আমি গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, বাংলাদেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে এমন কিছু সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড সামনে আসছে, যা ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মি, জুলাইয়ের আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী জনগণের মধ্যে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জনপরিসরে অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে যে, কিছু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কটাক্ষপূর্ণ বক্তব্য, লেখা বা সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেছেন। একই সঙ্গে তাদের কেউ কেউ জুলাই আন্দোলন এবং তার চেতনার বিরোধী অবস্থানে ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, যেসব ব্যক্তিকে ঘিরে এত বিতর্ক ও অভিযোগ রয়েছে, তারা কীভাবে আজও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসরে বিশেষ মর্যাদা, স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন? মোহন রায়হানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিতর্ক ও অভিযোগ জনপরিসরে আলোচিত হয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কটাক্ষপূর্ণ রচনা করেছেন, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সমালোচনা করেছেন এবং এমন সাংস্কৃতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়াও জনপরিসরে অভিযোগ রয়েছে যে, শ্যামল জাকারিয়া, রেজাউদ্দিন স্টালিনসহ কয়েকজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে ‘ইনডেমনিটি’ নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে শ্যামল জাকারিয়ার ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। তাদেরকে মোহন রায়হান শহীদ জিয়া বিরোধী লোকজনদেরকে সংগঠিত করছে। আমার প্রশ্ন হলো—যে সকল ব্যক্তি অতীতে জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধের বিরোধিতা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের কীভাবে পুনরায় রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে? আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী ১ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে মোহন রায়হানকে সম্বর্ধনা দেয়ার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা জুলাইয়ের চেতনা, জনগণের প্রত্যাশা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আমি মনে করি। জুলাইয়ের চেতনা ছিল অন্যায়, বৈষম্য, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনগণের একটি ঐতিহাসিক প্রতিবাদ। সেই চেতনার আলোকে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত ছিল আরও সতর্ক, স্বচ্ছ ও জনগণের অনুভূতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। আমি মনে করি, কোনো ব্যক্তিকে সম্মান দওয়ার আগে তার অতীত ভূমিকা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং জনমনে সৃষ্ট প্রশ্নগুলো বিবেচনায় নেয়া উচিত। বিতর্কিত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলে তা ত্যাগী মানুষদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা যারা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, হামলা, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের শিকার হয়েছি, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যারা ত্যাগ করেছেন, তারা যদি উপেক্ষিত হন এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যদি সম্মান ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ পান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আদর্শের মূল্য কোথায়? আমি সরকারের কাছে এবং সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে নিম্নোক্ত দাবি জানাচ্ছি— ১. আগামী ১ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে মোহন রায়হানকে দেয়ার পরিকল্পিত সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান বাতিল করা হোক। ২. মোহন রায়হানকে ঘিরে জনপরিসরে উত্থাপিত সকল অভিযোগ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। ৩. শ্যামল জাকারিয়া, রেজাউদ্দিন স্টালিনসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। ৪. সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ, পুরস্কার ও স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা হোক। ৫. কবিতা পরিষদসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অর্থায়ন, কার্যক্রম এবং সরকারি বা রাজনৈতিক উৎস থেকে কোনো বিশেষ সুবিধা গ্রহণের বিষয় থাকলে তা আইন অনুযায়ী তদন্ত করা হোক। ৬. সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রেখে জনগণের ইতিহাস, মূল্যবোধ ও মুক্ত চিন্তার প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হোক। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই বক্তব্য কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে নয়; বরং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আদর্শিক অবস্থান রক্ষার স্বার্থে একটি দাবি। অভিযোগ সত্য হলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে তা স্বচ্ছভাবে খণ্ডন করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। জুলাইয়ের চেতনা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই আমাদের প্রত্যাশা। আবু জুবায়ের বিবৃতির তারিখ: ২৮ জুলাই ২০২৬ Post Views: 23 Post navigation ছবি : প্রধানমন্ত্রী ‘আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ স্মরণসভা’