আন্তর্জাতিক ডেস্ক :১৯৯৬ সালে মারা যাওয়া এক ভারতীয় পর্বতারোহীর পরা এই ‘বুট’ বা সবুজ রঙের জুতা বহু বছর ধরে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার পথে বহু পর্বতারোহীর জন্য একটি ভয়াবহ কিন্তু পরিচিত পথচিহ্ন হয়ে ছিল। এখন ভারত একটি বিশেষজ্ঞ হাই-অল্টিটিউড (অতি উচ্চতা) উদ্ধারকারী দল খুঁজছে, যারা খুব জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি অভিযান চালিয়ে মৃতদেহটি উদ্ধার করতে পারবে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ধারণা, ‘গ্রিন বুটস’ আসলে দোরজে মোরুপের দেহ। এটি এভারেস্টে বরফের নিচে পড়ে থাকা শত শত মৃতদেহের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত।বিবিসি তাদের আশা, এত বছর পর তারা মোরুপের দেহ তার পরিবার ও স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবেন, যারা কখনোই তার বাড়ি ফেরার আশা ছাড়েননি। মোরুপের স্ত্রী বিবিসিকে বলেছেন, “কিছু কিছু রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হতো, আজ রাতে হয়তো দরজায় কড়া নাড়বে। দরজা খুলে দেখব, সে দাঁড়িয়ে আছে।” “যেদিন সে বাড়ি ফিরবে, আমি তাকে জিজ্ঞেস করব- ‘এত বছর কোথায় ছিলে?'” এভারেস্টে একটি ঐতিহাসিক ভারতীয় অভিযানে অংশ নিতে যাওয়ার আগের রাতে মোরুপ লাদাখে নিজের বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে বসেছিলেন। লাদাখ ভারতের প্রশাসনাধীন হিমালয়ের একটি অঞ্চল। স্ত্রীকে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি একজন নায়ক হয়ে ফিরবেন এবং দেশকে গর্বিত করবেন। মোরুপের স্ত্রী কনচাক ইয়াংস্কিট বিবিসিকে বলেন, “সে আমাকে বলেছিল বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে এবং সে ফিরে এলে বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে যেতে।” ৪৮ বছর বয়সী মোরুপ ছিলেন ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আইটিবিপি-এর একজন ল্যান্স নায়েক (ল্যান্স কর্পোরাল)। চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের বড় একটি অংশ পাহারা দেয় এই বাহিনী। হিমালয়ে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণেও মোরুপের অভিজ্ঞতাও কিছুটা ছিল। তবে ইয়াংস্কিটের মনে সেদিন রাতে অদ্ভুত এক আশঙ্কা জেগেছিল। “আমার মনে হচ্ছিল, আমি কি আর কখনো তাকে দেখতে পাব?” মোরুপ ছিলেন আটিবিপি-এর ছয় সদস্যের একটি অভিযাত্রী দলের সদস্য। তাদের লক্ষ্য ছিল এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানো। এভারেস্ট নেপাল ও চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের সীমান্তে অবস্থিত। বেশিরভাগ পর্বতারোহী নেপালের দিক দিয়ে এভারেস্টে ওঠেন। কিন্তু মোরুপ ও তার সহযাত্রীরা চেয়েছিলেন ইতিহাস তৈরি করতে। তারা চীনের বিপজ্জনক উত্তর দিক দিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা প্রথম ভারতীয় অভিযাত্রী দল হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তুষারঝড়ের কারণে তাদের ছয় সদস্যের মধ্যে তিনজন ফিরে যান। কিন্তু মোরুপ এবং আরও দুই পর্বতারোহী-তসেওয়াঙ সামানলা ও তসেওয়াঙ পালজোর- এভারেস্টের চূড়ার দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে তারা ৮,৮৪৯ মিটার উচ্চতার এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। কিন্তু নামার সময় বিপর্যয় ঘটে। একটি তীব্র তুষারঝড়ে তিনজনই মারা যান। গত এক শতাব্দীতে এভারেস্ট অঞ্চলে ৩০০-এরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। তাদের অনেকের মতোই এই তিনজনের দেহও পর্বতের ওপর থেকে গেছে। তিনজনের মধ্যে দুইজনের দেহ কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু তৃতীয় দেহটি- যেটি ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত, কারণ তার পায়ে সবুজ রঙের বুট বা জুতা রয়েছে, সেটি গত তিন দশক ধরে প্রায় ৮হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় বরফের মধ্যে পড়ে আছে। বহু বছর ধরে ধারণা করা হতো, ‘গ্রিন বুটস’ হলো অভিযানের আরেক সদস্য তসেওয়াঙ পালজোরের দেহ। কিন্তু ১৯৯৬ সালের সেই অভিযানের বেঁচে যাওয়া সদস্যদের বক্তব্য এবং পর্বতারোহীদের সঙ্গে সর্বশেষ রেডিও যোগাযোগের অবস্থান বিশ্লেষণ করে এখন কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে যে দেহটি আসলে দোরজে মোরুপের। আইটিবিপির এক কর্মকর্তা বিবিসি নিউজ হিন্দিকে জানিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোরুপের পোশাক ও পর্বতারোহণের সরঞ্জাম পরীক্ষা করেও দেহটি সনাক্ত করার সূত্র পাওয়া গেছে। এরপর থেকেই সহকর্মিরা পরিকল্পনা করছেন কীভাবে তাদের সঙ্গীকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা যায়। ভারতে নেয়ার পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পরিবারটি অন্তত কিছুটা মানসিক শান্তি পাবে। আইটিবিপি’র ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা তাকে কখনো ভুলিনি। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল।” মৃতদেহ উদ্ধার করা কতটা কঠিন?এভারেস্টে মারা যাওয়া মানুষের দেহ উদ্ধার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও কঠিন কাজ। গত এক দশকের আগে এ ধরনের উদ্ধার অভিযান ছিল খুবই বিরল। মোরুপের দেহের মতো অনেক দেহই এভারেস্টের যাকে পর্বতারোহীরা ‘ডেথ জোন’ বলেন, সেই এলাকায় পড়ে আছে। এখানে তাপমাত্রা -৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অক্সিজেনের পরিমাণ থাকে মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। নেপালের অভিজ্ঞ পর্বতারোহী শিরিং জাংবু শেরপা এ ধরনের অন্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আবহাওয়া ও তুষারের পরিস্থিতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।” তিনি বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “উত্তর দিকে ফাটল বা ক্রেভাস তুলনামূলক কম, কিন্তু জায়গাটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। নেপালের দিক থেকে কোনো সমস্যা হলে দ্রুত হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু চীনের দিক থেকে এমন ব্যবস্থা নেই।” ‘গ্রিন বুটস’-এর দেহ যে চীনা দিকের ঢালে রয়েছে, সেই অংশটি আরও খাড়া। দক্ষিণ ঢালের মতো সেখানে একই ধরনের সহায়ক অবকাঠামোও নেই। বিবিসি নিউজ নেপালিকে শেরপা সূত্রগুলো এমনটাই জানিয়েছে। পর্বতারোহণ গাইড পেম্বা অংচু শেরপা বলেছেন, “পর্বতারোহনের জন্য জনপ্রিয় বসন্তকালেও ওই দেহ নিচে নামানো খুব কঠিন। শরৎকালে তো আরও কঠিন, কারণ তখন আবহাওয়া বেশি অনিশ্চিত। এত বছর ধরে দেহটি সেখানেই পড়ে থাকার মূল কারণ এটাই।” তিনি বলেন, শুধু ওই জায়গায় পৌঁছানোর জন্যই ১০ থেকে ১২ জন এমন দক্ষ পর্বতারোহী দরকার হতে পারে, যারা এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার সক্ষমতা রাখেন এবং সহায়ক দড়ি স্থাপন করতে পারেন। এরপর ‘গ্রিন বুটস’-এর দেহকে হাতে করে এমন একটি উচ্চতায় নামাতে হবে, যেখানে হেলিকপ্টার দিয়ে সেটি নেয়া সম্ভব হবে। সম্ভবত ইয়াকের সাহায্যও লাগতে পারে। এরপর দেহটি বিমানবন্দরে নিয়ে যেতে হবে। পুরো কাজটির জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রয়োজন হবে। শেরপারা জানান, বরফে জমাট বাঁধা পর্বতারোহণের পোশাক ও সরঞ্জামে মোড়ানো মৃতদেহের ওজন একজন সাধারণ মানুষের ওজনের কয়েক গুণ হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় দেহগুলো অস্বাভাবিক অবস্থায় বরফের সঙ্গে শক্তভাবে জমে থাকে। ফলে অত্যন্ত দুর্গম ও খাড়া ভূখণ্ড দিয়ে সেগুলো নিচে নামানো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আবার নিচু উচ্চতায় নিয়ে এলে দেহ বরফমুক্ত হয়ে গলতে এবং পচতে শুরু করতে পারে। ভারতীয় পর্বতারোহী কুন্তল জোইশার বিবিসি নেপালিকে বলেছেন, মৃতদেহ নিয়ে নামার শুরুটিই হবে সবচেয়ে কঠিন অংশ। “এটা অত্যন্ত, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ হতে যাচ্ছে। জায়গাটি প্রচণ্ড খাড়া এবং সেখানে প্রচুর পাথর রয়েছে। বাস্তবিক দিক থেকে প্রথম ১ হাজার মিটার নামানোই হবে বিশাল এক চ্যালেঞ্জ।” তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি মৃতদেহের জন্য যেন কোনো শেরপার জীবন ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে।” এই সব কারণে উদ্ধার অভিযানটি অত্যন্ত ব্যয়বহুলও হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনকি তুলনামূলক সহজ উদ্ধার অভিযানেও ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে, যা অধিকাংশ পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। এ কারণেই অনেক সময় স্থানীয় দলগুলো মৃতদেহকে শুধু পর্বতের এমন কোনো জায়গায় সরিয়ে দেয়, যেখানে সেটি আরোহীদের চোখে পড়ে না। এর একটি উদাহরণ অভিযাত্রী ফ্র্যান্সিস আর্সেন্টিয়েভ। তাকে ‘স্লিপিং বিউটি অফ এভারেস্ট’ নামে ডাকা হতো। ১৯৯৮ সালে মৃত্যুর প্রায় এক দশক পর, ২০০৭ সালে তার দেহ এভারেস্টের আরও নিরিবিলি একটি স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। তবে এবার আইটিবিপি নিজেই উদ্ধার অভিযানের অর্থায়ন করছে। তারা সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোরুপের দেহ ফিরিয়ে আনতে চায় এবং এ কাজের জন্য এখন তারা অভিজ্ঞ পর্বতারোহণ ও উদ্ধারকারী শেরপা দল খুঁজছে। ভারতে ফিরিয়ে আনার পর দেহটির ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষায় মোরুপের পরিচয় নিশ্চিত হলে তার দেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ‘আমার মন মানতে চায়নি যে সে মারা গেছে’বহু বছর ধরে লাদাখে থাকা মোরুপের পরিবার তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা মেনে নেয়ার চেষ্টা করে এসেছে। এখন প্রায় ৭৫ বছর বয়সী ইয়াংস্কিটের নিজের বিয়ের দিনটির কথাও ঠিকমতো মনে পড়ে না। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার পরের দিনগুলোর স্মৃতি আজও তার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তিনি বলেন, “আমি শুধু জানতাম, পাহাড়ে ঝড় হয়েছে। বাড়িতে তার শেষকৃত্যের প্রার্থনার আয়োজন করা হলেও আমার মন মানতে চায়নি যে সে মারা গেছে।” কথা বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। “আমি তার মৃতদেহ দেখিনি। তাই তার মৃত্যু মেনে নেয়া আমার জন্য খুব কঠিন ছিল।” আজ মোরুপের স্মৃতি হিসেবে পরিবারের কাছে রয়েছে তার কিছু পদক ও ট্রফি, পাহাড়ে তার অভিযানের কয়েকটি পুরোনো ছবি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সনদ। চীনা সরকারের দেয়া ওই সনদে উল্লেখ রয়েছে যে ১৯৯৬ সালের ১০ মে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে মোরুপ এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন। মোরুপের ছেলে পুনচোক দোরজাই বিবিসিকে জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান সফল হলে পরিবার লাদাখের রাজধানী লেহ-র মার্টায়ারস পার্কের কাছে তার বাবের শেষকৃত্য করবে। দোরজাই বলেন, “আমার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাকে একজন শহীদ হিসেবে স্মরণ করা উচিত।” তিনি আরও বলেন, তার সঙ্গে মারা যাওয়া সতীর্থদেরও একই মর্যাদা দেয়া উচিত। তবে মোরুপের স্মৃতির একটি বিশেষ প্রতীক পরিবার নিজেদের কাছেই রেখে দিতে চায়। তার এভারেস্ট জয়ের সনদের পাশে সেটিও রাখা হবে। দোরজাই বলেন, “আমরা ‘গ্রিন বুটস’টি রেখে দেয়ার পরিকল্পনা করছি।” Post Views: 17 Post navigation সপ্তম পে কমিশনের নিয়ম, শর্ত ঘোষণা নবান্নের, ৫ শতাংশ বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবও জানাল সরকার