ইস্টবেঙ্গল নিয়ে তিন দিন ধরে সরব তিনি। প্রশ্ন তুলেছেন ক্লাবের কিছু কর্তার মানসিকতা নিয়ে। কিন্তু বার বার বিতর্কে জড়ানো স্পেনীয় কোচের নিজের জীবনও কালিমাহীন নয়। বিশ্লেষণ আনন্দবাজার ডট কমের। স্পোর্টস ডেস্ক : সময়টা গত বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি। চেন্নাইয়িন এফসি-র বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলছিল ইস্টবেঙ্গল। তৎকালীন কোচ অস্কার ব্রুজ়োকে শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছিল চেঁচিয়ে কিছু নির্দেশ দিচ্ছেন ক্লেটন সিলভাকে। আচমকাই কোচের দিকে এগিয়ে এসেছিলেন আপাতভদ্র ফুটবলার ক্লেটন। সোজাসুজি কথা বলতে শুরু করেছিলেন। কিছু তর্কবিতর্কও হয়েছিল। এরপর হঠাৎই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পরে জানা গিয়েছিল, দলের অপেক্ষায় না থেকে হোটেলে ফিরে গেছেন তিনি। প্রথম বার সুর কেটেছিল তখনই। কিন্তু সাফল্যের আড়ালে সব বিতর্ক ধামাচাপা ছিল এত দিন। খুঁচিয়ে সেই বিতর্ক টেনে তুললেন অস্কার নিজেই। প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে তার সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের পুরনো ঝামেলা। সম্প্রতি লাল-হলুদ সমর্থকদের একটি গ্রুপের কিছু পোস্টের বিরুদ্ধে সমাজমাধ্যমে লাগাতার তোপ দেগে যাচ্ছেন অস্কার। আক্রমণের তির ইস্টবেঙ্গল ক্লাব এবং তাদের কর্তাদের দিকে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বরাবর বিতর্কে জড়ানো অস্কার কেন বার বার ক্লাবের দিকে আঙুল তুলছেন? তিনি নিজে কি খুবই ভাল লোক? কোনও দিন কোনও দোষ করেননি এবং বরাবর তাকেই সমস্যায় পড়তে হয়েছে? অস্কার ইস্টবেঙ্গলের কোচের পদ থেকে সরে গেছেন তিন মাসেরও বেশি আগে। ইন্দোনেশিয়ার ক্লাব ভয়ঙ্করা এফসি-তে যোগ দিয়ে নতুন মরসুমের প্রস্তুতিও জোরকদমে শুরু করে দিয়েছেন। তবু এখনও ইস্টবেঙ্গলকে ‘ভুলতে’ পারছেন না তিনি। তাই নতুন দলের হয়ে কাজ করার ফাঁকেই পুরনো দলের কোন এক সমর্থক ক্লাব তার বিরুদ্ধে কী পোস্ট করেছে, সে দিকেও নজর রাখছেন। পাল্টা আক্রমণ করতে গিয়ে ইস্টবেঙ্গলের এক কর্তার দিকেও আঙুল তুলেছেন। ক্লাবের সঙ্গে কোচের ঝামেলা নতুন কিছু নয়। বিদেশের নামিদামি ফুটবল ক্লাবেও অহরহ এই ঘটনা ঘটে থাকে। রিয়াল মাদ্রিদে প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের রোষানলে পড়লে চাকরি যায় কোচের। বার্সেলোনা, চেলসি, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের মতো বড় ক্লাবেও একই চিত্র। কলকাতা ময়দানে তো বহুকাল আগে থেকেই এই জিনিস চলে আসছে। কিন্তু কোচের পদ থেকে সরে যাওয়ার পর পুরনো ক্লাবের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে অস্কারের মতো কাউকে দেখা যায়নি আগে। বিশেষ করে এত দিন পর ক্লাবকর্তাদের নাম করে তার এই আক্রমণ অনেকেই মানতে পারছেন না। কয়েক মাস আগে ইস্টবেঙ্গলকে প্রথম বার লিগ-শিল্ড দেয়া কোচের সব ভাল দিক চাপা পড়ে গেছে এই একটি ঘটনায়। কী বলেছেন অস্কার?সমর্থকদের একটি সংগঠনের তরফে সম্প্রতি অস্কারের সমালোচনা করে কিছু পোস্ট করা হয়েছিল। চাইলেই অনায়াসে সেটি এড়িয়ে যেতে পারতেন অস্কার। তা করেননি। উল্টে ক্লাবের দল পরিচালন সমিতিকে কটাক্ষ করে কিছু কথা বলেন। বিষয়টি সেখানেই মিটে যেতে পারত। পরের দিন আবার লম্বা পোস্ট করেন তিনি। সেখানে উল্লেখ করেন এক ‘মাস্টার’-এর কথা। এই ‘মাস্টার’টি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কে, তা সকলেই বুঝে যান। তার নাম না করে অস্কার লেখেন, “‘মাস্টার’ দাবি করেছিলেন, কোনও একটি ম্যাচে রেফারি না কি ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে আছেন। মরসুমের শেষ ম্যাচের আগে মাস্টার কয়েক জনকে বলেছিলেন, রেফারি আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তার ওই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল। যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা জানেন, রেফারি সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে খেলা পরিচালনা করেছিলেন। অথচ দলের সকলে তার ওই দাবি জানত। এই রকম ভুল তথ্যে সমস্যা তৈরি হয়। বেশ কয়েক বার সাজঘর থেকে মাস্টারকে বার করে দিয়েছি। উনি সাজঘরে ঢুকে শুধু ফুটবলার এবং কোচিং স্টাফদের সমালোচনা করতেন। দলের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতেন। কাজের পরিবেশ নষ্ট করতেন। বিষয়টা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। দলকে বাঁচাতেই আমায় হস্তক্ষেপ করতে হত। উনি সব সময় দলের সঙ্গে ঘুরতেন। বুঝতে পারতাম, দলের পাশে থাকার বদলে নিজের প্রভাব বজায় রাখাই ছিল ওর উদ্দেশ্য। বার বার দলের কাছাকাছি আসার এবং নানা তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করতেন। দলের ভিতরের সব খবর চলে যেত তার ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে। কৌশলগত তথ্যগুলো পরিকল্পিত ভাবে ফাঁস করে দেয়া হত। তাতে দলের ক্ষতি হত। আমাদের বার বার বলা হত, অনুশীলন, কৌশল বা সম্ভাব্য একাদশ নিয়ে সংবাদমাধ্যম যা প্রকাশ করে, সে সব ক্লাবের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই ব্যাখ্যাটা মেনে নেয়া আমার জন্য কঠিন হত।” অস্কারের অতীত বিতর্কভারতীয় ফুটবলে প্রথম বার কোচিং করাতে আসার পর থেকেই বিতর্ক এবং অস্কার হাত ধরাধরি করে হেঁটেছেন। তিনি কোচিং করাবেন আর বিতর্ক হবে না, তা ভাবাই যায় না। আইএসএলে মুম্বই সিটি এফসি-তে কোচিং করানোর সময় বিশ্বকাপার নিকোলাস আনেলকার সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল তার। তার পরেই চাকরি চলে যায়। বাংলাদেশের বসুন্ধরা কিংসের কোচিং করানোর সময়েও আঙুল তুলেছিলেন সেখানকার কর্তাদের দিকে। জানিয়েছিলেন, ফুটবল নিয়ে সেই কর্তাদের জ্ঞান কম। পাল্টা অভিযোগ করেছিল বসুন্ধরাও। ইস্টবেঙ্গলে কোচিং করাতে আসার পর ভুটানে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের ম্যাচ খেলতে গিয়ে আচমকাই বসুন্ধরার বিরুদ্ধে বেশ কিছু কথা বলেছিলেন। ইস্টবেঙ্গলে পর পর ঝামেলানিজের দলের খেলোয়াড় এবং সাপোর্ট স্টাফদের সঙ্গে ঝামেলা তো লেগেই ছিল ইস্টবেঙ্গলে। দীর্ঘ দিন বাদে ইস্টবেঙ্গলকে সুপার কাপ জেতানো হিজাজি মাহেরের সঙ্গে তিনি খারাপ ব্যবহার করেছিলেন। হিজাজির দোষ ছিল তিনি আগের কোচ কার্লেস কুয়াদ্রাতের পছন্দের ছিলেন। ক্লেটনের সঙ্গে ঝামেলা তো সকলেই দেখেছেন। জোর করে ক্লেটনকে অপছন্দের জায়গায় খেলানোর চেষ্টা করেছেন। ক্লেটন যাতে ক্লাব ছাড়তে বাধ্য হন তার জন্য নানা ভাবে ‘প্রয়াস’ চালিয়ে গিয়েছেন অস্কার। ঝামেলা করেছেন দিমিত্রিয়স দিয়ামানতাকোসের সঙ্গেও। স্রেফ কোচের পছন্দ নয় বলেই বিপুল আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে দিয়ামানতাকোসকে ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। গত বছর আইএফএ শিল্ড ফাইনালে মোহনবাগানের কাছে হারের পর প্রকাশ্যেই দেবজিৎ মজুমদারের সমালোচনা করেছিলেন অস্কার। সেই দেবজিৎকে নামানোর জন্য প্রকাশ্যে দায়ী করেছিলেন গোলকিপার কোচ সন্দীপ নন্দীকে। সুপার কাপ খেলতে গোয়ায় নামার পর সন্দীপকে এতটাই অপমান করেন যে, ক্ষুব্ধ সন্দীপ তখনই কলকাতায় ফিরে আসেন এবং পদত্যাগ করেন। প্রাক্তনদের তোপশুধু তাই নয়, বাদ যাননি ক্লাবের প্রাক্তন ফুটবলাররাও। আইএসএলে পঞ্জাব ম্যাচের আগে সাংবাদিক সম্মেলনে আচমকাই সন্দীপ, আলভিটো ডি’কুনহা, রহিম নবিদের ‘দালাল’ বলেন। অস্কার বলেছিলেন, “একটা বার্তা স্পষ্ট করে দিতে চাই আজ। অনেকেই ইদানীং ক্লাবকে নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু তারা ক্লাবের সাফল্য চায় না। এই প্রাক্তন খেলোয়াড়দের নাম উল্লেখ করতে চাই। রহিম আলি (নবি), সন্দীপ নন্দী, আলভিটো ডি’কুনহা। এই ক’দিনে ওদের এক বারও ট্রফি নিয়ে কথা বলতে দেখিনি। আসলে ওরা ক্লাবের প্রাক্তন ব্রোকার (দালাল)। ওরা সব কিছুতেই খারাপ খোঁজে। সব সাফল্যকে ছোট করে দেখতে চায়। তাই এই বার্তা সমর্থক এবং ক্লাব পরিচালন সমিতির জন্য। এই ধরনের লোকজন ক্লাবের পক্ষে ক্ষতিকর।” এ দিন নবি আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেছেন, “ক্লাব ছেড়ে চলে যাওয়ার এত দিন পর এ সব কথা বলার অর্থ কী? আসলে ও কোচ হয়ে আসার সময়েই বাংলাদেশে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছিলাম, লোকটা ভাল নয়। তখন কাউকে বলিনি। আগেই বলেছিলাম, উনি পরিযায়ী শ্রমিকের মতো। কোচ আসবেন যাবেন। আসলে উনি কোচই নন। কোচ হলে এ রকম কথাবার্তা কেউ বলতে পারত না।” তাকে ‘দালাল’ বলার প্রসঙ্গে নবির সাফ জবাব, “কুকুর কামড়ালে তাকে তো পাল্টা কামড়ানো যায় না। আসলে ওর মধ্যে শিক্ষার অভাব রয়েছে। আমাদের সময়ে কোচ হলে দু’দিনে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিতাম। ওর এ সব আচরণ মোটেই ভাল কোচের পরিচয় নয়। আমার তো মনে হয় এ সব কথা বলার জন্য ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের উচিত ওর বিরুদ্ধে মামলা করা। দরকারে আমিও সেই মামলায় যোগ দেব। ক্লাবকে নিয়ে এই সব কথা বলার অধিকার ওকে কে দিয়েছে?” আনন্দবাজার ডট কম-কে সন্দীপ বলেছেন, “‘‘আমি গোলকিপিং কোচের দায়িত্ব ছাড়ার সময়ই বলেছিলাম, ব্রুজ়ো ভাল মনের মানুষ নন। কেউ বিশ্বাস করেনি। এখন তো আমার কথাই প্রমাণ হচ্ছে। আরে ব্রুজ়ো নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করেন না। এখন ইন্দোনেশিয়ায় আছেন। নতুন ক্লাবের দায়িত্ব নিয়েছেন। নিজের দল নিয়ে ভাবুন। ছেড়ে যাওয়া ক্লাবকে নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? কে কোথায় কী বলল, তা নিয়ে কেন মাথা ঘামাচ্ছেন উনি! ক্লাব তো কিছু বলেনি। বিদেশে বসে কেন ইস্টবেঙ্গলের সম্মানহানি করছেন? আমি দেশ-বিদেশের অনেক ভাল কোচের অধীনে খেলেছি বা কাজ করেছি। দলের বাইরে সব কিছু নিয়ে এত মাথা ঘামাতে দেখিনি কাউকে। ব্রুজ়ো অত্যন্ত সন্দেহবাতিক মানুষ। নিজের মতো করে ধরে নেন। কোন কর্তা কোন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছেন, কোন ফুটবলার কোন কর্তার সঙ্গে কথা বলছে, কে কী লিখল— সব দিকে নজর। এগুলো কি কোচের কাজ? সমালোচনা, প্রশংসা নিয়ে কোনও ভাল কোচ মাথা ঘামান না। আমাকে সকলের সামনে অপমান করেছিলেন। বলেছিলেন, আমি ক্লাবের লোক! কিন্তু আমি সততার সঙ্গে কাজ করি। কোনও অন্যায় করিনি। আপাদমস্তক পেশাদার আমি। আত্মসম্মানে আঘাত লাগছিল। সরে এসেছিলাম।’’ শনিবার এক অনুষ্ঠানে গিয়ে সংবাদমাধ্যমে ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ফুটবলার ও কোচ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেছেন, “কে কী বলল তাতে ইস্টবেঙ্গলের কিছু যায় আসে না। এগুলোকে বেশি প্রশ্রয় দেয়ারই দরকার নেই। তবে এই মন্তব্য করা উচিত নয় একেবারেই। আমি জানি না নীতুর (দেবব্রত সরকার) সঙ্গে ওর ব্যক্তিগত কোনও সমস্যা রয়েছে কি না। কিন্তু এই কোচের যা মানসিকতা তাতে কেউ নেবে বলে মনে হয় না। ও শুধু ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের কলঙ্কিত করেনি, ফুটবলারদেরও কলঙ্কিত করেছে।” আরও ক্ষিপ্ত ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়। তার কথায়, “একটা পাগলের কথায় কান দিয়ে লাভ নেই। সে তো কাল বলতে পারে, আমি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হব। যে কেউ যা খুশি বলতে পারে। সব কথায় কান দিতে হবে নাকি?” Post Views: 34 Post navigation বৈভবকে সচিন তৈরি করতে চায় বোর্ড, শুরু বিশেষ ভাবনা, দলীপে সহ-অধিনায়ককে না-ও পেতে পারে পূর্বাঞ্চল