হত্যা নয়, চাই মানবিক ও আইনসম্মত সমাধান: রাজধানীতে প্রাণিপ্রেমীদের সফল ও স্বতঃস্ফূর্ত মানববন্ধনপথকুকুর নিধনের দাবির বিরুদ্ধে, প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং দেশব্যাপী CNVR (Catch-Neuter-Vaccinate-Release) কার্যক্রম জোরদারের দাবিতে আজ শনিবার (২০ জুন) বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে এক সফল ও স্বতঃস্ফূর্ত মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রাণিকল্যাণকর্মি, স্বেচ্ছাসেবী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্রকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ মানববন্ধনে প্রায় দেড়শ থেকে দুই শতাধিক মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সম্প্রতি “নিরাপদ শহর আন্দোলন” নামের একটি সংগঠন পথকুকুর নিধনের দাবিতে বিভিন্ন স্মারকলিপি, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও প্রচারণা পরিচালনা করছে। তারা পথকুকুর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে টিকাদান ও নির্বীজন কার্যক্রমের পরিবর্তে নিধনকে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা প্রাণিকল্যাণ আইন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।বক্তারা উল্লেখ করেন, প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এর ধারা ৬ এবং ধারা ৭(১) ও ৭(২) অনুযায়ী কোনো প্রাণীকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া, হত্যা করা বা নিষ্ঠুর আচরণের শিকার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি হলো CNVR (Catch-Neuter-Vaccinate-Release), অর্থাৎ কুকুরকে ধরে নির্বীজন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা প্রদান এবং পুনরায় নিজ এলাকায় অবমুক্ত করা। নির্বিচারে কুকুর নিধন বা স্থানান্তর আইনসম্মত নয় এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো কার্যকর সমাধানও নয়।মানববন্ধনে বক্তারা আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৪ সালের একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় হাইকোর্ট বেওয়ারিশ কুকুর নিধন কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। ফলে আইন ও আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কুকুর নিধনের দাবি বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বক্তারা বলেন, জলাতঙ্ক পরিস্থিতি নিয়ে অযৌক্তিক ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টির পরিবর্তে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। গত এক দশকে সরকার, ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞ, প্রাণিকল্যাণ সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবীদের ধারাবাহিক টিকাদান ও নির্বীজন কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশে জলাতঙ্কজনিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে, টিকাদান ও নির্বীজনই পথকুকুর ব্যবস্থাপনা এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর, মানবিক ও টেকসই উপায়। বক্তারা আরও বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য প্রাণিপ্রেমী ও স্বেচ্ছাসেবী নিজেদের অর্থায়নে পথকুকুরের খাদ্য, চিকিৎসা, টিকাদান ও নির্বীজন কার্যক্রমে সহায়তা করে আসছেন। এর ফলে অধিকাংশ পথকুকুর মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত এবং শান্ত স্বভাবের। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ভিত্তিতে সমগ্র পথপ্রাণীকে হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা বাস্তবতা ও মানবিকতার পরিপন্থী।মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা প্রাণিকল্যাণকর্মি ও প্রাণিপ্রেমীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং ভিত্তিহীন অভিযোগেরও নিন্দা জানান। তারা বলেন, কোনো নাগরিক পথপ্রাণীকে খাদ্য প্রদান বা চিকিৎসা করানোর কারণে সংশ্লিষ্ট প্রাণীর প্রতিটি আচরণের জন্য আইনগতভাবে দায়ী হয়ে যান না। এ ধরনের বক্তব্য সমাজে বিভাজন ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। বক্তারা ইসলামে প্রাণীর প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও সদাচরণের শিক্ষার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তারা বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিষিদ্ধ করেছেন এবং বিভিন্ন হাদিসে প্রাণীর প্রতি দয়ার গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। তাই ধর্মের অপব্যাখ্যা করে নির্বিচারে প্রাণী নিধনের পক্ষে প্রচারণা চালানো সমর্থনযোগ্য নয়। মানববন্ধনে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল অঙ্গনের প্রতিনিধিরা সংহতি প্রকাশ করেন। উপস্থিত ছিলেন ‘চাঁনখারপুল’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা ও কলাকুশলীরা। উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা মনিরুল হক আকাশ, ‘যাযাবর’ ও ‘পাঠশালা’ চলচ্চিত্রের পরিচালক ফয়সাল রদ্দি, অভিনেত্রী ঐশ্বর্যসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রাণিকল্যাণকর্মি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মানববন্ধনে অংশ নেন।মানববন্ধন থেকে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করা হয়—১। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।২। বেওয়ারিশ কুকুর নিধন ও অবৈধ স্থানান্তরের যেকোনো উদ্যোগ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।৩। দেশব্যাপী CNVR (Catch-Neuter-Vaccinate-Release) কার্যক্রম পুনরায় জোরদার ও সম্প্রসারণ করতে হবে।৪। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে গণটিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।৫। পথপ্রাণী ও প্রাণিকল্যাণকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক ও আতঙ্কসৃষ্টিকারী প্রচারণা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মানববন্ধন শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে এএলবি এনিম্যাল শেল্টারের ফাউন্ডার ও চেয়ারম্যান দীপান্বিতা হৃদি এবং গ্রিট ফাউন্ডেশনের পরিচালক নিলুফার ইয়াসমিন টুম্পা বলেন, “মানুষ ও পথপ্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে হত্যা নয়, মানবিক, যৌক্তিক, আইনসম্মত ও টেকসই সমাধানের পথেই এগোতে হবে। আমরা আশা করি সরকার, গণমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং পথপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় মানবিক ও কার্যকর নীতি অনুসরণ করবে।”-প্রেস বিজ্ঞপ্তি Post navigation Rohingyas Want to Return Home, Bangladesh Tells UN