-মো: আসিফ আহমেদ

শিক্ষাই যে কোনো জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। ব্যক্তি, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে উপস্থাপন করার জন্য সর্বপ্রথম যে বিষয়টা প্রয়োজন তা হলো শিক্ষা। আর এই শিক্ষা অর্জনের মৌলিক ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে।

        স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শিক্ষার হার ছিল খু্বই কম। ধীরে ধীরে এ হার বড়তে থাকে। নানা সময়ে বিভিন্ন সরকার শিক্ষার প্রসারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার সুফলও পাওয়া গেছে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ছাড়া যে কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না তা আজ সবাই বুঝে গেছে। বর্তমান সরকারের মেযাদ ছয় মাস পূর্ণ না হলেও শিক্ষাখাতের উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেছিল নির্বাচনী ইশতেহারে।

শিক্ষার্থীর গায়ে স্কুল ড্রেস, পায়ে জুতা সাথে আনন্দময় পাঠ্য আর পুষ্টিকর খাবার এমন একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার। কারণ প্রাথমিক শিক্ষাই শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের মূল ভিত্তি। এখানেই সে পায় মেধা, মননশীলতা ও নৈতিকতার প্রারম্ভিক পাঠ। তাই প্রাথমিক শিক্ষা কেবল শিক্ষাজীবনের সূচনা নয় বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার আরও আধুনিকায়ন, আনন্দময় ও যুগোপযোগী করে গড়তে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। সরকার নির্বাচনি ইশতেহার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এ প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে যেসকল প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে কাজ করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষার্থীকে জীবনযাপনের জন্য আবশ্যকীয় জ্ঞান, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, জীবন-দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গী, মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা অর্জন এবং পরবর্তী স্তরের শিক্ষা লাভের উপযোগী করে গড়ে তোলাকে প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে স্থির করা। উপরন্তু বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অর্জনে কাজ করছে যার ৪ নম্বর অভীষ্টে রয়েছে গুণগত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি, যে কোনো পরিবেশ খাপ খাওয়ানো কৌশল আয়ত্ত করা। একই অভীষ্টে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগের কথা বলা হয়েছে।

সরকার প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের ‘বিনামূল্য স্কুলড্রেস বিতরণ’ কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে দেশের ২ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন স্কুল ড্রেস ও জুতা তুলে দেয়ার পরিকল্পনা করছে।পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে অনগ্রসর পরিবারের জন্য শিক্ষার ব্যয়দায় লাঘব করবে এবং শিশু শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে ইতিবাচক প্রভাবক হয়ে কাজ করবে। এটি কেবল নিছক উদ্যোগ নয় বরং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে পূর্ণ পরিকল্পনার একটি অংশ।

পোশাকের সাথে শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টিমানকে সমান গুরুত্বারোপ করছে সরকার। সে লক্ষ্যে ‘মিড -ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। বর্তমানে দেশের ১৫০ টি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ দশমিক ৩ লাখ শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দিচ্ছে রুটি, সেদ্ধ ডিম, কলা, ফর্টিফাইড বিস্কুট, ইউএইচটি দুধসহ পুষ্টিকর খাবার। এতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কার্যক্রমে অধিক মনোনিবেশ করতে পারে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পরা হ্রাসে ও শিখন উন্নয়নে ইতিবাচকতার আভাস রয়েছে।

শুধু বইয়ের মধ্যে নয়, একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব বিকাশও সমধিক গুরুত্ব বহন করে। সে আঙ্গিকে ২০২৭ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলামে আনন্দময় শিক্ষা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি দুটি বিষয়ে বই অন্তর্ভুক্ত করার কাজ ইতোমধ্যে চালুর প্রস্তুতি চলছে। এতে শিশুরা পাঠ্য বইয়ের জ্ঞানেই সীমিত থাকবে না বরং দলগত চেতনা, নেতৃত্ব, শৃঙ্ক্ষলার মতো মূল্যবোধের দীপ্তিকে বহন করে উদ্ভাসিত হবে।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি দেশের প্রায় সকল প্রাথমিক শিক্ষার্থী (বালক-বালিকা) অংশগ্রহণে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬ -অনুষ্ঠিত হয়েছে যা পড়ালেখার পাশাপাশি শিশুদের ক্রীড়ামোদী করে গড়ে তোলারই প্রয়াস। এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ এর আওতায় নির্ধারিত টার্গেটসমূহ শিক্ষা উন্নয়নের একটি সুস্পষ্ট বৈশ্বিক রূপরেখা প্রদান করে। এর প্রথম টার্গেট (৪.১) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সকল শিশু ও কিশোর-কিশোরীর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে টার্গেট ৪.২–এ মানসম্মত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যাতে শিশুর প্রাথমিক বিকাশ সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে টার্গেট ৪.৩ উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলে, যাতে তরুণরা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আধুনিক বিশ্বে দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

বর্তমান সরকার শিক্ষার্থী ও পাঠ্যক্রম পরিবর্ধন পাশাপাশি শিশুদের পাঠাদানকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ডিজিটাল কন্টেন্ট, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ওয়াইফাই সংযোগ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্মিলিতভাবে যেনো শিশুশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের যেন এক দৃপ্ত পদযাত্রা।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ অর্জনে নব-নির্বাচিত সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা ভাবনায় একটি সমন্বিত ও সময়োপযোগী রূপান্তরের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক মূল্যবোধ বিকাশের একটি কৌশলগত মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জীবনমুখী শিক্ষা। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যাতে তারা শুধু তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং বিশ্লেষণধর্মি চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ অর্জন করতে পারে। আধুনিক বিশ্বে পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় এই ধরনের দক্ষতা শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার শক্ত ভিত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ শিশুর বৌদ্ধিক, সামাজিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি নির্মিত হয় এই স্তরেই। সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট শক্তিশালী করার পরিকল্পনা শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতিকে আরও কার্যকর করতে পারে।

শিক্ষায় অগ্রাধিকার সরকার সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছে এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। ধাপে ধাপে দেশের জিডিপি’র ৫ শতাংশে বরাদ্দ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। উল্লেখিত উদ্যোগগুলো একজন প্রাথমিক শিক্ষার্থীর শিক্ষার্জনের পথ আরও মসৃণ করে দিচ্ছে। সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু অবৈতনিক বা বিনামূল্যে বইতে সীমাবদ্ধ রাখেনি বরং শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা এবং বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার (মিড-ডে মিল) চালুর মতো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে একজন শিক্ষার্থী যেমন বিদ্যালয়ের প্রতি যেমনি উৎসাহিত হবে, তেমনি একটি পরিবারের ব্যয়দায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।

বর্তমান সরকারের অন্যতম এক অভিলক্ষ্য -দেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদ রূপান্তর করা। সেলক্ষ্য বাস্তবায়নের শুরু হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। সেলক্ষ্যে সরকার প্রতিটি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক করে এমন এক নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে কাজ করছে, যারা নৈতিকতা, মেধা ও দক্ষতায় বিশ্বমানের হয়ে গড়বে ‘নতুন বাংলাদেশ।

লেখক: তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

-পি. ফি.

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *