আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ‘অতর্কিত হামলা চেষ্টার প্রতিশোধ হিসেবে’ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ‘ব্যাপক’ হামলা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সিদ্ধান্তে হামলা স্থগিতের পাঁচ দিনের মাথায় আবারও ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনারা।

এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, গত মঙ্গলবার জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে ইরানি বাহিনী যে হামলা চালিয়েছে, তার একটি “শক্তিশালী জবাব” হিসেবেই বৃহস্পতিবার তাদের ওপর পুনরায় আক্রমণ শুরু হয়েছে।

তবে হামলায় ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

এমন এক সময় নতুন এ হামলার ঘটনাটি ঘটলো, যার ঠিক একদিন আগে ইরাকে থাকা ইরান সমর্থিক একটি আধা-সামরিক ইরাকি বাহিনীকে লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে যৌথ হামলা চালায় সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা।বিবিসি

গত ফেব্রুয়ারির একেবারে শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক হামলা শুরু করেছিল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন যে, যুদ্ধটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ওই হামলার পর প্রায় পাঁচ মাস পেরোতে চললেও যুদ্ধটি স্থায়ীভাবে শেষ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখনও পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

যদিও গত শুক্রবার ট্রাম্পের কাছ থেকে হঠাৎ নির্দেশনা পাওয়ার পর বেশ কয়েকদিন দু’পক্ষের মধ্যে পাল্টা-পাল্টি হামলা বন্ধ ছিল।

কিন্তু সপ্তাহ পেরনোর আগেই সংঘাতটি আবারও আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

এর আগে, মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে, যুদ্ধ অবসানে কূটনীতিকে আরেকবার সুযোগ দেয়ার জন্য তেহরানের ওপর হামলা আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।

পর পর দুই রাত হামলা না হওয়ায় ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে তারাও নতুন করে কোনো হামলা চালাচ্ছে না।

এরপর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, দু’দেশের মধ্যে পুনরায় শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে এবং সেটি ‘অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণভাবে’ এগিয়ে চলেছে।

তবে তেহরান অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর কথা অস্বীকার করে আসছিল।

এর মধ্যেই বুধবার নতুন করে হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, ইরানি বাহিনী মার্কিন সেনাদের ওপর আবারও হামলার চেষ্টা চালিয়েছে।

ওই হামলা চেষ্টার প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকারও করেন তিনি।

“আমরা তাদের ওপর খুব কঠিন আঘাত হানতে যাচ্ছি, কারণ এখন আমাদের আঘাত করার পালা,” বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন ট্রাম্প।

যেসব হামলা চেষ্টার জবাবে ইরানের ওপর নতুন করে আক্রমণ শুরু হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সেটির সত্যতা স্বীকার করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।

হামলার ব্যাপারে এক বিবৃতিতে তারা বলছে, “শিশুহত্যাকারী মার্কিন সেনাবাহিনীর আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের জবাবে” তারা জর্ডানে একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটি এবং একটি কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়েছিল।

আইআরজিসি’র ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌবাহিনী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে অভিযান চালিয়েছে।

সতর্ক করার পরও সেগুলো আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির মধ্য দিয়ে একটি “অনিরাপদ ও অবৈধ” পথ ধরে যাচ্ছিল বলে দাবি করেছে ইরানি বাহিনী।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেটি টানা প্রায় চল্লিশ দিন চলে। এরপর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু করে ওয়াশিংটন ও তেহরান।

দফায় দফায় বৈঠকের এক পর্যায়ে গত জুন মাসে দু’পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সপ্তাহ দুয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়।

এর মধ্যে গত সপ্তাহে হামলা আরও তীব্র করার ইঙ্গিত দেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে সম্প্রতি বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশ করে মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওস।

অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আইআরজিসি’র ড্রোন হামলায় মার্কিন সেনা হতাহতের ঘটনাও ঘটে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ২৪ জুলাই অনেকটা আকস্মিকভাবেই ইরানের ওপর হামলা বন্ধের নির্দেশ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি কি আপাতত যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসিকে বলেছিলেন, “প্রেসিডেন্ট সব বিকল্পই খোলা রাখছেন।”

অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে খবর বের হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে হঠাৎ করে ইরানের ওপর সামরিক হামলা বৃদ্ধি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটির পেছনের কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসা।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে, ইরানের ওপর হামলা আরও বৃদ্ধি করা হলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ‘বিপজ্জনক পর্যায়ে’ নেমে আসতে পারে বলে খবরটিতে উল্লেখ করা হয়।

তবে নিউইয়র্ক টাইমসের এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ট সহযোগী হিসেবে পরিচিত মি. ওয়াল্টজ।

গত শুক্রবার হামলা বন্ধের আগে টানা ১৩ রাত ধরে ইরানের অস্ত্র ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে আক্রমণ চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্পদের পাশাপাশি ওই হামলা অনেকে নিহতও হন।

নতুন করে হামলা শুরুর আগে গত মঙ্গলবার সেন্টকম জানায়, আগের ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসি’র নির্দেশে ইরাকের পূর্বাঞ্চল থেকে ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

জবাবে ইরাকের ওই হামলাকারী বাহিনীর একাধিক রসদ ও অস্ত্রের ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে বলে বুধবার জানায় মার্কিন বাহিনী।

ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ইরাকের যে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর সৌদি-মার্কিন বাহিনী যৌথ হামলা চালিয়েছে, সেটির নাম ‘পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ)।

হামলায় তাদের অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পিএমএফের কর্মকর্তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, তারা ইরাকের সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই দেশটির পূর্বাংশে হামলা চালিয়েছে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পিএমএফ ঘাঁটিগুলোতে সৌদি-মার্কিন যৌথ হামলার পর সেটির নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছে ইরাকের সরকার।

তারা ওই ধরনের হামলাকে “অগ্রহণযোগ্য এবং ইরাকের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন” বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *