হার মানেননি মালতী। প্রাথমিকের পর মাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি ছুঁয়ে আসতে পেরেছিলেন তিনি। বাড়ি ভাড়া করে থেকে কোনও রকমে শুরু করেছিলেন পড়াশোনা। কিন্তু সেখানেই ইতি টানতে হয়েছে। তার পর হয়েছে সংসার, সন্তান। কিন্তু ছোটবেলায় সেই পড়াশোনা করার ইচ্ছেটা মরে যায়নি মনে মনে।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
সকাল হতেই খুদেদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামটি। হাতে বই খাতা নিয়ে সার বেঁধে কচিকাঁচারা এসে হাজির হয় একটি মাটির ঘরে। সেখানেই শুরু হবে পড়াশোনা। অপেক্ষায় থাকেন ‘মালতী দিদি’।আনন্দবাজার ডট কম

সমাজমাধ্যমের দৌলতে গত দু’বছরে অনেকেই চিনেছেন মালতীকে। ছোটবেলা থেকেই মন দিয়ে পড়াশোনাটা করার ইচ্ছা ছিল বাঘমুন্ডির জিলিং সেরেঙ গ্রামের মেয়ে মালতী মুর্মুর। কিন্তু পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে সে সুযোগ পায় না সবাই। ছোট্ট মালতীকে পায়ে হেঁটে যেতে হত নিজের গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে শুশনিডি গ্রামে। সেখানেই একমাত্র প্রাথমিক স্কুল।

হার মানেননি মালতী। প্রাথমিকের পর মাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি ছুঁয়ে আসতে পেরেছিলেন তিনি। বাড়ি ভাড়া করে থেকে কোনও রকমে শুরু করেছিলেন পড়াশোনা। কিন্তু সেখানেই ইতি টানতে হয়েছে। তার পর হয়েছে সংসার, সন্তান। কিন্তু ছোটবেলায় সেই পড়াশোনা করার ইচ্ছেটা মরে যায়নি মনে মনে।

২০২০ সাল। তত দিনে মালতীর গ্রামে তৈরি হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু করোনা অতিমারির ছোবলে সে স্কুল তখন বন্ধ। শিশুরা ঘুরে বেড়ায় এ দিক সে দিক। গ্রামের শিশুরা একেবারে লেখাপড়া শিখবে না! এটা মেনে নিতে পারেননি মালতী। তাই কোনও সরকারি সাহায্য বা ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে তৈরি করে ফেলেন এক পাঠশালা।

ছোটদের হাতে শিক্ষার প্রদীপটি ধরিয়ে দিতেই পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি থানার জিলিং সেরেঙ গ্রামে শুরু হয় সাঁওতালি ভাষায় পাঠদান। নিতান্তই অবৈতনিক পাঠশালা।

উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল মালতীর। এখন স্বামী, দুই সন্তান, আর বৃদ্ধ অশক্ত শ্বশুরমশাইকে নিয়ে তার সংসার। বড়ছেলে পড়ে জিলিং সেরেং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুশ্রেণিতে। ছোটটির বয়স মাত্র এক বছর। সকাল সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত পাঠশালা সামলান মালতি। তার পর ছোটেন খেতে। স্বামী বাঙ্কা মুর্মু সকাল থেকেই কাজ করেন চাষের। তিনিও পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন। পৌঁছেছিলেন কলেজ অবধি। কিন্তু রুজির টানে বেছে নিতে হয়েছে কৃষিকাজ।

বাঙ্কা বলেন, “আমরা দু’জনেই পড়া শেষ করে উঠতে পারিনি। চাষবাস দিয়েই যা উপার্জন! এক বেলা ভাত জুটলে অন্য বেলায় অনেকদিনই ফ্যান খেয়ে থাকতে হয়।” সংসার সব দায়িত্ব সামলে আর নিজের পড়াশোনার কথা ভাবতে পারেননি মালতী। কিন্তু গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলির জন্য ভাবেন তিনি।

করোনা অতিমারির সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গ্রামের শিশুদের তিনি নিজেই পড়াবেন। মাতৃভাষা সাঁওতালিতেই শিখবে ওরা। যদিও বাংলা এবং ইংরেজিতেও পড়ান মালতী। ঝুপড়ি ঘরের পাঠশালা শুরু হয়েছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ জন খুদেকে নিয়ে। ছ’বছর পর সেখানে পড়ুয়ার সংখ্যা ৬০। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়াদের ক্লাস হয় প্রতিদিন সকালে দুই-আড়াই ঘণ্টা। তার পর তারা স্কুলে যায়।

মালতীর এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এলাকার এবং এলাকার বাইরের অনেকে। সকলের উদ্যোগে সেই ঝুপড়ি ঘরের পাঠশালায় এখন মাটির দেয়াল, মাথার উপর ছাদ।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *