নিউটার্ন ধর্ম ডেস্ক : মানুষের প্রকাশ্য শত্রুকে চেনা সহজ, কিন্তু যে শত্রু অদৃশ্য থেকে মানুষের চিন্তা, বিবেক ও প্রবৃত্তিকে প্রভাবিত করে, তার প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকা অনেক বেশি কঠিন। শয়তান মানুষের চিরশত্রু।সে কখনো পাপকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে, কখনো নেক আমলে অলসতা সৃষ্টি করে, আবার কখনো মানুষকে গুনাহে লিপ্ত করার পর হতাশা ও নিরাশার অতল গহ্বরে ঠেলে দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ শয়তানের শত্রুতার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো। সে তো তার দলবলকে আহ্বান করে, যাতে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হয়।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৬)

শয়তানের প্রতারণা থেকে আত্মরক্ষার ৬ উপায়

১. আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা

শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষার প্রথম ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। মানুষের মনে যখন পাপের চিন্তা, বিদ্বেষ, অহংকার কিংবা অন্যায়ের প্রলোভন সৃষ্টি হয়, তখন তার উচিত আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা। কারণ, আল্লাহর আশ্রয়ই মুমিনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় চাও।

নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৬)
শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চেয়ে বেশি পরিমাণে পাঠ করতে হবে,

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

উচ্চারণ : আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম।

অর্থ : বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই।

২. নিয়মিত নামাজ আদায় ও কোরআন তিলাওয়াত করা

নামাজ মুমিনের জীবনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। নিয়মিত নামাজ মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয় এবং অন্যায় থেকে ফিরে আসতে সাহায্য করে।

অন্যদিকে, কোরআন তিলাওয়াত মানুষের অন্তরে ঈমানি চেতনা জাগ্রত করে এবং সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
৩. আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফারে অভ্যস্ত হওয়া

আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং তাকে নিজের দায়িত্ব ও পরিণতি সম্পর্কে সচেতন রাখে। বিপরীতে, আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন হয়ে পড়লে মানুষ অনেক সময় প্রবৃত্তির অনুসরণ ও পাপের দিকে ঝুঁকে যায়। এ কারণে মুমিনের উচিত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আল্লাহকে স্মরণ করা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রা‘দ, আয়াত: ২৮)

আল্লাহর জিকিরের মধ্যে রয়েছে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করা এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার করা। সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

৪. রাগ ও উত্তেজনার মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা

রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন রাগ অনেক সময় মানুষকে এমন কথা বলতে কিংবা এমন কাজ করতে প্ররোচিত করে, যার জন্য পরে তাকে অনুতপ্ত হতে হয়। পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের অবনতি, অন্যকে অপমান করা এবং অন্যায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনেও অনেক সময় রাগের ভূমিকা থাকে।

শয়তান এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মধ্যে বিরোধ ও শত্রুতা সৃষ্টি করতে চায়। সুলাইমান ইবনে সারদ (রা.) থেকে বর্ণিত, দুজন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে বিবাদে জড়িয়ে পড়লে তাঁদের একজন প্রচণ্ড রাগান্বিত হন। তখন নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি এমন একটি বাক্য জানি, যা সে বললে তার রাগ দূর হয়ে যাবে। যদি সে বলে, ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম, তাহলে তার রাগ দূর হয়ে যাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৮২)

৫. গুনাহের পর নিরাশ না হয়ে দ্রুত তওবা করা

শয়তানের প্রতারণার একটি ভয়ংকর দিক হলো, সে মানুষকে প্রথমে পাপের দিকে প্রলুব্ধ করে, এরপর সেই পাপের কারণে তাকে হতাশ করে তোলে। সে মানুষের মনে এমন ধারণা সৃষ্টি করতে পারে যে, তার গুনাহ এত বেশি হয়ে গেছে যে আল্লাহ আর তাকে ক্ষমা করবেন না। অথচ এটি শয়তানের আরেকটি প্রতারণা। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের তওবার মাধ্যমে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

৬. সৎ সঙ্গ গ্রহণ করা এবং পাপের পরিবেশ থেকে দূরে থাকা

মানুষের চিন্তা, অভ্যাস ও আচরণ গঠনে সঙ্গের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো মানুষের সাহচর্য মানুষকে নেক আমলে উৎসাহিত করে, ভুল থেকে সতর্ক করে এবং বিপদের সময় সঠিক পরামর্শ দেয়। অন্যদিকে, অসৎ সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে গুনাহের প্রতি অভ্যস্ত করে তুলতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

সুতরাং এমন মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা উচিত, যারা নামাজ, সত্যবাদিতা, উত্তম চরিত্র, হালাল উপার্জন ও আল্লাহর আনুগত্যের দিকে উৎসাহিত করেন। পাশাপাশি এমন পরিবেশ, বিনোদন, অভ্যাস ও যোগাযোগ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে, যেগুলো বারবার পাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন, নফসের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
নিউটার্ন/এআর

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *