ ছিল না।কিন্তু এসব জিনিস থাকার কথা ছিল আব্বার ডেজিগনেশন অনুযায়ী। আব্বা মিতব্যয়ী ছিলেন কিন্তু কৃপন ছিলেন না। আমাদের ১০ ভাইবোনকে পড়ালেখা করাতে কোন কার্পন্য করেননি। সেজন্য উত্তরার তুরাগ থানার হরিরামপুর ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষ আমাদের এক নামে চিনতেন রমিজ সাহেবের ছেলে-মেয়ে হিসাবে।।এখনো চিনেন। যেহেতু আব্বা একমাত্র ঐ ইউনিয়নের মোটামুটি শিক্ষার আলো নিজের মাঝে প্রজ্জ্বলিত করতে পেরেছিলেন। আব্বা চাকুরীজীবি একজন ম্যানেজার।। আব্বা অবশ্য এলাকার অনেককেই চাকুরী দিয়েছিলেন।।নিশাত জুট মিল থেকে প্রমোশন পেয়ে আমাদের সবাইকে নিয়ে আব্বা বদলী হোন ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে।সেখানে আবার ভিন্ন জগত। বিশাল বিশাল এলাকা জুড়ে স্টাফ কোয়ার্টার। শ খানেক পরিবার। তখন আমি ক্লাশ থ্রি ফোরে ভর্তি হই বাওয়ানী আদর্শ স্কুলে। তারপর আব্বা কয়েক বছরের মাথায় আবার বদলী হোন কাঞ্চন মুড়াপাড়ার এলাইড জুটমিলে। এভাবে কেটে যায় জুটমিলের স্টাফ কোয়ার্টার গুলোতে আব্বার দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ।।সংসারে আব্বাকে কখনো হতাশায় দেখিনি আমাদের জীবদ্দশায়। তিনি ৭০ দশকের শেষে ৪০০০ টাকার মতো বেতন পেতেন। তা দিয়ে সংসার চালিয়ে আম্মাকে একটা অংশ দিতেন। কিছু জমাতেন এবং জমানো টাকা দিয়ে জমি কিনতেন। ডিয়াবাড়ির জমিগুলো তখন ৫/৬ হাজার টাকা ছিল প্রতি বিঘা।।আব্বা আমাকে বিভিন্ন অফিসিয়াল দাওয়াতি অনুষ্ঠানে সাথে নিতেন। ক্লাশে ভালো ছাত্র ছিলাম তাই আব্বা ভালোবাসতেন একটু বেশী। কিন্তু তিনি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন না। আমিও হয়েছি আব্বার মতোই।। প্রকাশ করি কম।।আব্বার সেবায় জীবদ্দশার একটা পার্ট গেছে আমার। ক্লাশ ওয়ানের আগে থেকেই আব্বা যখন অফিস থেকে ফিরতেন তার শিথানে/শিয়রে বসে পাকা চুলগুলো খুঁজে খুঁজে বেছে দিতাম!। আব্বার পা, পিঠ পা দিয়ে মাড়ানো নিত্যনৈমিত্তিক কাজ ছিল। যা চলমান ছিল কলেজ লাইফ পর্যন্ত। পরবর্তীতে পরের জেনারেশন আমার বাচ্চাদেরও এ কাজে লাগিয়েছি।।এক সময় আব্বা চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে ডিয়াবাড়ি আমাদের গ্রামে চলে আসেন ১৯৮৫ সালে। তিনি পরিশ্রমী ছিলেন তাই বসে থাকেননি। আরও বছর দশেক একটা ফার্মেসী চালিয়েছেন টংগীতে বড় ভাইয়ের সাথে।আব্বার বয়স বাড়লো, আমরা সব ভাইবোনের বিয়ে, বিয়ের সকল খরচ আব্বাই বহন করেছেন সাত গ্রামের মানুষ দাওয়াত করে।আব্বার ছিল ডায়াবেটিস। বিয়ের পর বাচ্চাদের স্কুল ও আমার অফিস যাতায়াতে সমস্যার কারনে আব্বার পরামর্শে আমরা বাসা নিলাম উত্তরায় সেক্টরে। আব্বার জন্য টেনশান হতো। আম্মা সারাজীবন আব্বাকে সাপোর্ট দিয়েছেন। বুড়ো বয়সে একটা দিনের জন্যও আব্বা আম্মাকে ছাড়া আলাদা বিছানায় ঘুমাননি। বৃদ্ধ বয়সেও আমার নানাবাড়ি একসাথে বেড়াতে যেতেন।। আমি জোর করে আমার বাসায় আম্মা আব্বাকে নিয়ে আসতাম শুধু ডায়াবেটিস ট্রিটমেন্ট এর জন্য মাসে একবার। ক’দিন থেকে চলে যেতেন। ।।আমার বাসায় এসে থাকতেন তারা। প্রতিমাসে আসতেন বাধ্য হয়ে ডায়াবেটিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে, ডাক্তার দেখাতে। আব্বা আম্মার সাথে আমার স্ত্রীর বন্ডিংসটা ছিল অনন্য উচ্চতার। আব্বা মা তাকে নিজ মেয়ের মতো দেখতেন, একেবারে নিজের সন্তান।।আব্বার বয়স হলো। আম্মা হঠাৎ ক্যান্সারে মারা গেলেন। আব্বা অসুস্থ্য হয়ে পড়তে লাগলেন। একাকী জীবন যে কতো কস্টের তা দেখে আমিও নিভৃতে কাঁদতাম। আব্বাকে বোনদের বাসায় ভাইদের বাসায় পাঠিয়ে দিতাম ক’দিন করে থাকার জন্য। তিনি বাড়ি ছাড়া থাকতে চাইতেন না।। সব সময় বলতেন ভালো আছি।এক সময় হাসপাতাল বাড়ি চলতে থাকলো। কয়েকবার অসুস্থ্য হয়ে আবার বাড়ি ফিরে যান।। আম্মাকে খুব মিস করতেন।। সত্যি সত্যি আব্বা আবার অসুস্থ্য হলেন। আমি উত্তরা রাজউক কলেজের পিছনে একটা হাসপাতালে ভর্তি করালাম। ভাইবোনেরা আসেন। দেখে যান, আমি প্রতিদিন যাই। আব্বা আইসিইউ বেডে চলে গেলেন জ্ঞানহীন। হাসপাতালের মালিক ও এমডি ডাঃ রাশেদ ভাই আমার খুব পরিচিত।আব্বার খুব টেককেয়ার করতেন হাসপাতালে । টানা ১০ দিন আইসিইউতে থাকার পর একদিন রাত ৩ টায় কল দেন মোবাইলে।। বললেন আপনার আব্বাকে একটু দেখে যান। তিনি আর কিছু বললেন না। তার কথার টোনে বুঝলাম আব্বা হয়তো নেই।।😭😭পেট মোচড় দিয়ে উঠলো। এক গ্লাশ পানি খেলাম। আমি তখন উত্তরা সেক্টর ৫ এ নিজ ফ্লাটে থাকি। আব্বার হাসপাতাল উল্টাদিকে রাস্তার ওপাড়ে সেক্টর ৬ এ।।এখনতো গভীর রাত। কিভাবে যাই। আমার গাড়ি নেই। কোন রিক্সা নেই। দিলাম দৌড় কিছু না ভেবে। পথে একটা রিক্সা পেলাম। আজমপুর বাসস্ট্যান্ডের আগেই তার হাতে টাকা গুজে দিলাম আবার দৌড়। এক হাইজাম্পে রাস্তার মাঝের ডিভাইডার কিভাবে পাড় হলাম মনে নেই।রাস্তার ওপাড়েও কোন রিক্সা নেই। শুনশান নিরবতা। ছুটলাম ১০০ মিটার ২০০ মিটার ৪০০ মিটার বেগে দৌড়ে। নিমিষেই পৌঁছালাম হাসপাতালে। সিঁড়ি ভেঙে দৌড়ে উঠলাম ৩ তলার আইসিইউ বেডের কাছে। মেশিন চলছে। আব্বা আগের মতোই জ্ঞানহীন। আমি বিধ্বস্ত ক্লান্ত দম ফেলতে কস্ট হচ্ছে।ডা: রাশেদ ভাই বিষন্ন বদনে আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। আব্বার নিথর দেহ পড়ে আছে।কিন্তু শ্বাস নিচ্ছেন যে! ডাক্তার বললেন পাইপ খুলে দেয়া হলে বন্ধ হয়ে যাবে। মেশিন সচল কিন্তু আপনার আব্বা ঘন্টাখানেকের কম সময় আগে আল্লাহর কাছে পৌঁছে গেছেন।।আব্বা বলে চিৎকার দিলাম না। অসম্ভব শান্ত আমি। একেবারে নির্জীব। চোখ পানিশুন্য।। আব্বার কপালে মাথায় হাত দিলাম। বরফ শীতল শরীর। চোখগুলো বোঁজা। মুখে নাকে পাইপ লাগানো।। ঠিক মৃত্যুর আগের দিনে আমি আমার পুরনো মোবাইলে আব্বার একটা ছবি ধারন করি।(ছবিটি সংযুক্ত) ছোট ভাই বাবুকে কল দিলাম। সবাইকে জানালাম। ওরা হাসপাতালে আসলো। বাবুর হাতে ৫০০ টাকার একটা বান্ডিল। মানে ৫০ হাজার টাকা। লাশ নিয়ে যাবো, বিল আসছে প্রায় ২ লাখ। আগেই ৫০ হাজার পেমেন্ট করা। ডা: রাশেদ ভাই বললেন যান তো! টাকা পরে দিয়েন। আব্বাকে নিয়ে রওয়ানা হই এম্বুলেন্স নিয়ে আমরা কয়েকজন। ১০ মিনিটে বাড়ি পৌছে যাই আব্বার লাশ নিয়ে।।এটাই আমার আব্বার স্মৃতি।। অন্য কোন ছবি নেই আব্বার সাথে। কেন নেই জানিনা।। অথচ আমি ছবির পোকা। আব্বার সাথে কোন ছবি নেই, স্মৃতি নেই, এটা কস্টের!।। আছে শুধু তার একান্ত দোয়া।। আব্বা আমার মাথায় কপালে হাত ছুঁয়ে দিয়ে দোয়া করতেন প্রায়ই।।।আব্বার কারনেই আজ আমি একজন ব্যাংকার। আব্বার জন্যই একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছি আমাকে আগলে রাখার।।। সেই আব্বাকে মাঝেমধ্যে তাহাজ্জুদ নামাজে খুঁজে পাই। পাই না শুধু তার স্নেহের পরশটুকু, একটু আদর ভালোবাসা ও দোয়া।। আব্বা নেই আজ একযুগেরও বেশী।।😭🥲রাব্বির হামহুমা ক্বামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।।বোরহান আহমেদ, উত্তরা।২১ জুন, ২০২৬, রাত ১২ টা ১ মিনিট। Borhan Ahmed’s post, পেজ থেকে Post Views: 35 Post navigation বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্র্যাক ব্যাংক ও ব্র্যাকের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত