পাহাড়ি গাছ। জন্মায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,০০০-১০,০০০ ফুট উঁচুতে, পাথুরে জমিতে। সেই গাছ নিয়ে ডারউইনের অনুমানই সত্য প্রমাণিত হল এত দিনে। নিউটার্ন ডেস্ক : প্রায় ১৫০ বছর অনুমান করেছিলেন চার্লস ডারউইন। আন্দাজ করেছিলেন, নির্দিষ্ট এক গোত্রের কিছু গাছ পতঙ্গভুক হতে পারে। কিন্তু তা প্রমাণ করে উঠতে পারেনি। এত দিন পর প্রমাণিত হল তার অনুমানই সঠিক। প্রমাণিত হল— স্যাক্সিফ্রেগা গোত্রের এক বিশেষ প্রজাতির গাছ সত্যিই পতঙ্গভুক।আনন্দবাজার ডট কম এই ধরনের মাংসাশী উদ্ভিদের কথা ভাবলে অনেক বাঙালির প্রথমেই মনে আসে সত্যজিৎ রায়ের কল্পকাহিনীর ‘সেপ্টোপাসের’ কথা। নিকারাগুয়া হ্রদের কাছে জঙ্গল থেকে যা খুঁজে পেয়েছিলেন কান্তিবাবু। যার ‘খিদে’ দিন দিন বেড়েই চলেছিল। এ-ও তেমন। ফারাক শুধু স্যাক্সিফ্রেগার ‘খিদে’ সেপ্টোপাসের মতো ইঁদুর-মুরগি হজমের পর্যায়ে নয়, পোকামাকড় খেয়েই ‘সন্তুষ্ট’। ঠিক যেমন সূর্যশিশির, কলসপত্রী, ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ বা অন্য পতঙ্গভুক গাছগুলি। স্যাক্সিফ্র্যাগা গোত্রে প্রায় ৪৭০টি প্রজাতির গাছ রয়েছে। সাধারণত পাহাড়ি এলাকায়, পাথুরে জমিতে এ সব গাছ জন্মায়। সেই ১৮৭৫ সালে ডারউইন অনুমান করেছিলেন, এই গোত্রের কিছু গাছ পতঙ্গভুক হতে পারে। এই গোত্রের দু’টি ভিন্ন প্রজাতির গাছ দেখে তার সন্দেহ জেগেছিল। স্যাক্সিফ্রেগা রটুন্ডিফোলিয়া এবং স্যাক্সিফ্রেগা আমব্রোসা— সেগুলির গায়ে ছিল আঠালো ‘রোম’। তাতে পোকামাকড় আটকে যেতে পারে। কিন্তু কোনও গাছের পতঙ্গভুক হওয়ার অন্যতম শর্ত হল— শুধু পোকামাকড়কে ‘বন্দি’ করলেই চলবে না, তা থেকে পুষ্টি সংগ্রহও করতে হয়। স্যাক্সিফ্রেগারও কি তেমন কোনও বৈশিষ্ট্য ছিল? ওই সময়ে প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রমাণ করতে পারেননি ডারউইন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে— ওই গোত্রের স্যাক্সিফ্রেগা ক্যানডেলাব্রাম গাছ পতঙ্গভুক। চাইনিজ় অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের কুনমিং ইনস্টিটিউট অফ বটানি এবং ফ্লোরিডার আমেরিকান মিউজ়িয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির বিশেষজ্ঞেরা এই গবেষণা চালান। গাছটি জন্মায় শিনহাই-তিব্বত মালভূমির দক্ষিণাঞ্চলে এবং চিনের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশের হেংডুয়ান পর্বতমালার উচ্চভূমিতে। সম্প্রতি ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এই গাছ কী ভাবে পোকামাকড় শিকার করে, তা-ও উঠে এসেছে গবেষণায়। রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, গাছগুলি একটি বিশেষ গন্ধের মাধ্যমে মশা-মাছির মতো পতঙ্গকে আকৃষ্ট করে। আর হজম করে কী ভাবে? তার জন্য রয়েছে এক ধরনের উৎসেচক (এনজ়াইম)— ফসফাটেজ়। ফাঁদে পড়া শিকারকে এই উৎসেচকের সাহায্যেই হজম করে স্যাক্সিফ্রেগা। স্যাক্সিফ্রেগা সবুজ উদ্ভিদ। সালোকসংশ্লেষ করতে পারে। অর্থাৎ, নিজেদের খাদ্য নিজেরাই তৈরি করে নিতে পারে। তা হলে কেন পতঙ্গ হজম করতে হয় এদের? এরও ব্যাখ্যা রয়েছে। সালোকসংশ্লেষের জন্য চাই নাইট্রেট, যা সাধারণ মাটি থেকে সংগ্রহ করে গাছগুলি। তবে স্যাক্সিফ্রেগা জন্মায় পাহাড়ের পাথুরে জমিতে। সেখানে মাটি থেকে পর্যাপ্ত নাইট্রেট সংগ্রহ করতে পারে না তারা। সেই কারণেই পোকামাকড় শিকার করে তাদের শরীর থেকে নাইট্রোজন সংগ্রহ করে। বস্তুত, কলসপত্রী, সূর্যশিশির বা ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের মতো গাছগুলিও একই কারণে পোকামাকড়ের থেকে নাইট্রোজন সংগ্রহ করে। মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম থাকার ফলেই গাছগুলির মধ্যে এই অভিযোজন দেখা যায়। স্যাক্সিফ্রেগার ক্ষেত্রেও তা-ই। ফ্লোরিডার মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষক ডগলাস সল্টিসের ব্যাখ্যা, স্যাক্সিফ্রেগার এই প্রজাতি যেখানে জন্মায় তা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,২০০-১০,৮০০ ফুট উঁচুতে। সেখানে আবহাওয়া শুষ্ক। পাথুরে জমি। মাটিতে পুষ্টি কম। পতঙ্গভুক উদ্ভিদের জন্য যেমন পরিবেশ দরকার, ঠিক তেমনই। পরে এর ‘আইসোটোপ লেবেলিং’ করেও দেখেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনও কোষের মধ্যে খাদ্য বা শক্তি কী ভাবে রূপান্তরিত হয় তা বোঝা যায়। তাতে দেখা যায়, শিকার হওয়া পতঙ্গ থেকে নাইট্রোজন-১৫ আইসোটোপ মিশে যায় ওই স্যাক্সিফ্রেগার মধ্যে। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে উদ্ভিদবিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছে বলেই মত কুনমিং ইনস্টিটিউট অফ বটানির অধ্যাপক তথা এই গবেষকদলের প্রধান হ্যাং সানের। তার কথায়, “এই খোঁজ এমন অনেক পতঙ্গভুক গাছকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে যা এত দিন আমাদের অজানাই রয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে পতঙ্গভুক উদ্ভিদের নতুন করে বংশধারাও আবিষ্কার হতে পারে।” স্যাক্সিফ্রেগা গোত্রের বহু প্রজাতির মধ্যেই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে— গ্রন্থিযুক্ত ‘রোম’। সেই গ্রন্থি থেকে এক ধরনের আঠালো পদার্থও নিসৃত হয়। সেগুলিতে প্রায়শই পোকামাকড় আটকে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু পোকামাকড় আটকে যাওয়া মানেই তা পতঙ্গভুক নয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার জন্যও এই ধরনের ব্যবস্থা থাকে। ফলে এই গোত্রের সব প্রজাতিই পতঙ্গভুক না-ও হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। Post Views: 24 Post navigation দশ বছর উদযাপন করলো মাইজিপি,