ঢাকা :
দেশের জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিদ্যমান আইন, বিধি, নীতিমালা ও চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনা করে পরিবেশসম্মত, নিরাপদ, টেকসই এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পখাত গড়ে তোলার লক্ষ্যে পৃথক পৃথক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল ঢাকায় পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মোঃ রাজিব আহসান। সভার উদ্দেশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন।
সভায় জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ উভয় খাতের টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিকের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান পরিপালন, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং অর্থায়ন সুবিধা সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পবিষয়ক উপস্থাপনায় বাংলাদেশের এ খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহ এবং সার্কুলার ইকোনমির সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা মান অনুসরণ, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্যপানি শোধন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, মাটি পুনরুদ্ধার এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
উপস্থাপনায় জাতীয় পর্যায়ে Treatment, Storage and Disposal Facility (TSDF) প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য শোধন, ইনসিনারেটর স্থাপন, উপকরণ পুনঃব্যবহার এবং উপকূলীয় ও ম্যানগ্রোভ প্রতিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরি, প্রশিক্ষণ, Testing Lab স্থাপন, আর্থিক সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপরও জোর দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, জাহাজ নির্মাণ শিল্পবিষয়ক উপস্থাপনায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, তুলনামূলক শ্রমব্যয়, কারিগরি সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং রপ্তানির সম্ভাবনাকে এ খাতের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আধুনিক ড্রাইডক, মডুলার শিপ বিল্ডিং, রপ্তানিমুখী শিপইয়ার্ড, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
বিশ্ব নৌপরিবহন খাতে উদীয়মান পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়েও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। উপস্থাপনায় IMO-এর Net-Zero Framework, বিকল্প ও কম-কার্বন জ্বালানি, LNG, Green Steel, Carbon Trading এবং Smart Shipyard-এর মতো বৈশ্বিক প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়।
জাহাজ নির্মাণ শিল্পে পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্যপানি শোধন, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ম্যানগ্রোভ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে অর্থায়ন, গ্রিন ফাইন্যান্স, সরকারি গ্যারান্টি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং রপ্তানি ঋণের মতো সুবিধার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।
সভায় মত প্রকাশ করা হয় যে, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের টেকসই উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর, সংস্থা ও বেসরকারি খাতের মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় প্রয়োজন। বিদ্যমান সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
দুই সভার আলোচনায় দেশের জাহাজ শিল্পকে পরিবেশবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর, নিরাপদ ও বিশ্ববাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধি, নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য অংশীজন অংশগ্রহণ করেন।
-ত.বি.

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *