স্পোর্টস ডেস্ক :খেলাধুলার ইতিহাসে অমরত্বের হাতছানি থেকে আর মাত্র একটি জয় দূরে আর্জেন্টিনা। লিওনেল স্কালোনির দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামতে যাচ্ছে কয়েক ঘণ্টা পর। এর আগে শুধু ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) এবং ব্রাজিল (১৯৫৮ ও ১৯৬২) এ কীর্তি গড়তে পেরেছে। ইউরোপিয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা জিততে হলে আর্জেন্টিনাকে আবারও লিওনেল মেসির সেরা রূপটি দেখাতে হবে আজ। তিনি কি সর্বকালের সেরা? এই প্রশ্নের উত্তর যা-ই বলা হোক না কেন, এবং এ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিতর্কও চলতে পারে, কিন্তু এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই আর্জেন্টাইন জাদুকর ফুটবল পিচে পা রাখা সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। আজকের ফাইনালে জিতলে মেসিই হবেন প্রথম অধিনায়ক যিনি দুবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন। নিজের প্রথম চারটি টুর্নামেন্টে কিছুটা ম্লান থাকার পর, ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন অসাধারণ, যেখানে আর্জেন্টিনা ট্রফি জিতেছিল। আর এবার বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের চেয়ে মাত্র এক গোল পিছিয়ে আছেন তিনি। ভাবতে অবাক লাগে যে, মেসি প্রথমে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন এবং পরে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। আজকের বিশ্বকাপ ফাইনালটি হবে বিশ্বমঞ্চে তার ৩৪তম ম্যাচ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নীল-সাদা জার্সিতে কি এটাই মেসির শেষ ম্যাচ হতে যাচ্ছে? মেসি যদি ২০৩০ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে যান, তবে ৪৩ বছর বয়সে তিনি বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় হবেন। অবশ্য ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যদি পর্তুগালের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে ভিন্ন কথা। এতে তার রেকর্ডের দীর্ঘ তালিকায় শুধু আরেকটি নতুন রেকর্ডই যুক্ত হবে না, পাশাপাশি পরবর্তী বিশ্বকাপের শুরুতে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিতব্য শতবর্ষী ম্যাচগুলোর একটিতেও খেলার সুযোগ পাবেন তিনি। স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিয়েম বালাগে মনে করেন না, বিশ্বকাপে মেসিকে শেষবারের মতো দেখছেন সমর্থকরা। তিনি বলেন, “যদি শুনতেও পান যে এটাই শেষ, আমি তা নিয়ে সন্দিহান। দেখা যাক। আমি তাকে জাতীয় দলের সঙ্গেই দেখি, কারণ তিনি এটি উপভোগ করেন।” “আমি এমনটা দেখছি না যে, তিনি এমএলএস-এ ইন্টার মায়ামিতে খেলবে, পারফর্ম করবে এবং তারপর বলবে এটাই শেষ এবং সে ইন্টার মায়ামির হয়েই ক্যারিয়ারের বাকি সময়টা পার করে দেবে।” ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্স কোনো জাদুর চেয়ে কম ছিল না। তিনি সাত ম্যাচে আটটি গোল করেছেন, যা টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপ্পের চেয়ে সংখ্যায় দুটি গোল কম এবং দুর্দান্ত সব পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে টেনে তুলেছেন। আর্জেন্টিনা দলের কোচ স্কালোনি মেসিকে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “সে ইতিহাস, এক কিংবদন্তি। আমি গর্বিত, সে পৃথিবীর দেখা সেরা ফুটবলার এবং ৩৯ বছর বয়সে ফাইনালে পৌঁছানো অবিশ্বাস্য কিছু – আর এ কারণেই আমি বলেছি আমাদের তাকে উপভোগ করতে হবে।” “দিয়েগো ম্যারাডোনাকে আমরা এখনও মিস করি, তবে মেসি এখনও আমাদের সাথে আছে তাই আমাদের তাকে উপভোগ করতে হবে।” “এটিই লিওর শেষ ম্যাচ কী-না সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই, এটা আপনাদের তাকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে। আমরা এ নিয়ে আলোচনা করিনি।” উত্তর আমেরিকায় তার পারফরম্যান্স বিশ্বকাপে তার ক্যারিয়ারের শেষভাগের অসাধারণ পুনর্জাগরণের ধারাবাহিকতা। তার ২১টি বিশ্বকাপ গোলের ১৫টিই এসেছে ৩৫তম জন্মদিনের পর। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পরও মেসি দেখিয়েছেন, ২০২৬ পর্যন্ত খেলে যাওয়ার প্রেরণা তার ছিল। এখন প্রশ্ন হলো, সেটি কি ২০৩০ পর্যন্ত থাকবে? বালাগে বলেন, “আমার মনে হয়, তিনি এখনও শেষ কথা বলেননি। ৩৯ বছর বয়সে তিনি ম্যাচ শেষ করেন, ১২০ মিনিটের ম্যাচও।” “কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ৯০ মিনিটে তিনি সাড়ে ছয় কিলোমিটার দৌড়েছেন, যার ৬২ শতাংশই ছিল হাঁটা।” “আরও কিছুটা হাঁটা যোগ করা যেতে পারে। আবেগ এখনও আছে। এসবই বোঝায় যে তিনি জাতীয় দল (এখুনি) ছাড়ছেন না।” আরেকটি বিষয়ও আছে, সেটি হলো নিজেদের দর্শকদের সামনে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ। ২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক হবে ছয়টি দেশ। অধিকাংশ ম্যাচ হবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোতে। তবে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়েতেও অন্তত একটি করে ম্যাচ হবে। আর্জেন্টাইন দর্শকদের সামনে বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ হয়তো মেসির পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা কঠিন হবে। এক সময় মেসি নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ২০২২ সালের ফাইনালই হবে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। ২০২২ সালের ফাইনালের আগে তিনি বলেছিলেন, “বিশ্বকাপে আমার যাত্রা একটি ফাইনালে শেষ হচ্ছে, এতে আমি খুবই আনন্দিত। শেষ ম্যাচটি ফাইনালে খেলতে পারা সত্যিই তৃপ্তিদায়ক।” “এ বছর থেকে পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত অনেক সময়। আমি মনে করি না, আমি তা করতে পারব। এভাবে শেষ করতে পারা দারুণ।” কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তাই ২০২৬ সালের ফাইনালের পর যা-ই বলা হোক না কেন, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের দিকেও নজর রাখতে হবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে মেসি গোল করতে পারেননি। তবে দলের নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের জয়ে তার দুটি অ্যাসিস্ট তাকে বিশ্বকাপে মোট ১২টি অ্যাসিস্টের মালিক করেছে, যার ১০টিই নকআউট পর্বে। রেকর্ড অনুযায়ী, অন্য কোনো খেলোয়াড়ের মোট অ্যাসিস্টের সংখ্যা আটটির বেশি নয়। ক্লাব ফুটবলে তার ক্যারিয়ার ব্যক্তিগত রেকর্ডে পরিপূর্ণ, সর্বাধিক ব্যালন ডি’অর, বার্সেলোনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, সর্বাধিক লা লিগা গোল, এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বাধিক গোল, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত সর্বাধিক অ্যাসিস্ট। আর বিশ্বকাপে তার ব্যক্তিগত রেকর্ডগুলো হলো: ৩৩ ম্যাচ নিয়ে সর্বাধিক উপস্থিতির রেকর্ডধারী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে পুরুষদের ছয়টি বিশ্বকাপে খেলা মাত্র দুই খেলোয়াড়ের একজন দুইবার গোল্ডেন বল জয়ী একমাত্র খেলোয়াড় – ২০১৪ ও ২০২২ সালে ২০২২ সালে শিরোপা জয়ের পথে প্রতিটি রাউন্ডে গোল করেছেন, যা আর কোনো খেলোয়াড় পারেননি পুরুষদের বিশ্বকাপে সর্বাধিক ১২টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড তার টানা ১১টি বিশ্বকাপ উপস্থিতিতে গোল বা অ্যাসিস্ট করেছেন, যা ১৯৬৬ সালের পর থেকে রেকর্ডে থাকা দীর্ঘতম ধারাবাহিকতা টানা নয়টি পুরুষদের বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড তার এছাড়া তিনি কাফুর পর মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবেন।Article InformationAuthor,শার্লট কোটসRole,বিবিসি স্পোর্ট জার্নালিস্ট এবং Author,এমা স্মিথRole,বিবিসি স্পোর্ট জার্নালিস্ট Post Views: 36 Post navigation আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন, কেমন লড়াই হবে ফাইনালে? ইয়ামালের বিশ্বজয়ের উৎসব