আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
জর্ডানে শুক্রবার ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুইজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।বিবিসি

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে যে, চারজন মার্কিন সেনাসদস্যকে চিকিৎসার জন্য জর্ডানের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল এবং তারা চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এছাড়া যাদের আঘাত তুলনামূলকভাবে কম ছিল, তারা আবার কাজে ফিরে গেছেন।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা তাদের নিহত সেনাসদস্যদের পরিচয় প্রকাশ করেননি। এছাড়া ঘটনাটি কীভাবে বা ঠিক কোথায় ঘটেছে সে সম্পর্কেও কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি।

শনিবার রাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরেক দফা বিমান হামলা চালায় বলে সেন্টকম জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, টানা অষ্টম রাতের এই হামলার উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করার ইরানের সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ‘গত রাতে জর্ডানে মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর হামলা চালানো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি বাহিনীকে দ্রুত শাস্তি দেয়া’। তবে এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এর আগে এক সপ্তাহ ধরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে ওয়াশিংটন আবারও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে এবং তেহরান ঘোষণা দেয় যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এর ফলে মাত্র এক মাস আগে শুরু হওয়া প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে।

শনিবার গভীর রাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘বারবার চুক্তি লঙ্ঘন’ একটি মৌলিক সত্যকে স্পষ্ট করেছে যে, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য বা বিশ্বাসযোগ্যতা নেই’।

যুদ্ধের শুরুতে তার বাবা নিহত হওয়ার পর থেকে জনসমক্ষে দেখা না যাওয়া খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘাতকে ‘আরও উস্কে দেয়ার’ চেষ্টার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘ভুলে যাওয়ার মতো নয় এমন শিক্ষা’ অপেক্ষা করছে।

এর আগে জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা তাদের আকাশসীমায় ইরানের ছোড়া দশটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

এই সংঘাতে মার্কিন নিহতের সংখ্যা এখন ১৬-তে পৌঁছেছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে নিখোঁজ হওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর এক পাইলটকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লো।

শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়: “জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং পার্টনার ফোর্সের সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত দুইজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া আরও একজন সেনাসদস্য বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন।

নিহতদের পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে, তাদের নিকটাত্মীয়দের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার ২৪ ঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত নিহত সেনাসদস্যদের পরিচয়সহ অতিরিক্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হবে না”।

এই মৃত্যুর খবরের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স- এ লেখেন: “বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে”।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি দাবি করেছে যে, শনিবার ভোরে জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটিতে অন্তত দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা হয়েছে।

বিবিসি এ বিষয়ে সেন্টকমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা এ দাবির ব্যাপারে অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য বা বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এদিকে শনিবার পৃথকভাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ব্যক্তিদের, ‘অতিরিক্ত সতর্কতা’ অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে একটি ভ্রমণ-সংক্রান্ত সতর্কতা জারি করেছে।

সেই ভ্রমণ সতর্কতায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারীদের সর্বশেষ পরিস্থিতির খবর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে: “মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও জটিল রয়েছে এবং যেকোনো সময় অপ্রত্যাশিতভাবে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে”।

যুদ্ধ অবসানে ওয়াশিংটন ও তেহরান জুন মাসে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছিল। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই চুক্তি ভেঙে পড়ে। ৮ জুলাই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, চুক্তিটি ‘শেষ হয়ে গেছে’।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের হামলার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র- উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই অভিযোগ রয়েছে।

ইরানের অভিযোগ ছিল, চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সেতু, একটি রেলস্টেশন এবং একটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে বিবিসি ভেরিফাই নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের হরমোজগান প্রদেশে একটি সেতুর ওপর হামলা হয়েছিল।

বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়
ছবির ক্যাপশান,বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়
মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি আলোচনায় ফিরে না আসে, তাহলে পরের সপ্তাহে দেশটির সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে।

এদিকে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) তেহরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

শনিবার ইরান জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

এরপর কুয়েত জানায় যে, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্টিলেশন) কেন্দ্র হামলার শিকার হয়েছে।

সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের প্রতিনিধিত্বকারী এই পরিষদের মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই বলেন, এ ধরনের হামলা ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হয়।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বেসামরিক মানুষ বা বেসামরিক এলাকায় হামলা চালানো অবৈধ। তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো বেসামরিক স্থাপনা—যেমন একটি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র—যদি শত্রুপক্ষের যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বিশেষ সুরক্ষার অধিকার হারাতে পারে।

এ সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধও পুনর্বহাল করেন। সেন্টকম জানায়, শনিবার পর্যন্ত পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে এবং একটি জাহাজ অচল হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে।

বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।

সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজ—এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জাহাজও—চলাচলের জন্য ২০ শতাংশ ফি পরিশোধ করবে। তবে মঙ্গলবার তিনি সেই প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাহার করে জানান, এর পরিবর্তে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করা হবে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *