নিউটার্ন ডেস্ক :
চা বানানোর সময়ে কয়েক চিনির দানা প্রায়শই হাত থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে যায়। পায়েস বানাতে গিয়েও দু-এক সময়ে দুধ উথলে যে চুলার ওপর বা আশেপাশে পড়ে না, তা নয়। আর মিষ্টি খেতে গিয়ে তার গুঁড়ো তো হামেশাই গিয়ে পড়ে টেবিলের নিচে।

এসব নিয়ে আমরা কেউ তেমন মাথা ঘামাই না।

কিন্তু তার ঠিক কিছুক্ষণ পরেই দরজার প্রান্ত থেকে কিংবা ঘরের স্যাঁতস্যাঁতে কোণা থেকে বেরিয়ে আসে পিঁপড়ের দল।

তারা একেবারে ঠিক সেখানে উপস্থিত হয় যেখানে মিষ্টি জাতীয় কিছু পড়ে আছে। তারপর সারি সারি পিঁপড়েদের খাবারের কণার দিকে এগিয়ে যেতেও দেখা যায় বৈকি।

কিন্তু কীভাবে তারা মাপঝোপ করে একেবারে ‘অকুস্থলে’ পৌঁছায়?

আসলে পিঁপড়েরা তাদের অ্যান্টেনা বা শুঁড় ব্যবহার করে আমাদের বাড়ির মেঝে অনুভব করতে পারে।

এর ফলে তারা এমন সব ঘ্রাণ ও রাসায়নিক সংকেত সনাক্ত করতে পারে যা মানুষ পারে না।

আর ঠিক এভাবেই পড়ে থাকা খাবারের কণাও তারা নির্ভুলভাবে খুঁজে বের করতে পারে।

পিঁপড়েদের এই বিশেষ ক্ষমতা কীভাবে তাদের মিষ্টি খাবারের কণা চিনে সেখানে পৌঁছাতে সাহায্য করে?

আর কীভাবেই বা খাবারের চারপাশে পিঁপড়ের ঝাঁক তৈরি হয়? এ প্রতিবেদনে সেসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছি আমরা।

আপনার বাড়ি থেকে বহু দূরে বাস করলেও আপনার রান্নাঘরের ঘ্রাণ পিঁপড়েদের কাছে ঠিকঠাক পৌঁছায়। এই বিষয়টা বেশ অদ্ভুত এবং একইসঙ্গে আকর্ষণীয়ও।

প্রাচীনকাল থেকেই খাবার খোঁজার জন্য পিঁপড়েদের এক বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।

খাবার খোঁজার জন্য তাদের এই বিশেষ ব্যবস্থা এক ধরনের নেটওয়ার্কের মতো। এটা রাসায়নিক সংকেত, স্মৃতি এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ব্যবহার করে তৈরি একটা নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে।

ভারতের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির গবেষক হিমেন্দর ভারতী ২০১৬ সালে চীন এবং জাপানের গবেষকদের সঙ্গে ভারতে পাওয়া যায় এমন পিঁপড়েদের প্রজাতিগুলোর একটা তালিকা সংকলন করেছিলেন। সেই তালিকা অনুযায়ী, ভারতে পিঁপড়ের ৮২৮টা প্রজাতি ও উপপ্রজাতি রয়েছে।

২০২৪ সালে তামিলনাড়ুর তিরুভাল্লুর জেলায় পিঁপড়েদের বিভিন্ন প্রজাতির খোঁজ পেতে একটা সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, মানুষের ঘরসহ বিভিন্ন জায়গায় বাস করে এমন ৩৪ প্রজাতির পিঁপড়ে রয়েছে।

তবে, আমাদের রান্নাঘরে যে পিঁপড়েদের দেখা মেলে তারা কোনো বিশেষ প্রজাতির নয়।

গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন সমস্ত প্রজাতির পিঁপড়েদের জীবনযাত্রা কিন্তু একই রকম। খাদ্যের সন্ধানে পিঁপড়েদের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

কিছু পিঁপড়ে ঘরের দেয়াল বা তার গায়ে থাকা ফাটল, জানালা, পাইপ এবং মেঝের একেবারে কোণা ঘেঁষে যাতায়াত করে। এদের মূল কাজ হলো তাদের চারপাশের পুরো এলাকা খুঁজে দেখা।

তাদের শরীরে অ্যান্টেনার মতো একটা ডিভাইস রয়েছে। খাবারের সন্ধান চালানোর ক্ষেত্রে এ অ্যান্টেনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাইক্রোবায়োলজির জগতে পিঁপড়েকে এমন এক ধরনের জীব হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যাদের জগৎটা একেবারেই ভিন্ন।

গবেষক শন কে ম্যাকেঞ্জির নেতৃত্বে এক গবেষণায় দেখা গেছে যে “পিঁপড়ের জিনোমে গন্ধ-সংবেদনশীল জিনের প্রাচুর্য রয়েছে।”

জিনোম বলতে কোনো জীবের জিনগত নির্দেশাবলীর সমষ্টিকে বোঝায়।

এ বিষয়ে ২০১২ সালে ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের চালানো এক গবেষণা পিএলওএস জেনেটিক্স নামক সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল।

সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে অন্যান্য অনেক প্রজাতির পোকা-মাকড়ের তুলনায় পিঁপড়েদের শরীরে চার-পাঁচগুণ বেশি ঘ্রাণশক্তি রিসেপ্টর রয়েছে।

সহজভাবে বলতে গেলে, আমাদের রান্নাঘর পিঁপড়েদের কাছে শুধু একটা জায়গা নয়, অগণিত রাসায়নিক সংকেতে ভরপুর এমন এক ক্ষেত্র যে সংকেত শুধু তারাই লক্ষ্য করতে পারে। মানুষের চোখে এসব ধরা পড়া সম্ভব নয়।

কয়েক দানা চিনি, গুড়ের কণা, দুধ, চায়ের ফোঁটা, চামচে রয়ে যাওয়া ঘিয়ের দাগ বা রান্নাঘরের সিঙ্কের চারপাশের আর্দ্র জায়গা দিয়েই বেশিরভাগ পিঁপড়েরা খোঁজাখুঁজির কাজ শুরু করে।

গবেষক ডা. ওয়াকার জলিলের নেতৃত্বে ফায়ার অ্যান্টের উপর এক গবেষণা চালানো হয়েছিল, যা ২০২১ সালে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত হয়।

তাতে পিঁপড়ের খাবারের তালিকায় মিষ্টি উপাদানের উপস্থিতি, তাদের অ্যান্টেনায় থাকা টেস্ট রিসেপ্টর বা স্বাদগ্রাহক এবং পিঁপড়ের সামনের দিকের পায়ের মধ্যে একটা বিশেষ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

আসলে পিঁপড়েরা নিজেদের কলোনি বা গোত্রে টিকে থাকতে এবং শক্তি জোগাতে মূলত মিষ্টিযুক্ত খাবারের উপর নির্ভর করে যেমন – উদ্ভিদের মিষ্টি রস, মধু, ফল ইত্যাদি।

যেহেতু এ ধরনের খাবারের ঘ্রাণ বাতাসে তীব্র নয় তাই পিঁপড়েরা খাবারের কণার সংস্পর্শে এলে তা সনাক্ত করার জন্য তাদের শরীরে উপস্থিত বিশেষ অ্যানাটমিকাল সিস্টেম বা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে।

ওই গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পিঁপড়ের শরীরে উপস্থিত টেস্ট রিসেপ্টর খাবারে সংস্পর্শে আসা মাত্র চিনির ক্ষুদ্রতম কণাকেও সনাক্ত করতে পারে।

ঘরের এক কোণায় পড়ে থাকা খাবারের ক্ষুদ্র কণা, চামচ বা পাত্রে লেগে থাকা চা কিংবা মিষ্টি পানীয়ের দাগও খাদ্য অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষজ্ঞরা পিঁপড়েদের শুঁড়ে থাকা এই স্বাদ গ্রাহককে একটা সার্চ ইঞ্জিন হিসাবে বর্ণনা করেছেন যা প্রাকৃতিকভাবেই তাদের খাবার খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

যে পিঁপড়েরা শুধু অল্প পরিমাণে খাবারের খোঁজে রয়েছে তারা তাদের এ সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে খাদ্যের খোঁজ করে। অবশিষ্ট থাকা খাবার তারা খায় না।

খাবারের অবস্থান চিহ্নিত করতে জিপিএসের মতো ব্যবস্থা
মার্কিন কৃষি বিভাগের অন্তর্গত কৃষি গবেষণা পরিষেবা দ্বারা সংগৃহীত তথ্য বলছে “পিঁপড়ের ফেরোমোন খাবারের অবস্থানকে সনাক্ত করতে পারে।”

ফেরোমোন হলো জীব দেহ থেকে নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা একই প্রজাতির প্রাণীকে আকর্ষণ, সতর্ক ইত্যাদির জন্য ব্যবহার করা হয়।

পিঁপড়েরাও এর ব্যবহার করে।

এর অর্থ হলো খাবার খাওয়ার পর পিঁপড়েরা নিজেদের কলোনিতে ফিরে যাওয়ার সময় রাসায়নিক সংকেত ছাড়তে ছাড়তে যায়। এটা একটা রেখার মতো।

এটা যেমন তার কলোনির অন্যান্য পিঁপড়েদের আকর্ষণ করে তেমনই খাবারের অবস্থান খুঁজে পেতেও সাহায্য করে।

গবেষক ই. ডেভিড মর্গান এই প্রক্রিয়ার সম্পর্কে ২০০৯ সালে ফিজিওলজিকাল অনটোলজি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করেছিলেন।

সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, “যখন একটা পিঁপড়ে খাবার খুঁজে পায়, তখন তারা নিজেদের বাসায় ফিরে যাওয়ার পথে ফেরোমোনের একটা রেখা তৈরি করে।

তারপর গুগল ম্যাপসের মতো তার কলোনিতে বসবাসকারী অন্যান্য পিঁপড়েরা খাবারের জন্য ফেরোমোন ব্যবহার করে।”

ঠিক এইভাবেই একটা পিঁপড়ে বা পিঁপড়ের ছোট দল খাদ্যের উৎস খুঁজে পায়। তারা যে রাসায়নিক চিহ্ন রেখে যায় সেটা একটা সংকেত বা ক্লুয়ের মতো কাজ করে।

এর মাধ্যমেই খাদ্যের উৎসের দিকে অন্যান্য পিঁপড়েদের আকর্ষণ করে।

এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পিঁপড়ের মাথার সামনের অংশে থাকা অ্যান্টেনা বা শুঁড়।

গোয়ার ‘ফরেস্ট ইকোলজি রিসার্চ সেন্টার’-এর এনটোমলোজিস্ট বা কীটতত্ত্ববিদ ব্রুনয় বাইথিয়ার মতে, এই অ্যান্টেনা কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেলে পিঁপড়েদের পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যায়।

“পিঁপড়ার ভাষা তাদের রাসায়নিক সংকেতের উপর ভিত্তি করে। পিঁপড়েরা তাদের শরীর থেকে ফেরোমোন নামে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে।

ফেরোমোনের একটা রেখা তৈরি করে। এর স্পর্শের মাধ্যমে, পিঁপড়েরা তাদের চারপাশ সম্পর্কে জানতে পারে, খাবার খুঁজে পায়, একে অপরের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের কলোনিতে বসবাসকারী অন্যান্য পিঁপড়েদের সঙ্গেও এর মাধ্যমেই তাদের পরিচয় হয়।”

উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনও পিঁপড়ে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে বড়সড়ো কিছু খুঁজে পায় তাহলে তারা তা একা নিয়ে যেতে পারে না।

প্রথমে ওই খাবার ঠিক কোথায় আছে সেটা বুঝতে পিঁপড়েরা ফেরোমোন ব্যবহার করে। তারপর নিজেদের বাসায় ফেরার সময় তারা ক্রমাগত ফেরোমোন নিঃসরণ করতে করতে যায়।

এই রাসায়নিক সংকেতকে তারা অনেকটা আধুনিক সময়ের ‘জিপিএস’-এর মতো। এই জিপিএস ব্যবহার করেই কলোনির অন্য পিঁপড়েরা খাবার পর্যন্ত পৌঁছয়।

Article Information
Author,কে সুবগুণম
Role,বিবিসি সংবাদদাতা

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *