বিশ্বকাপ ঘিরে ‘বর্ণবিদ্বেষমূলক’ মন্তব্যে বিতর্ক ইউরোপে

স্পোর্টস ডেস্ক :
চলতি বিশ্বকাপ মৌসুমে সেমিফাইনাল ম্যাচে স্পেনের কাছে দুই গোলে ফ্রান্সের হার হয়েছে ঠিকই কিন্তু ম্যাচের আগে সাবেক স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বিশ্বজুড়ে। তার মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন খোদ ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁর নুনেস।

স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয় যা বলেছেন, তা বিশ্বজুড়ে বর্ণবিদ্বেষ, অভিবাসন ও নাগরিকত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

“ফ্রান্সের দলে তো ফরাসিই নেই” তার এই মন্তব্যের পর এটা স্পষ্ট যে ফ্রান্সের ফুটবল দলে ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করা প্লেয়ারদের যেহেতু অনেকেই অভিবাসী বা অভিবাসী পরিবারের সন্তান, তাদের উদ্দেশ্য করেই তাদের ‘ফরাসিত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

ম্যাচের আগে স্পেনের অনলাইন সংবাদপত্র এল ডিবেট-এ তিনি লেখেন, “এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে ফ্রান্স দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এবং গত বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট।”

“এই বিশ্বকাপে তারা তাদের খেলা প্রতিটি ম্যাচেই জয়ী হয়েছে এবং বর্তমানে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে রয়েছে। তাদের দলে রয়েছেন শীর্ষ মানের খেলোয়াড়রা। তবে একটা বিষয় হলো, তাদের দলে কোনো ফরাসি খেলোয়াড় নেই। তারা দুর্দান্ত খেলছে। তারা নিঃসন্দেহে এক কঠিন প্রতিপক্ষ হতে চলেছে।”

বিবিসি

এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ফরাসি চ্যানেল বিএফএমটিভি-কে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁর নুনেস বলেন, “এটি গ্রহণযোগ্য নয়।”

“ফ্রান্সের প্রকৃত স্বরূপ এমনটা নয়। ফ্রান্স বৈচিত্র্যময় এক দেশ, যেখানে প্রত্যেকেই নিজেদের অবদান রাখতে পারে ও সমৃদ্ধ হতে পারে।”

সাবেক স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন স্পেনের অতি বামপন্থী সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির শীর্ষ নেতা পেদ্রো স্যাঞ্চেজ। তার বক্তব্য, “সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য জেনোফোবিক” অর্থাৎ ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ।

এছাড়াও এই মন্তব্যের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন ফ্রান্সের বামপন্থী দলগুলির নেতারা। ফ্রেঞ্চ সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা অলিভিয়ার ফউরে সামাজিকমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, “ফ্রান্স একটি নির্দিষ্ট ধরনের মানুষের রাষ্ট্র নয়। ফ্রান্স রাষ্ট্রের কোনও বর্ণ ও ধর্ম নেই।”

অবশ্য স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরে দেশের হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোস ম্যানুয়েল আলবারেস।

রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, “মারিয়ানো রাহয় যা বলেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয় এবং সিংহভাগ স্পেনিয়ার্ডদের রাষ্ট্রীয় অনুভূতির বিরোধী।”

স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ইন্টারনেট ও মানুষের মনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিলেও দেখা যাবে ফুটবলকে ঘিরে এই ধরনের ঘটনা প্রথম নয়।

চলতি মৌসুমেই প্যারাগুয়ের সেনেটর সেলেস্তে আমারিলা ফরাসি দলের খেলোয়াড় এমবাপ্পে-কে “ঔপনিবেশিকতার শিকার এক ক্যামেরুনীয়” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “তিনি এক ক্যামেরুনীয় যিনি নিজেকে ফরাসি বলে জাহির করতে চান।”

এই মন্তব্যেও বিতর্কের জন্ম হয়েছে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে বলেছিলেন, ফরাসি জাতি কোনও নির্দিষ্ট এক বর্ণের জাতি নয়। তিনি (কিলিয়ান এমবাপ্পে) আন্তর্জাতিক স্তরে ফ্রান্সেরই প্রতিনিধিত্ব করেন।

এই মন্তব্যের উত্তরে সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে এমবাপ্পে লেখেন, “মাদাম সেলেস্তে আমারিলা, আপনি একজন ঘৃণ্য নারী এবং আপনার পদের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।”

এমবাপ্পে আরও লেখেন, “আপনি প্যারাগুয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না, সেই দেশটির, যারা এই পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আবেগ ও সম্মানের সাথে লড়েছে। আপনার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও নির্লজ্জ বর্ণবিদ্বেষের জেরে বিশ্ববাসী আজ (প্যারাগুয়ের) সেই ঐতিহাসিক যাত্রা ও প্রচেষ্টার কথা ভুলে গেছে যা আপনার দেশের খেলোয়াড়রা এই বিশ্বকাপে দেখিয়েছিল।”

“এর বদলে সামনে চলে এসেছে একজন অযোগ্য নারীর ভাবমূর্তি, যিনি নিজের দেশের জন্য অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।”

এই বিতর্ককে কীভাবে দেখছেন ফুটবল ফ্যানরা?
কলকাতার প্রবাসী বাঙালি সৌরকিরণ পল এই বিশ্বকাপে জার্মানিকে সমর্থন জানাতে হাজির হয়েছিলেন টেক্সাসের হিউস্টনে। বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলার সময়ে তিনি বলেন, “ফ্যানদের কাছে খেলোয়াড়দের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের থেকে জার্সি বড়।”

“জার্মান দলেও এমন বহু মানুষ রয়েছেন যারা অতীতে এই দেশে এসেছিলেন, কেউ এসেছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে, কেউ বা ঔপনিবেশিক যুগে ক্রীতদাস হয়ে। কিন্তু তারা যখন জার্মানির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন তখন তারা জার্মানির জন্যই ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়ে যাচ্ছিলেন।”

কলকাতার অপর এক ফুটবল ফ্যান সম্বরণ কুমার পাল জানান, “আমরা যখন খেলা দেখি তখন একটা টিমের খেলা দেখি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই এমন বহু খেলোয়াড় আছেন যাদের জন্ম অভিবাসী পরিবারে, কিন্তু তারা টিমের জন্যই খেলেন।”

এছাড়াও তিনি জানালেন, স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়-এর মন্তব্য ফুটবলপ্রেমী হয়ে তিনি সমর্থন করতে পারেন না।

বামপন্থী ভাবধারার প্রবাসী সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ি ফেসবুক পোস্টে তার মত প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য ভারতের ‘ঘুসপেটিয়া’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে কিছু মানুষকে দেগে দেয়ার সঙ্গে তুলনীয়।

স্পেনের বামপন্থী নেতা পেদ্রো স্যাঞ্চেজের বক্তব্যকে সমর্থন করে তিনি বলেন, “দেশ তাদেরই, যারা দেশকে ভালোবসেন। দেশ ঘৃণাজীবীদের নয়।”

বর্ণ-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বনাম রাষ্ট্রে অবদান
সাম্প্রতিককালে ইউরোপে বর্ণ বনাম রাষ্ট্রীয় অবদান-এই দুইয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণ নিয়ে স্পষ্টতই একটা রাজনৈতিক বিভাজন লক্ষ্য করা যায়।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, ইতালি-সহ কয়েকটি দেশে শরণার্থী বিরোধী কিছু আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন বহু ডানপন্থি নেতা ও স্বঘোষিত দক্ষিণপন্থী আন্দোলনকারীরা।

আবার অন্যদিকে, এক দল মনে করেন, কোনও মানুষ রাষ্ট্রের জন্য যদি অবদান রাখে, তিনি যে বর্ণ-সংস্কৃতির মানুষই হন না কেন, তিনি সেই দেশেরই নাগরিক ও সেই দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করেন।

দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান স্টাডিজ-এর অধ্যাপক ড. গুলশন সচদেভা মনে করেন, “ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী বিরোধী মনোভাব ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।”

ফলে ইউরোপে উদারপন্থি ও দক্ষিণপন্থি শক্তিগুলি এখন সরাসরি সংঘর্ষে জড়িত বলে মনে করেন ড. সচদেভা।

ঔপনিবেশিক যুগের পরে ইউরোপীয় দেশগুলো ‘মাল্টিকালচারালিজম’ বা বিভিন্ন বর্ণের মানুষের সহাবস্থানের দিকে ঝুঁকলেও সেই মডেল ইউরোপে খুব বেশি সফল হয়নি বলেও মনে করেন তিনি।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিবিসি বাংলাকে ড. সচদেভা বলেন, “ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বলেছেন সেটি পলিটিক্যালি কারেক্ট হলেও, সেখানে পরস্পরবিরোধী আভাস রয়েছে।”

অর্থাৎ, যখন ফুটবলের জাতীয় গৌরবের প্রসঙ্গ আসে, তখন এই অভিবাসী বংশোদ্ভূত মানুষদের তাদের দেশে ‘অবদান’-এর ভিত্তিতেই বিচার করা হয় বলে মনে করেন তিনি।
Article Information
Author,প্রত্যুষ রায়
Role,বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *