-রেজাউল করিম সিদ্দিকী

প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে বজ্রপাত খুব পরিচিত, সুন্দর, রহস্যময় এবং একই সাথে আতঙ্কের। অতি উচ তাপমাত্রার স্ফুলিঙ্গ আর ভয়াবহ গর্জন বহুকাল ধরেই মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। একই সঙ্গে মৃত্যুর হারও বেড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাত বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরই বজ্রপাতে শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে বজ্রপাত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে প্রাণহানি কমাতে একের পর এক প্রকল্প নিলেও সুফল মিলছে না তেমন একটা। ৪০ লাখ তালগাছ রোপণ, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন, আগাম সতর্কবার্তা দেয়ার সেন্সর বসানোসহ কয়েকশত কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ভেস্তে গেছে অধিকাংশ প্রকল্পই। ফলে থামছেই না বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল। বর্তমান সরকারও পুরোনো প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার মধ্যেই নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে। চলছে হাওরাঞ্চলে সাইরেন স্থাপন, শক্তিশালী টাওয়ার নির্মাণ এবং কৃষকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা।

চলতি বছরের জুনের প্রথম তিন সপ্তাহে ৮৫ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে। আর বছরের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায় মৃতের সংখ্যা। দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যান। যদিও নব্বইয়ের দশকে এই সংখ্যা গড়ে মাত্র ৩০ জন ছিলো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ব্রজপাত নিরোধের লক্ষ্যে কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ৪০ লাখ তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছিলো। তাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়। তালগাছ রোপণের যুক্তি ছিল, তালগাছের উচ্চতা ও গঠন বজ্রপাত মাটিতে নামিয়ে আনতে সহায়ক হবে। কিন্তু দুই বছর না যেতেই দেখা যায় অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে যায়। আর কোথাও গবাদি পশু খেয়ে ফেলেছে, কোথাও পরিচর্যার অভাবে মরে গেছে। আবার কোথাও চারা না লাগিয়েই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হওয়ার সময় এতে প্রচুর স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়। জলীয় বাষ্প যখন ক্রমশ ঊর্ধ্বাকাশে উঠতে থাকে তখন তারা মেঘের নিচের দিকের বেশি ঘনীভূত বৃষ্টি বা তুষার কণার সাথে সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়। ঝড়ের সময় মেঘ বা জলীয়বাষ্প বা ঘন বায়ু প্রচণ্ড বেগে পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে প্লাজমা অবস্থার তৈরি হয়। যার ফলে উপরের দিকে উঠতে থাকা অনেক বাষ্প পরমাণু বেশ কিছু ইলেকট্রন হারায়। যে পরমাণু ইলেকট্রন হারায় তা পজিটিভ চার্জে এবং যে পরমাণু ইলেকট্রন গ্রহণ করে তা নেগেটিভ চার্জে চার্জিত হয়। পজেটিভ চার্জ চলে যায় মেঘের উপর পৃষ্ঠে যার প্রবাহকে পজেটিভ বজ্র বলে এবং নেগেটিভ চার্জ জমা হয় মেঘের নিচে বা মাঝামাঝি অবস্থানে যার প্রবাহকে নেগেটিভ বজ্র বলে।

যথেষ্ট পরিমাণ পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জ জমা হওয়ার পর পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণের দরুণ ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক ডিসচার্জ প্রক্রিয়া শুরু হয়। বজ্রপাতে কারেন্ট থাকে ২০-৫০ হাজার অ্যাম্পিয়ার এবং ভোল্টেজ থাকে ৩০ হাজার থেকে কয়েক লাখ ভোল্ট। সবচেয়ে বিপজ্জনক হল পজিটিভ বজ্রপাত অর্থাৎ জমাকৃত বিপুল পরিমাণ পজিটিভ চার্জ (মেঘের উপরে) সরাসরি ভূমিতে এসে ভূমির গভীরে চলে যায় বা গ্রাউন্ড থেকে ইলেক্ট্রন এর প্রবাহ উল্টো পথে উঠে অর্থ্যাৎ উপরে গিয়ে একে নিউট্রালাইজ করে। মোট ক্লাউড টু গ্রাউন্ড বজ্রপাতের ৫শতাংশ হল এ ধরনের পজিটিভ বজ্রপাত যাতে ভোল্টেজ থাকে ১০০ কোটি ভোল্ট এবং কারেন্ট থাকে প্রায় ৩ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার এটি কখনো বৃষ্টির মধ্যে হয় না বরং বৃষ্টি ছাড়া ঝড়ো আবহাওয়া তে হয়। অর্থাৎ একে বলা যায় বিনা মেঘে বজ্রপাত (Bolt from the blue)। সাধারণত পাওয়ার সাবস্টেশন নষ্ট হওয়া বা বন জঙ্গলে আগুন লাগার অন্যতম প্রধান কারণ এই পজিটিভ বজ্রপাত। উল্লেখ্য যে, বাসা-বাড়িতে আমরা যে সিলিং ফ্যান ব্যবহার করি তা ২২০ ভোল্ট এবং ০.৫ অ্যাম্পিয়ার-এ চলে। মানব দেহ দিয়ে মাত্র ০.২ অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট প্রবাহ এত বিপজ্জনক যে, এতে যে কারো অবচেতন হয়ে প্যারালাইজড্ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু অবধারিত যদি মিনিট খানেক স্থায়িত্ব হয় এ মাত্রার কারেন্ট। সেজন্য কারও উপর বজ্রপাত হলে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের কিছু নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। সেগুলো হলো বজ্রপাতের ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা থেকে বরত থাকতে হবে। প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করতে হবে। খোলাস্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালীন বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যেতে হবে। কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে অবস্থান করতে হবে। খোলা জায়গায় কোনো বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেয়া যাবে না। গাছ থেকে চার মিটার দূরে থাকতে হবে। ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকতে হবে। বৈদ্যুতিক তারের নিচ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগগুলো লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। বজ্রপাতে আহতদের বৈদ্যুতিক শকের মতো করেই চিকিৎসা দিতে হবে। এপ্রিল-জুন এবং সেপ্টেম্বর –অক্টোবর মাসে বজ্রপাত বেশি হয়। এই সময়ে আকাশে মেঘ দেখা গেলে ঘরে অবস্থান করা ভালো। বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকলে যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি বা বারান্দায় থাকা যাবে না এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকতে হবে। ঘন-কালো মেঘ দেখা গেলে অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হতে হবে। উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, ধাতব খুঁটি ও মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করতে হবে। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। কালো মেঘ দেখা দিলে নদী, পুকুর, ডোবা, জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা এবং নিজেরাও বিরত থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়ুন। বজ্রপাতের সময় গাড়ির মধ্যে অবস্থান করলে, গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ ঘটাবেন না। সম্ভব হলে গাড়িটিকে নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করতে হবে।

বজ্রপাত এমন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা যা প্রতিহত করার মতো প্রযুক্তি এখনো মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে সমাজের সকল স্তরে সচেতনতা প্রয়োজন। সেই সাথে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে বজ্রপাতে প্রাণহানি কমিয়ে আনতে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, রেলপথ মন্ত্রণালয়

-পি. ফি.

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *