দীর্ঘদিন পর দপ্তরী-পিয়নদের ‘নিম্নপদে’ নামিয়ে দেয়ার অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা
সমন্বয়, প্রজ্ঞাপন ও নতুন নিয়োগ বন্ধসহ ৪ দফা দাবি; দাবি না মানলে হাইকোর্টে রিট ও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির :

দীর্ঘ ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চাকরি করার পর হঠাৎ পদ-পদবী জটিলতায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন দেশের হাজারো এমএলএসএস (দপ্তরী/পিয়ন) কর্মচারী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার অস্পষ্টতা এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তাদের চাকরি, মর্যাদা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছে এমপিওভুক্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পরিষদ।

রোববার এক যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান, মহাসচিব মো. কামরুল খান, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সোহেল ভূঁইয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. কাউসার হোসেন এবং আইন বিষয়ক সম্পাদক আবু সুফিয়ান এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, ১৯৯৫ এবং ২০১০-২০১৩ সালের এমপিও নীতিমালার আওতায় “৮ম শ্রেণি পাস” শিক্ষাগত যোগ্যতায় তারা স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় এমএলএসএস (দপ্তরী/পিয়ন) পদে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে ২০২১ এবং ২০২৬ সালের সংশোধিত এমপিও নীতিমালায় ওই পদের নাম পরিবর্তন করে “অফিস সহায়ক” করা হলেও পূর্বে কর্মরত দপ্তরী ও পিয়নদের নতুন পদে সমন্বয়ের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

তাদের অভিযোগ, এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দপ্তরী ও পিয়নদের জোরপূর্বক পরিচ্ছন্নতাকর্মি, নিরাপত্তাকর্মি কিংবা নৈশপ্রহরী পদে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে।

সংগঠনের সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান ও মহাসচিব মো. কামরুল খান বলেন, “দীর্ঘ ২০-২৫ বছর একটি পদে দায়িত্ব পালন করার পর হঠাৎ করে একজন কর্মচারীকে নিম্নমানের অন্য পদে নামিয়ে দেয়া শুধু পদমর্যাদার অবমূল্যায়ন নয়, এটি তার দীর্ঘদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও আত্মমর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।”

সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সোহেল ভূঁইয়া ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. কাউসার হোসেন বলেন, “আমাদের নিয়োগের সময় জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে এমএলএসএস (দপ্তরী/পিয়ন) পদ উল্লেখ ছিল। আমরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ওই পদে নিয়োগ পেয়েছি। আমাদের নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র, ম্যানেজিং কমিটির রেজুলেশন, শিক্ষক-কর্মচারী পরিচিতি বোর্ডসহ সব সরকারি কাগজপত্রে আজও সেই পদবী বহাল রয়েছে।”

তারা আরও বলেন, “আমরা এখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দপ্তরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। অথচ কোনো আইনগত ভিত্তি ছাড়াই অনেক প্রতিষ্ঠান আমাদের পদ পরিবর্তন করে নিম্নমানের পদে দেখাচ্ছে।”

সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন, “সব কাগজপত্র বৈধ থাকা সত্ত্বেও কতিপয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির কিছু ব্যক্তি যোগসাজশের মাধ্যমে পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের ‘অফিস সহায়ক’ পদে সমন্বয় না করে পরিচ্ছন্নতাকর্মি, নিরাপত্তাকর্মি বা নৈশপ্রহরী পদে নামিয়ে দিচ্ছেন।”

তাদের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো নীতিমালা বা প্রজ্ঞাপনে পূর্বের দপ্তরী ও পিয়নদের নিম্নপদে নামিয়ে দেয়ার নির্দেশনা নেই। অথচ বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে তা করা হচ্ছে।

সংগঠনের নেতারা আরও অভিযোগ করেন, “মূলত অফিস সহায়ক পদে নতুন নিয়োগ দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ তৈরি করতেই একটি মহল পুরোনো কর্মচারীদের সমন্বয় না করে নিম্নপদে সরিয়ে দিচ্ছে। এটি অমানবিক এবং শ্রম আইনের পরিপন্থি।”

চার দফা দাবি

সংগঠনটি তাদের দাবি বাস্তবায়নে চার দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দাবিগুলো হলো—

১. কোনো পদ বিলুপ্ত হলে সমমানের পদে সমন্বয় করতে হবে; নিম্নমানের পদে নামিয়ে দেয়া যাবে না।

২. ১৯৯৫ ও ২০১০-২০১৩ সালের নীতিমালার আওতায় নিয়োগপ্রাপ্ত সব এমএলএসএস (দপ্তরী/পিয়ন) কর্মচারীকে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বহাল রেখে শতভাগ “অফিস সহায়ক” পদে সমন্বয় করতে হবে।

৩. ২০২১ ও ২০২৬ সালের এমপিও নীতিমালায় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা সংযোজন করে জরুরি প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।

৪. পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মরত এমএলএসএস কর্মচারীদের সমন্বয় সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত “অফিস সহায়ক” পদে নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।

আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

সংগঠনের নেতারা বলেন, “আমাদের যৌক্তিক, মানবিক ও আইনসম্মত দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে আমরা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করব। পাশাপাশি সারাদেশের ভুক্তভোগী কর্মচারীদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।”

এমপিওভুক্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান ও মহাসচিব মো. কামরুল খান অবিলম্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন।

তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজারো কর্মচারীর অর্জিত অধিকার ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে দেশের শিক্ষা খাতে নতুন ধরনের অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *