নিউটার্ন ডোস্ক : “আমার পেটের ডান দিকে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হলো। আমি ভেবেছিলাম হয়তো গ্যাস হয়েছে। ওষুধ খাওয়ার পরেও ব্যথা কমলো না। অবশেষে পরীক্ষা করানোর পর জানা গেল যে আমার পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে।বিবিসি অনেকেরই এরকম অভিজ্ঞতা হয়। পিত্তথলিতে পাথর জন্মানো বিশ্বজুড়ে পরিপাকতন্ত্রের একটি সাধারণ রোগ। এতে আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ দেখা যায় না, কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে এটি তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস এবং প্রদাহের মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করে সঠিকভাবে চিকিৎসা করা হয়, তবে সম্পূর্ণরূপে এর নিরাময় সম্ভব। ১. পিত্তরস কী?যকৃতের নিচে অবস্থিত একটি ছোট থলির মতো অঙ্গকে বলা হয় পিত্তথলি। এটি প্রায় ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এর প্রধান কাজ হলো যকৃত দ্বারা প্রতিদিন উৎপাদিত পিত্তরস সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করে রাখা। ২. পিত্তথলিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়?পিত্তথলিতে প্রধানত তিনটি উপাদান থাকে: কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ এবং বিলিরুবিন। যখন এই তিনটি উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্ফটিকগুলোই বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়। পিত্তথলিতে পাথর তৈরির কারণসমূহ: পিত্তরসে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকা; পিত্তথলির সম্পূর্ণরূপে খালি হতে না পারা; অতিরিক্ত বিলিরুবিন উৎপাদন; পিত্তথলির সংক্রমণ বা প্রদাহ। ৩. পিত্তথলির পাথর কত প্রকারের হয়?১. কোলেস্টেরল পাথর এই ধরনের পাথরই সব থেকে বেশি হয়, ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই ধরনের পাথরই তৈরি হয়। ২. পিগমেন্ট পাথর বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে এগুলো তৈরি হয়। সাধারণত যকৃতের রোগ বা রক্ত-সম্পর্কিত কিছু নির্দিষ্ট অসুস্থতার কারণে এগুলো দেখা দেয়। ৩. মিশ্র পাথর এগুলো কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম এবং বিলিরুবিনের মিশ্রণে গঠিত হয়। ৪. সবথেকে বেশি ঝুঁকি কাদের?এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ‘৫এফ’ -র সূত্রটি মনে রাখেন: ১. ফিমেল বা নারী: এই সমস্যাটি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায় ২. ফর্টি বা ৪০: ৪০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায় ৩. ফ্যাট বা চর্বি: অতিরিক্ত শারীরিক ওজন যাদের, তাদের ঝুঁকি বেশি ৪. ফার্টাইল বা গর্ভবতী হওয়ার উপযুক্ত: একজন নারী, যিনি গর্ভবতী হতে পারেন ৫. ফেয়ার বা ফর্সা: পশ্চিমের দেশগুলিতে বসবাসকারী ফর্সা ত্বকের মানুষ বেশি ভোগেন ৫. অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলো কী কী?স্থূলতামধুমেহউচ্চ কোলেস্টেরলগর্ভাবস্থাইস্ট্রোজেন হরমোনের ওষুধপিত্তথলিতে পাথর হওয়ার পারিবারিক ইতিহাসদীর্ঘ উপবাস বা না খেয়ে থাকাদ্রুত ওজন হ্রাসউচ্চ-চর্বিযুক্ত খাবারকম-ফাইবারযুক্ত খাবারযকৃতের রোগহিমোলাইটিক অ্যানিমিয়াবয়স বৃদ্ধিভারতে পিত্তপাথর একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। আনুমানিক ৫ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার পিত্তপাথর সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই সমস্যাটি দুই থেকে তিন গুণ বেশি দেখা যায় এবং ৪০ বছর বয়সের পর এর ঝুঁকি বাড়ে।তরুণদের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা যায়, যার প্রধান কারণগুলো হলো ক্রমবর্ধমান স্থূলতা, ব্যায়ামের অভাব এবং অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড গ্রহণ। ৬. পিত্তথলির পাথর হওয়ার লক্ষণগুলো কী কী?বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এই সমস্যাটি আলট্রাসাউন্ড করার সময় আকস্মিকভাবে ধরা পড়ে। লক্ষণ কখন দেখা দেয়? পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা কাঁধ বা পিঠে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ব্যথা উদ্বেগ বমি বদহজম পেট ফাঁপা পেটে গ্যাস জমা বিপজ্জনক লক্ষণগুলি কী কী? নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই হাসপাতালে যাওয়া উচিত: জ্বর কাঁপুনি জন্ডিস চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া গাঢ় রঙের প্রস্রাব সাদা বা ফ্যাকাশে মল পেটে তীব্র ব্যথা ক্রমাগত বমি হওয়া ৭. পিত্তথলির পাথর কীভাবে নির্ণয় করা হয়?আল্ট্রাসাউন্ড টেস্ট: এটি একটি খুব সহজ, স্বল্প খরচের এবং অত্যন্ত নির্ভুল পরীক্ষা। রক্ত পরীক্ষা: সিবিসি, লিভার ফাংশন টেস্ট, সিরাম বিলিরুবিন এবং লিভার এনজাইম পরীক্ষা করা হয়। এমআরসিপি এবং সিটি স্ক্যান: পিত্তনালীতে পাথর রয়েছে এমন সন্দেহ হলে সিটি স্ক্যান বা এমআরসিপি করা হয়। ইআরসিপি: এটি শুধু পাথর শনাক্ত করতেই নয়, কিছু ক্ষেত্রে তা অপসারণ করতেও ব্যবহৃত হয়। ৮. পিত্তথলিতে পাথরের চিকিৎসা কী?পিত্তথলিতে পাথর থাকা সত্ত্বেও যাদের কোনো উপসর্গ থাকে না, তাদের বেশিরভাগেরই কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।ডাক্তারের পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট।যদি উপসর্গ দেখা দেয় এবং বারবার ব্যথা অনুভূত হয়, তবে অস্ত্রোপচার একটি ভালো বিকল্প।ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি – এটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আদর্শ চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে পিত্তথলি অপসারণ করা হয়।ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সুবিধা: ছোট ছেদকম ব্যথাস্বল্প রক্তপাতদ্রুত আরোগ্য লাভএক বা দুই দিনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছুটি ৯. কখন জরুরিভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন?পিত্তথলিতে তীব্র প্রদাহপিত্তথলি ফেটে যাওয়ার ঝুঁকিপিত্তনালীতে প্রতিবন্ধকতাঅগ্ন্যাশয়ের প্রদাহসংক্রমণওষুধ কি পিত্তপাথর গলাতে পারে? কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু তা সবার জন্য কার্যকর নয়। ছোট কোলেস্টেরল পাথরের ক্ষেত্রে কিছু মানুষের জন্য ওষুধ সহায়ক হতে পারে। চিকিৎসায় কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছরও লাগতে পারে, কিন্তু পুনরায় পাথর তৈরি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই, অস্ত্রোপচারকে একটি স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১০. পিত্তথলি অপসারণ কি বিপজ্জনক?অনেকেই এই বিষয়টিতে ভয় পান। পিত্তথলি অপসারণের পরেও যকৃত পিত্তরস উৎপাদন করতে থাকে, যা সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে চলে যায়, তাই অনেকেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। ১১. চিকিৎসায় বিলম্ব হলে কী হয়?পিত্তথলির তীব্র প্রদাহপিত্তথলিতে ফোঁড়াপিত্তথলির টিস্যু ধ্বংসপিত্তথলি ছিদ্র হয়ে যাওয়াবাধা সৃষ্টির কারণে জন্ডিসপিত্ত নালীতে সংক্রমণঅগ্ন্যাশয়ের প্রদাহঅন্ত্রে প্রতিবন্ধকতাএছাড়াও পিত্তথলির ক্যান্সার হওয়ার একটি বিরল ঝুঁকি থাকে ১২. পিত্তথলিতে পাথর হওয়া আটকানো যায় কি?যদিও শতভাগ প্রতিরোধ সম্ভব নয়, তবে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুনস্থূলতা কমান, কিন্তু ওজন কমানো যেন হঠাৎ না হয়এমন ওজন কমানোর পদ্ধতি পরিহার করুন যার ফলে এক মাসে ২ থেকে ৪ কেজির বেশি ওজন কমে যায়প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ব্যায়াম করুনফল, শাকসবজি, দানা শস্য এবং ফাইবার সমৃদ্ধ একটি সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।ফাস্ট ফুড, ভাজা খাবার, ঘি, মাখন, ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া কমান।প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে জল পান করুন।আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে, তবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখলে ঝুঁকি কমে যায়।পিত্তপাথর সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাভুল ধারণা: পিত্তথলির পাথরের জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। তথ্য: যাদের ক্ষেত্রে কোন উপসর্গ দেখা যায় না, তাদের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। ভুল ধারণা: আয়ুর্বেদ বা ঘরোয়া প্রতিকারে পাথর সম্পূর্ণরূপে গলিয়ে ফেলা যায়। তথ্য: এর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। নিজে নিজে চিকিৎসা করা বিপজ্জনক হতে পারে। ভুল ধারণা: পিত্তথলির পাথর অপসারণ করলে আজীবন হজমের সমস্যা হবে। তথ্য: বেশিরভাগ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। ১৪. কখন আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত? যদি আপনি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলির মধ্যে কোনোটি অনুভব করেন, তাহলে আপনার অবিলম্বে হাসপাতালে যাওয়া উচিত: পেটের উপরের ডানদিকে তীব্র ব্যথা ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ব্যথা জ্বর বমি জন্ডিস চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া গাঢ় রঙের প্রস্রাব যদিও আজকাল পিত্তথলির পাথর একটি সাধারণ সমস্যা, তবুও এটিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ দেখা যায় না, কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে এটি তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস এবং অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যকর শারীরিক ওজন এবং নিয়মিত ব্যায়াম এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। যদি আপনার পেটের উপরের ডানদিকে বারবার ব্যথা হয়, তবে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং একটি আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান করানোই শ্রেয়। এই সমস্যার সবচেয়ে নিরাপদ, কার্যকর এবং স্থায়ী চিকিৎসা হলো আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি। সময়মতো রোগ নির্ণয়, যথাযথ চিকিৎসা এবং একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হলো পিত্তপাথর প্রতিরোধের প্রধান উপায়। দ্রষ্টব্য: লেখক একজন চিকিৎসক। এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য চিকিৎসা পদ্ধতি এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত যেকোনো সিদ্ধান্ত শুধু একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করার পরেই নেয়া উচিত। Article InformationAuthor,ডক্টর হিমানীRole,রেডিয়েশন অঙ্কোলজিস্ট Post Views: 24 Post navigation ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে এবার ৫৭ কোটি ডলার জরিমানা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই নাগরিক- এই সুযোগ সীমিত করছেন ট্রাম্প